শৈলীর প্রভাব এ স্মৃতিসৌধ কতটা বহন করছে বিশ্লেষণ তারা করবে না। তাদের শেষ কথা, ভালো-লাগা মন্দ-লাগা এবং কলা-বিচারে সেই শেষ কথা। তবে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সম্পূর্ণ বিদেশি বন্ধু আমাদের জনসাধারণকে বেশিদিন রস দিতে পারে না। এ সৌধ আমাদের ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে যখন শিরোত্তোলন করেছে তখন আর যা হয় হোক, এ বস্তু নিন্দাভাজন হবে না।
অবিমিশ্র আনন্দের বিষয়, এ ঘাটের পরিকল্পনা করেছেন এক বাঙালি যুবক। তার নাম হবিবুর রহমান। ইনি শিবপুরের কৃতী ছাত্র ও পরে আমেরিকায় গিয়ে অনেক বিদ্যাভ্যাস, অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। এই পুণ্যকর্মের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে শ্রীমান দেশবাসীর আশীর্বাদ লাভ করবেন।
এ ঘাটে গঙ্গাবক্ষে স্নান করে দেশবাসীর দেহ পবিত্র হোক, মহাত্মার জীবন স্মরণে তাদের আত্মা মহান হোক।
ওঁ শান্তি, শান্তি, শান্তি।
[আনন্দবাজার পত্রিকা]
.
হজরত সৈয়দ নিজাম উদ-দীন চিশতি
সুলতান উল্-মশায়িখ (গুরু-সম্রাট), মহবুব-ই-ইলাহি (খুদার দোস্ত), হজরত সৈয়দ নিজাম উদ-দীন চিশতি, শেখ উল্-আওলিয়ার (গুরুপতি) ৬৪৬ পরলোকগমনোসব (উ) নিজাম উদ্-দীন দর্গায় মহা সমারোহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ মহাশয় অনুষ্ঠানে সভাপতি হবেন বলে কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ায় মৌলানা আবুল কালাম আজাদ সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি স্বহস্তে উর্দুভাষায় একখানি চিঠি লিখে তার অনুপস্থিতির জন্য দুঃখ জানান এবং শেখ নিজাম উদ-দীনের জীবনী সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতি সচরাচর হিন্দিতে চিঠিপত্র লিখে থাকেন বলে উর্দু-প্রেমী সভাস্থ হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টানগণ উর্দুর প্রতি তার এই সহৃদয়তা দেখে ঘন ঘন উল্লাস প্রকাশ করেন।
***
আফগান রাজদূত বলেন, শেখ নিজাম উদ-দীন আফগান এবং ভারতের সম্মিলিত আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক। খুরাসান-হিরাতে একদা সুফিতত্ত্বের যে চিশতি-সম্প্রদায় সৃষ্ট হয় নিজাম উদ-দীন সেই সম্প্রদায়ের অসাম্প্রদায়িক বাণী এদেশে প্রচারিত করেন। আফগান রাষ্ট্রদূত প্রদত্ত নিজাম উদ-দীনের পটভূমি এবং ইতিহাস বর্ণন পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং অতিশয় মনোরম হয়েছিল।
মিশরের রাজদূত বলেন, নিজাম উদ-দীনের বাণী সর্বসম্প্রদায়ের ভেদের অতীত ছিল বলেই তাঁর চতুর্দিকে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সমবেত হয়েছিলেন।
আজকের দিনের ভারতীয় রাষ্ট্রও সেই ধর্ম-নিরপেক্ষ ভিত্তিতে গড়া বলে সে রাষ্ট্র ভারতের ভেতরে-বাইরে বিশেষ করে মিশরে এতখানি আদৃত হয়েছে। নানা সম্প্রদায়ের লোক সভাতে উপস্থিত ছিলেন বলে তারা মিশর-রাষ্ট্রদূতের এই উক্তিতে ঘন ঘন করতালি দেন।
ইরাকের রাজদূত বলেন, আজ পৃথিবী আরেক বিশ্বযুদ্ধের সামনে এসে পড়েছে। আজকের দিনে সবচেয়ে বেশি দরকার শান্তির বাণী প্রচার করা। খাজা নিজাম উদ-দীন ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার করেছিলেন বলেই তিনি সব সমাজের এতখানি শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন।
ইরাকি এবং মিশরি রাষ্ট্রদূত দুজনেরই মাতৃভাষা আরবি। তারা ইংরেজি ভাষণের ফাঁকে ফাঁকে বিশুদ্ধ উচ্চারণে কুরান থেকে কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করেন। দিল্লির হিন্দু-মুসলমান শিখ অনেকেই আরবি জানেন, অন্তপক্ষে কুরান-তিলাওত (কুরান-পাঠ) শুনতে অভ্যস্ত। এদের কুরান উদ্ধৃতি ও মধুর আরবি উচ্চারণ শুনে সকলেই বড় আনন্দ লাভ করেন।
পাকিস্তানের রাজদূত যুক্তপ্রদেশবাসী- তাই তাঁর উর্দু উচ্চাঙ্গের। তিনি উর্দুতে বক্তৃতা দিলেন বলে জনসাধারণের সুবিধে হল। আর উর্দু সাহিত্যিক যারা ছিলেন, তাদের তো কথাই নেই। পাকিস্তানের রাজদূত বলেন, আমরা নিজাম উদ-দীনের বাণী জীবনে মেনে নিলে সাম্প্রদায়িক দ্বেষ-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হতে পারব।
সর্বশেষে মৌলানা সাহেব বক্তৃতা দেন। মৌলানা সাহেবের উর্দু ভাষার ওপর যা দখল তার সঙ্গে আর কারও তুলনা হয় না। বক্তা হিসেবেও তার জুড়ি এ দুনিয়ায় আমি দু একজনের বেশি দেখিনি। উচ্চারণ, বলার ধরন, শব্দের বাছাই, গলা ওঠানো-নামানো, যুক্তিতর্ক উপমার সিঁড়ি তৈরি করে করে ধাপে ধাপে প্রতিপাদ্য বিষয়ের দিকে গুরুচণ্ডাল সবাইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এসব তাবৎ বাবদে তিনি ভারতবর্ষের যেকোনো বক্তার সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারেন।
মৌলানা সাহেব বললেন, নিজাম উদ-দীনের বাণী যে কতখানি সফল হয়েছে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ চোখের সামনেই। এই যে হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান এখানে আজ ভক্তিভরে সমবেত হয়েছে তার থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, তাঁর বাণী সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ছিল– তিনি ইসলামের সেই শিক্ষাই নিয়েছিলেন, যে শিক্ষা কোনও বিশেষ ব্যক্তি, সমাজ বা ধর্মের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়, সে শিক্ষা সর্বধর্মের প্রতি সমান ঔদার্য দেখায়, তার নীতি এবং দণ্ড হিন্দু-মুসলমান-শিখ সকলের ওপর সমভাবে প্রযোজ্য।
***
অনুষ্ঠানটি হয়েছিল নিজাম সাহিত্যসভার আমন্ত্রণে। এক কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ (পণ্ডিত) যুবক সভার সম্পাদক। তিনি বিশুদ্ধ উর্দুতে যে একখানা আমন্ত্রণরচনা পাঠ করলেন, তা শুনে মনে হল অতখানি বাংলা জানলে রায় পিথৌরা বাংলা দেশে নাম করে ফেলতে পারতেন।
***
