অবশ্য আমার সাহস সম্পূর্ণ অন্য কারণে। আনন্দবাজারের স্কন্ধ কর্তন করিলেও সেই মহাজনগণ আপনাকে আমার বাসস্থানের উদ্দেশ দিবেন না। তাহারা নরহত্যার ঘোরতর বিরোধী। আপনার মঙ্গলও তাহারা সর্বান্তঃকরণে কামনা করেন।
***
প্রাচ্য-প্রতীচ্যের দার্শনিকগণ দেহলিপ্রান্তে সমবেত হইয়া সপ্তাহাধিক কাল নানা প্রকারের গবেষণা আলোচনা করিবেন। ইহাদিগের প্রধান উদ্দেশ্য হইবে কী প্রকারে উভয় ভূখণ্ডের জ্ঞানবিজ্ঞান একত্র করিয়া পৃথিবীতে সত্যশিবসুন্দরের শাশ্বত প্রতিষ্ঠা করা যায়।
ফ্রান্স, জর্মনি, সুইটজারল্যান্ড, ইতালি, ইংলন্ড, জাপান, মিশর, তুর্কি, সিংহল, আমেরিকা ও ভারতের দর্শন-শার্দূলগণ ইতোমধ্যে স্ব স্ব সহানুভূতি ও সহযোগিতা স্থাপন করিয়া পত্র বিনিময় করিয়াছেন।
দর্শনের সেবা করিবার সৌভাগ্য না ঘটিয়া থাকিলেও দার্শনিকদের সেবা করিয়াছি বলিয়া ইহাদের সকলেই আমার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত নহেন।
বিশেষত জর্মনির অধ্যাপক হেলমুট ফন প্ল্যাজেনাপ। সংস্কৃতে ইহার পাণ্ডিত্য গভীর এবং বর্তমান ভারতের সঙ্গেও তাহার বিলক্ষণ পরিচয় আছে। ইহার অন্যতম পুস্তক বুদ্ধ হইতে গাঁধী পুস্তক পাঠ করিয়া আমি পুনঃপুন সাধুবাদ দিয়াছি। ইনি একাধারে দার্শনিক, সাহিত্যিক, ঐতিহাসিক এবং আলঙ্কারিক। তাঁহার ভারত-প্রেম অতুলনীয়। ইনি জর্মনির পক্ষ হইতে ভারত আগমন করিবেন।
তাঁহার পিতা জর্মন ব্যাঙ্কে বহুকাল একচ্ছত্রাধিপত্য করিয়াছেন। তিনিও ভারতীয় বহু বিদ্যায় সুপণ্ডিত। স্পস্ট স্মরণ নাই, তবে বোধ হইত তিনি কবি ইকবালের সতীর্থ ছিলেন। তাঁহার কাব্যাংশ জৰ্মনে অনুবাদ করিয়া ইকবাল তাই লইয়া গৌরব অনুভব করিতেন।
পাঠক, দেহলি-প্রান্তের এই আসন্ন সভার প্রতি দৃষ্টি রাখিলে তুমি লাভবান হইবে।
.
০২.
কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা দপ্তরের প্রধান সেক্রেটারি ডক্টর তারাচান্দ ভারতীয় রাজদূতরূপে ইরান যাইতেছেন।
ডক্টর তারাচান্দ যুক্তপ্রদেশ তথা দিল্লি অঞ্চলে সুপরিচিত। সংস্কৃত, ফারসি আর উর্দু এই তিন ভাষাতে তাহার অসাধারণ পাণ্ডিত্য বহু বিদ্বজ্জনের প্রশংসা অর্জন করিতে সক্ষম হইয়াছে। ভারতে মুসলিম সংস্কৃতির আবেদন সম্বন্ধে তিনি যে গবেষণা করিয়াছেন, তাহাতে যে শুধু তাহার পাণ্ডিত্যই প্রকাশ পাইয়াছে তাহা নহে– চিত্র, সঙ্গীত, নাট্যকলায় তাঁহার সূক্ষ্ম রসানুভূতি তাঁহার পুস্তকরাজিকে সর্বাঙ্গসুন্দর করিতে সক্ষম হইয়াছে। দারাশিকুহর সম্বন্ধে তাহার প্রামাণিক প্রবন্ধ দেশে-বিদেশে অকুণ্ঠ প্রশংসা লাভ করিয়াছে। পণ্ডিত তারাচান্দ শব্দ এবং ধ্বনিতত্ত্বে সুপণ্ডিত বলিয়া দারার যুগের সংস্কৃত উচ্চারণ কিরূপ ছিল তাহা তিনি দারাকৃত সংস্কৃত শব্দের ফারসি লিখন পদ্ধতি হইতে উদ্ধার করিতে সমর্থ হইয়াছেন। তারাচান্দের সংস্কারবর্জিত মন হিন্দু-মুসলমান উভয় বৈদগ্ধ্যের সম্পূর্ণ সম্মান দিতে সক্ষম হইয়াছে।
ইরান এবং মিশরে এতদিন যাবৎ দুইজন মুসলমান ভারতীয় রাজদূত ছিলেন। কাজেই ওই দেশবাসীদের মনে এই ভুল ধারণা হওয়া অসঙ্গত নয় যে, ভারতবর্ষের হিন্দুরা বুঝি আরবি-ফারসির চর্চা করেন না এবং মুসলমানেরাও বুঝি সংস্কৃত, হিন্দি তথা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।
মৌলবি তারাচান্দ যখন উত্তম উচ্চারণ সহযোগে রুমি-সাদি, হাফিজ-আত্তারের বয়েত আওড়াইয়া ইরানের মজলিস-মুশায়েরা সরগরম করিয়া তুলিবেন তখন যে তিনি অকুষ্ঠ প্রশস্তিকীর্তন শুনিতে পাইবেন তাহার কল্পনা করিয়াও আমরা উল্লাস বোধ করিতেছি।
ডক্টর তারাচান্দের যাত্রা জয়যুক্ত হউক।
***
শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন অধ্যাপক এবং ছাত্র, নেপাল যাদুঘরের ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ শ্ৰীযুত বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের চিত্রপ্রদর্শনী দিল্লিতে সুরসিকজনের প্রশংসা অর্জন করিতে সক্ষম হইয়াছে।
হিন্দুর যেমন শাক্ত-বৈষ্ণব, মুসলমানের যেমন শিয়া-সুন্নি, ইংরেজের যেমন লেবার কনসারভেটিভ, দিল্লির তেমনি অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস অ্যান্ড ক্রাফ্টস্ সোসাইটি এবং শিল্পীচক্র। প্রথমটি আভিজাত্যাড়ম্বরে আমন্ত্রিত। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং অত্যন্ত অনটনের সময় অর্থমন্ত্রী ইঁহারাই এই প্রতিষ্ঠানের শিল্পপ্রদর্শনী উপলক্ষে হোতা হইবার অধিকার ধারণ করেন। বিদেশাগত যাবতীয় রাজদূতমণ্ডলী, তাহাদের ভামিনীকামিনীগণ নগরশ্রেষ্ঠী, ধর্মাধিকারী এবং তাহাদের পুত্রকলত্র এইসব প্রদর্শনীতে যোগদান করিবার জন্য যেসব রথ আরোহণ করিয়া আগমন করেন একমাত্র সেইগুলিকেই পরিবেক্ষণ করিবার জন্য রবাহূত অনাহূতগণ যজ্ঞশালার প্রান্তভূমিতে দ্বিতীয় শিল্পপ্রদর্শনীর আয়োজন করিয়া ফেলে।
উত্তম উত্তম চিত্র প্রদর্শিত হয়। দৈনিক মাসিক সর্বত্র সাধুবাদ মুখরিত হইয়া উঠে। নিজেকে ধন্য মনে করি। সার্থক আমাদের দিল্লিবাস!
আর শিল্পীচক্র নিতান্তই অঘ্রাহ্মণ শ্রেণির জনপদ প্রচেষ্টা। ইহাতেও উত্তম উত্তম চিত্র প্রদর্শিত হয়। মন্ত্রিবর্গ সচরাচর এই স্থলে আগমন করিবার সময় করিয়া উঠিতে পারেন না, তবে বিদেশাগত রাজদূতমণ্ডলীর সুরসিক দর্শকেরা শিল্পীচক্রকে অপাঙক্তেয় করিয়া রাখেন নাই। অনেকেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া অতিশয় সৌজন্যের সঙ্গে জীর্ণবাস শিল্পীর সঙ্গে আলাপ পরিচয় করেন। তাঁহাদের ললনাগণ উদার স্মিতহাস্যে শিল্পীকে আপ্যায়িত করেন।
