তৃতীয়ত, যে আরেক সভ্যতার সন্ধান ঘোষ পেয়েছেন তার নাম দিয়েছেন, রঙ্গমহল সভ্যতা, কারণ বিকানিরের আধুনিক রঙ্গমহল অঞ্চলে এ সভ্যতার বিস্তর উদাহরণ তিনি পেয়েছেন। রঙ্গমহল মুসলমানি যুগের শব্দ– অর্থাৎ এ সভ্যতার অন্তত হাজার বছর পরেকার, কিন্তু রঙ্গমহল জায়গাটি বিকানিরে সুপরিচিত বলে এ নামকরণ করা হয়েছে।
এ সভ্যতা মেটে সভ্যতার পরবর্তী এবং নিঃসন্দেহ কুশান যুগ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, এমনকি গুপ্ত যুগ পর্যন্ত, কারণ, গুপ্ত যুগের গান্ধার শিল্পের নিদর্শনও এতে রয়েছে।
এ তিন সভ্যতার নির্মাতা কারা, ঠিক ঠিক কোন যুগে এরা ভারতবর্ষে বসবাস করেছিল, একে অন্যের সঙ্গে এদের দ্বন্দ্ব হয়েছিল কি না, এসব তত্ত্ব এবং তথ্য জোর গলায় আজ বলা অসম্ভব।
শ্রীঅমলানন্দ ঘোষ বিকানিরে যে অদ্ভুত অধ্যবসায়ের সঙ্গে অনুসন্ধান করেছেন তাতে মেলা প্রশ্ন মাথা তুলেছে।
যেসব প্রশ্নের তিনি উত্তর দিয়েছেন সেগুলো পূর্বেই নিবেদন করেছি, কিন্তু নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করাও প্রত্নতাত্ত্বিকের কর্ম। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সুযোগ এবং সুবিধা পেলে– ঘোষ এখনও যুবক– তিনি অনেক কাজ করে বহু প্রশ্নের উত্তর দিতে সমর্থ হবেন।
গত বৃহস্পতিবার আমাদের এক ঘরোয়া বৈঠকে ঘোষ আমাদের এ বাবদে বক্তৃতা দিয়ে তালিম দেন। সব জিনিস ঠিক ঠিক বুঝতে পারিনি বলে হয়তো ঘোষের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। ঘোষ সহৃদয় লোক, এ লেখা যদি তার হাতে পৌঁছয় তিনি মাপ করে দেবেন এ আশা মনে পোষণ করি। আমার উদ্দেশ্য, গুণীরা যেন এ বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু হয়ে শ্রীমান ঘোষকে উৎসাহিত করেন।
.
১১.
একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে মিস মেয়ে কিংবা বেভারলি নিকলস যে উদ্দেশ্য আর যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এদেশে এসেছিলেন শ্রীমতী রজোভেল্ট আদপেই সে রূপ নিয়ে আসেননি। ভারতবর্ষের ভালো-মন্দ পাপ-পুণ্য নিয়ে তিনি যেমন কড়া কড়া কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেন না ঠিক তেমনি তিনি অকারণ অসময়ে আমাদের পিঠ চাপড়ে আমরা যে বড় সুবোধ ছেলে সেকথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চান না।
তাঁর দৃষ্টি আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যার দিকে। আজকের দিনে আমেরিকারই অঢেল রেস্ত আছে; ভারতের উন্নতির জন্য এদেশীয় বহুলোক খাটবার জন্যও তৈরি আছেন। এ দুয়ে মিলে যে অনেক সকর্ম সমাধান হতে পারে সে বিষয়ে কারও মনে কোনও দ্বিধা নেই। শ্ৰীমতী রজোভেল্ট ঠিক এই জিনিসটিই মনে রেখে এ দেশে বহু পর্যবেক্ষণ করেছেন ও দিল্লির তাবৎ সভা এবং পার্টিতে এ সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন– অতিশয় সহিষ্ণুতার সঙ্গে সর্ব প্রশ্নের যথাসাধ্য উত্তর দিয়েছেন।
এদেশের অনেকেরই মনে ভয় শুধু কম্যুনিস্ট না, অন্য পাঁচজনেরও আমরা যদি একবার মার্কিন টোপ গিলি তা হলে আর মার্কিন রাজনৈতিক বঁড়শি থেকে কস্মিনকালেও ছাড়া পাব না। এর উত্তরে প্রথম বক্তব্য ইংরেজি প্রবাদ, নো রিস্ক, নো গেন সম্পূর্ণ মিথ্যে নয়। দেশীয় প্রবাদের ভাষায় বলি, সাপ মারতে গেলে লাঠি ভাঙবেই ভাঙবে একথা হলফ করে বলা যায় না, মাঝে মাঝে না-ও ভাঙতে পারে।
দ্বিতীয়ত আমার বিশ্বাস পৃথিবীর বুদ্ধিমান জাত এখন আর ডাণ্ডা বুলিয়ে অন্য দেশের ওপর রাজত্ব করতে চায় না। এখন সে চায় অর্থনৈতিক রাজত্ব– অর্থাৎ পৃথিবীর আর পাঁচটা জাতের কাছে নিজের সুবিধেয় মাল বেচতে। তবে যদি বলেন, আমেরিকার কাছ থেকে রেস্ত নিলে আমরা তাদের অর্থনৈতিক আওতায় এসে যাব তা হলে নিবেদন, রুশ ভিন্ন পৃথিবীতে আজ কোন জাত মার্কিনি আওতার বাইরে? এই যে মহামান্য ইংরেজ মহাপ্রভুরা দুনিয়ার সর্বত্র দাবড়ে বেড়ান তেনাদের অবস্থাটা কী? আজ যদি তারা মার্কিনের সঙ্গে বড্ড বেশি তেড়িমড়ি করে তবে কাল কাক-কোকিল ডাকবার আগেই মাংসটা আণ্ডাটার দাম চড়চড় করে আসমানে চড়ে ডালটার উপর বসে ঠ্যাং দুলাবে। বাজার করতে গিয়ে তার চরণের ধুলোটি স্পর্শ করা যাবে না।
তবে হ্যাঁ, আলবৎ, স্বেচ্ছায় আমরা এরকম অবস্থা বরণ করে নেব কেন?
আমার অন্ধ বিশ্বাস ভারত বিরাট দেশ তাই সে কারও ধামাধরা না হলেও বেঁচে থাকতে পারবে। তার পূর্বে অবশ্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কৃষির সুব্যবস্থা করা। তার জন্যে প্রয়োজন জলের বাঁধ, বিজলির আলো। আরও দরকার কৃষির জন্য উন্নত কলকবজা, সার। এসবের জন্য উপস্থিত রেস্তর প্রয়োজন। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ, একবার তার কৃষি আপন পায়ে দাঁড়াতে পারলে তখন আর কোনও ভাবনা থাকবে না।
আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, রায় পিথৌরা অতিশয় অমায়িক লোক। তিনি কারও কাছে অঋণী হয়ে মরতে চান না, তাই যদি এসব বাবদে রুশরা সাহায্য করতে চান, তবে তিনি তাদেরও সাহায্য নিয়ে রুশ জাতটাকে কৃতার্থম্মন্য করতে প্রস্তুত আছেন।
রুশের আওতায় পড়ে যাব? তার ভয় আরও কম। পূর্বে বলেছি, বুদ্ধিমান জাত অন্য দেশের ওপর রাজত্ব করতে চায় না। তাই ইন্দোচীনে ফ্রান্সের কাণ্ডকারখানা দেখে কী বলব ভেবে পাইনে।
গোড়ায় আমেরিকা ইন্দোচীনের ঝামেলায় নামতে চায়নি। ওদিকে ফ্রান্সের গাঁটে এত কড়ি নেই যে, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে একখানা আস্ত লড়াই চালাবার মতো বিলাস উপভোগ করতে পারে। তাই ফরাসিরা মেলা কায়দাকেতা করে, মেলা নল চালিয়ে মার্কিনকে নামাল তার দয়ে।
