গৌরী সেন রাজা ছিলেন না– তাই তুলনাটা টায়-টায় মেলে না। কারণ শেষ পর্যন্ত দেখা গেল এ অভিধান ছাপাবার মতো পয়সা আছে শুধু রাশিয়ার জারের।
তখন জর্মন পণ্ডিতরা পাকড়াও করলেন তাঁকে– জারটি ভালো মানুষ ছিলেন (রামচন্দ্র! কম্যুনিস্ট ভায়ারা না আবার চটে যান) এবং টাকাটা অকাতরে ঢেলে দিলেন।
শুধু এই অভিধানখানিকে ভালো করে কাজে লাগানোর জন্যই জর্মন ভাষা শেখা উচিত।
মনে পড়ছে, প্রথম যৌবনে ক্রন্দসী শব্দের সামনে কাঁদ কাঁদ হয়ে মেলা অভিধান ঘটার পর ব্যোটলিঙ্ক-রোটের অভিধান খুলে শব্দের হদিস পাই। (স্বর্গীয় জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহোদয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধার অন্ত নেই তিনি বাঙালির গৌরবস্থল ও প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। তাই তার সামান্য দোষ-ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করলে তার আত্মা বিরক্ত হবেন না বলে আশা রাখি। তাই এই উপলক্ষে নিবেদন করি, জ্ঞানেন্দ্রমোহন তার অভিধানে ক্রন্দসী শব্দ উল্লেখ করে যে বলেছেন সংস্কৃত অভিধানে পাই নাই, কিন্তু রোদসী পাইয়াছি পুনরায়, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক উদ্ভাবিত এই দুটি বাক্যই খুব ঠিক নয়।)
***
বপ, ডয়সেন, অল্ডেনবুর্গ, য়াকোবি, হিলেব্রান্ট, ড্যুটওয়া এদের সবাইকে বাদ দিয়ে তাদের কথায়ই আসি না কেন যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ যোগাযোগ হয়েছে।
এই ধরুন ল্যুডার্স। গেলডনারের পরেই চতুর্বেদে পণ্ডিত ছিলেন এই বার্লিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক।
মোন-জো-দড়ো নিয়ে যখন বিশ্বভুবন মাথা ফাটাফাটি করছে, এ কোন সভ্যতা, এর বয়স কত, একে গড়ে তুলল কে, তখন জর্মনি ডার্সকে অনুনয় করে বলল, চতুর্বেদে হেন বস্তু নেই যা আপনার অজানা। আপনি মোন-জো-দড় ঘুরে এসে বলুন, বেদে বর্ণিত কোনও কিছু কী মোন-জো-দভড়াতে আছে যার থেকে প্রমাণ করা যেতে পারে যে মোন-জো-দড়ো আর্য সভ্যতা।
ল্যুডার্স ঘুরে গিয়ে বললেন, না, বেদের সঙ্গে এর কোনও যোগাযোগ নেই।
ব্যস্। সব মাথা-ঘামানো বন্ধ।
সব শাস্ত্রেই ল্যুডার্সের অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল। শেষ বয়সে সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রটি অধ্যয়ন করে তার সঙ্গে গ্রিক অলঙ্কার শাস্ত্র মিলিয়ে যখন বক্তৃতা দিতেন তখন দেখেছি তার শ্রোতারা বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনে যেতেন। এরকম পণ্ডিত জর্মনিতে আবার জন্মাবেন কবে?
***
কিংবা ধরুন কির্ফেল।
জৈন শাস্ত্রের মহাপণ্ডিত যাকোবির (ইনি স্বাধীনভাবে হিসেব করে লোকমান্য টিলকের সিদ্ধান্তেই উপস্থিত হন) শিষ্য কির্ফেলকে একদিন জিগ্যেস করেছিলুম, উপস্থিত কোন বিষয় নিয়ে মগ্ন আছেন?
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, পুরাণ নিয়েই তো জীবনটা কাটল। অন্য জিনিস ভালো করে পড়বার ফুর্সৎ পেলুম কই।
জিজ্ঞাসা করি, পুরাণের দেশ ভারতবর্ষে কয়জন লোক পুরাণের জন্য প্রাণ দেয়? একজনকে জানি বাঙালি মাত্রই তাকে জানে।
কিন্তু আজ এ শিবের গীত কেন?
এ সপ্তাহে দিল্লিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন জর্মন পণ্ডিত অধ্যাপক ডক্টর হেলমুট ফন গ্লাজেনাপ। বিষয় ছিল, জর্মনির ওপর ভারতীয় প্রভাব। সে বক্তৃতায় উপস্থিত ছিলুম।
শ্লেগেল থেকে আরম্ভ করে উইন্টারনিৎস-লডার্স পর্যন্ত তিনি পণ্ডিতের ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাস দিলেন। বয়স হয়েছে, স্মরণশক্তির ওপর আর নির্ভর করতে পারিনে, তবু টুকতে পারিনি।
তাই যেটুকু মনে ছিল তার সঙ্গে পিথৌরার অভিজ্ঞতা জুড়ে দিয়ে আপনাদের সামনে নিবেদন করলুম।
প্ল্যাজেনাপ তার বক্তৃতা শেষ করেন একটি প্রশ্ন জিগ্যেস করে এবং তার উত্তর দিয়ে।
জর্মনি ভারতীয় শাস্ত্র নিয়ে এত চর্চা করে কেন?
উত্তরে বলেন, উভয় জাতিই উচ্চ চিন্তাতে আনন্দ পায়।
আমরাও স্বীকার করি।
.
০৫.
ইংরেজ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সেবা করাতে, ফরাসি উত্তম ছবি আঁকতে, জর্মন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত রচনা করাতে কৈবল্যানন্দ অনুভব করে আর বাঙালি বলেছিলুম, তখুনি বলেছিলুম বলতে পারলে অর্থাৎ ভবিষ্যদ্বাণী করাতে সে সুপটু একথা সপ্রমাণ করতে পারলে জীবনে তার আর কোনও বাসনা থাকে না।
তাই আমিও আজ সোল্লাসে বলছি, বলিনি, তখন বলিনি শ্ৰীযুত মুখুজ্যে মশাইকে লাটসাহেব বানিয়ে ভারত সরকার অতি উত্তম কর্ম করেছেন? ভদ্রলোক মাইনে নেন নামমাত্র, আর আজ শুনতে পেলুম, তিনি নাকি বলেছেন, এত বড় বিরাট লাট-ভবনের তার প্রয়োজন নেই, তিনি মাত্র দু একখানি ঘর নিয়ে বাদবাকি অন্য কাজের জন্য ছেড়ে দেবেন।
কিন্তু একটা জিনিসে মনে একটু খটকা লাগল। শুনলুম, লাটবাড়ির ফালতো ঘরগুলোতে নাকি আপিস বসবে।
***
আমার জনকয়েক গুণী বন্ধুবান্ধবের বিশ্বাস তার চেয়ে যদি ওই ঘরগুলো দিয়ে কোনওপ্রকারের বৈদগ্ধ্যগত প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা যায়, তবে লাটবাড়ির সম্মান বজায় থাকবে, বাঙালিরও উপকার হবে।
এই ধরুন না, রবীন্দ্রভবন। কলকাতার কবি রবীন্দ্রনাথ। কলকাতা বাংলা দেশের রাজধানীও বটে। তবু এই কলকাতা শহরেই যদি আপনি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কোনও প্রামাণিক গ্রন্থ লিখতে চান, তবে আপনাকে একাধিক জায়গায় ছুটোছুটি করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সব জিনিস পাবেন কি না, সে বিষয়েও আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
লাটবাড়িতে এ ব্যবস্থাটা করলে হয় না?
কিংবা মনে করুন, একখানা উত্তম চিত্রশালা খুললে হয় না?
