পূর্ব আফ্রিকার ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রীযুক্ত আরাসাহেব পর্যন্ত দিল্লি এসেছেন। তিনি বলেন, আফ্রিকা, ইংরেজ, ভারতীয়, আরব, নিগ্রো সবাই মিলিয়ে একটা অখণ্ড সমাজ যদি না গড়ে তোলা যায় তবে ভবিষ্যতে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। তাঁর বিশ্বাস এই অখণ্ড সমাজ গড়ে তুলতে পারে প্রধানত তথাকার ভারতীয়রাই। তাই তিনি মনে করেন, এখানকার ভারতীয়েরা যেন পূর্ব আফ্রিকার ভারতীয়দের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করেই সন্তুষ্ট না হন, তারা যেন সেই অখণ্ড সমাজের দিকে দৃষ্টি রেখে আপন প্রচেষ্টা ধাবিত করেন।
মহাত্মাজির সহকর্মী শ্ৰীযুত কাকাসাহেব কালেলকর পূর্ব আফ্রিকায় গিয়ে বহু সকর্ম করেছেন। আপন অভিজ্ঞতা একখানা উত্তম হিন্দি পুস্তকে প্রকাশ করেছেন সে পুস্তকের ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে।
আরেকটি গুণী লোক পণ্ডিত শ্রীঋষিরাম। ইনি উপস্থিত আফ্রিকাতে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচার করছেন। আমাকে প্রায়ই চিঠিপত্র লেখেন এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যের যেসব ছবি পাঠান, সেগুলো দেখে ভগবানকে বলি, আসছে জন্মে যেন নিগ্রো হয়ে জন্মাই।
উঁহু; সেটি হবার জো নেই।
তন্দুরি, মুর্গি মাফিক দিল্লির গ্রীষ্ম জাহান্নম তন্দুরি-আদমি বনে যাওয়ার পর তো।
পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।
.
০৬.
রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস পালন করাতে দিল্লি যা উৎসাহ দেখায়, কলকাতার তুলনায় সে কিছু কম না। অবশ্য দিল্লি শহরে গণ্ডায় গণ্ডায় সুসাহিত্যিক নেই; কাজেই রবীন্দ্রজীবনী এবং সাহিত্য সম্বন্ধে বহুমুখী এবং বিস্তর আলোচনা হওয়ার প্রয়োজন ঠিক ততখানি হয়তো হয়ে ওঠে না।
এবারে কলকাতা থেকে এলেন শ্ৰীযুত প্রমথনাথ বিশী সেই অভাব খানিকটে পূরণ করতে। কালীবাড়ি ক্লাবে শ্ৰীযুত বিশী বিরাট জনতার সামনে বক্তৃতা দেন। শ্ৰীযুত বিশী সম্বন্ধে দিল্লির নগণ্য নাগরিকরূপে রায় পিথৌরা কী ধারণা পোষণ করেন, সে সম্বন্ধে গত সপ্তাহে নিবেদন করেছি এবং এ সপ্তাহে সপ্রমাণ হয়ে গেল যে, তার ধারণা ভুল নয়।
অন্যান্য স্থলে ভাষণ দেন শ্ৰীযুত হুমায়ুন কবীর এবং শ্ৰীযুত দেবেশ দাশ। একই দিনে প্রায় সবকটি পরব হয়েছিল বলে রায় পিথৌরা দু একটির বেশি সামলে উঠতে পারেননি। তবে এঁদের পাণ্ডিত্যের খবর রাখি বলে লোকমুখে যখন শুনলুম এঁদের বক্তৃতা সত্যই উপভোগ্য হয়েছিল তখন সেকথা অনায়াসেই বিশ্বাস করতে পারলুম।
শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক স চিত্রাঙ্গদা গীতিনাট্যের প্রায় সবকটি গান গাওয়ার ব্যবস্থা করেন। শ্ৰীযুত নীলমাধব সিংহ নিষ্ঠার সঙ্গে গানগুলোর পরিচালনা করেন এবং অনুষ্ঠানটি যে সফল হয়েছিল, তার প্রধান কারণ ছেলেমেয়েরা গানগুলো অতি সযত্নে বহু পরিশ্রম করে আয়ত্ত করেছিল। শ্রীমান কৌশিক ও শ্রীমতী নন্দিতা এবং আরও অনেকেই অনুষ্ঠানটিকে সর্বাঙ্গসুন্দর করার জন্য সাহায্য করেন। রায় পিথৌরাও মাঝে মাঝে উপর চাল মারার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাকে কেউ বড় একটা আমল দেয়নি।
***
অনেকেই বলেন, একই দিনে অনেকগুলো পরব না করে কোনও এক কেন্দ্রীয় স্থলে মাত্র একটি বিরাট সভা করা উচিত। আমি এ মত পোষণ করিনে। দিল্লি বিরাট শহর এবং এক স্থল থেকে অন্য স্থল যাওয়ার যা কুব্যবস্থা তাতে করে সেই কেন্দ্রীয় সভায় দিল্লির অধিকাংশ রবি-ভক্তরাই উপস্থিত হতে পারবেন না। তাই একই দিনে কালীবাড়ি, লেডি আরউইন স্কুল, লোদি কলোনি এবং বিনয়নগরে যদি রবীন্দ্রজন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয় তবে সেই ব্যবস্থাই ভালো।
অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় একটি সভা হলে আরও ভালো। গেল বৎসর টেগোর সোসাইটি নিউদিল্লি এবং টাউন হলে তার আগের বৎসর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় বড় সভার আয়োজন করেছিলেন। এ বছর কেন হল না বোঝা গেল না। তবে একটা কারণ এই যে, দিল্লিতে প্রফেশনাল সাহিত্যিক কিংবা সাহিত্যসেবী কেউ নেই–সকলকেই কোনও-না-কোনও দপ্তরে সুবো-শাম কলম পিষতে হয়, তাই সবাই প্রতি বৎসর সবকিছু করে উঠতে পারেন না।
রবীন্দ্রনাথ-জন্মোৎসব আরও কিছুদিন ধরে চলবে। এ জিনিস যত বেশি দিন ধরে চলে ততই ভালো।
***
খাদ্যমন্ত্রী শ্ৰীযুত কানহাইয়ালাল মুন্সী বিদায় নেবার সময় বলেন ভারতবর্ষের কোনও খাদ্যমন্ত্রীই কিছুটি করতে পারবেন না, যদি তিনি বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রকে চাপরাসিরূপে না পান।
তাতেও কিছু হবে না। মন্ত্রীদের চাপরাসি মহাশয়গণের প্রধান কর্ম চেয়ারে বসে বেঞ্চিতে পা তুলে দিয়ে মেঘগর্জনে ঘুমনো। পর্জন্য যদি চাপরাসি হন তবে তিনি ওই গর্জনই ছাড়বেন– ওই একই পদ্ধতিতে বৃষ্টি নামাবেন না।
দ্বিতীয়ত পর্জন্যকে চাপরাসি ইতঃপূর্বে একবার হতে হয়েছিল তবে কি না যার চাপরাসি তিনি হয়েছিলেন সে বেচারি খুন হয় এক মানুষেরই দ্বারা।
স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে, তবু আবছা মনে পড়ছে–
ইন্দ্র যম আদি করে বাঁধা আছে যার ঘরে
ছয় ঋতু খাটে বারো মাস
সমীরণ ভয়ে ভয়ে চলে মৃদু গতি হয়ে
দেব রক্ষ যক্ষ যার দাস।
সেই শ্রীমান রাবণ যখন বেঘোরে প্রাণ দিলেন, তখনই ইন্দ্রকে পুনরায় চাপরাসি করতে যাবে! কে?
আমার মনে হয়, মুন্সীজি উত্তমরূপে বিবেচনা না করে এ প্রস্তাবটি করেছেন। যদি ধরেই নিই, তিনি ইন্দ্রকে কবজাতে এনে ফেলেছেন– তা হলে? তা হলে তো তাকে রাবণ বলে ডাকতে হবে। রাম, রাম!
