হিন্দু বাচ্চেরা ব নিগর আজব হসন্ ধরত হৈ
দর ওকতে সুখ জদন মুহ ফুল ঝরত হৈ
গুম কে বি আর আজ লবেৎ বোসে বিগরিম–
গুফৎ আরে রাম! ধরম নষ্ট করত হৈ!
*
হিন্দু বাচ্চা কী অপূর্ব সৌন্দর্যই না ধারণ করে,
কথা বলার সময় মুখ থেকে যেন ফুল ঝরে।
বললুম, আয়, তোর ঠোঁটে চুমো খাব–
বললে, আরে রাম! ধর্ম নষ্ট করত হৈ!
অপ্রকাশিত পত্রাবলি – ১১
(১)
শান্তিনিকেতন,
২০।১।৬০
স্নেহের দীপংকর,
আমার আশ্চর্য বোধ হয়, রাজশেখরবাবু যে বাড়িতে আছেন, একদিন যে বাড়ির গদিতে তুমি বসবে, অর্থাৎ তিনি যে বেঞ্চিটায় বসেন সেটাতে বসে তুমি তারই মতো অতিথি অভ্যাগতকে আপ্যায়িত করবে তখন অন্য লোকের অটোগ্রাফ সঞ্চয় করার তোমার কী প্রয়োজন? ফার্সিতে বলে এক বাচ্চা-ই-বাবুর বস্ অস্ত (এর সবকটা শব্দই তোমার জানা থাকার কথা : বাবুর = সিংহ; বস্ = ব্যস = যথেষ্ট; অ = সংস্কৃত অস্তি) সিংহের একটি বাচ্চাই যথেষ্ট, কুকরীর মতো সে লিটার প্রসব করে না। আমাদের গুরুদেবও মধুরতর করে 261694, The rose which is single need not envy the thorns which are many! (কবি হাইনে আরেক কদম এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, এবং সিংহশিশু যখন কুকুরের চেয়েও ছোট থাকে তখনও তার ক্ষুদ্র আঁচড় থেকে বোঝা যায় ওটা সিংহের আঁচড়! এক বুড়ো রাবিশ কবি সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গ্যোটের ছেলেবেলার কবিতা থেকেও স্পষ্ট বোঝা যায় এটা সিংহ-শিশুর আঁচড়, অমুকের বৃদ্ধ বয়সের কবিতা থেকেও বোঝা যায় ওটা ইঁদুরের আঁচড়।)।
তাই রাজশেখরবাবুকে একখানা ডাইরি দিয়ে বললো, তাঁর মনে যখন যা কিছু আসে সেইটে যেন তোমার জন্য লিখে রাখেন। তুমি বড় হয়ে প্রতিদিন তারই মাত্র একটি করে পড়বে, এবং তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর সান্নিধ্য লাভ করবে।
আর শশিশেখরবাবুর* লেখা পড়ে আমার নিজের লেখার প্রতি ঘৃণা ধরে। এ লোকটা অত দেরিতে কলম না ধরে যদি যৌবনে আরম্ভ করতেন তবে আর সবাইকে কানা করে দিতেন। শুনেছি ওঁর পিতাও নাকি একটি খাণ্ডার ছিলেন। আমি যেদিন প্রথম রাজশেখরবাবুর নাম শুনি তখনই সন্দেহ করেছিলুম যে নামদাতা পণ্ডিত এবং রসিক লোক। তবু ভাবলুম, এটা হয়তো accident. তার পর যখন অন্যান্য ভাইদের নাম শুনলাম তখন আর মনে কোনও দ্বিধা রইল না।
[* শশিশেখর : শশিশেখর বসু। রাজশেখর বসুর অগ্রজ। ইনি পরিণত বয়সে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই সরস ও তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। তাঁর সবরকম লেখা অত্যন্ত উপভোগ্য ও পাঠকসমাজে আদৃত হয়। তার যা দেখেছি যা শুনেছি গ্রন্থখানি বিপুল সমাদর লাভ করে।]
আজ এখানেই শেষ করি। তুমি যখন বেআইনিভাবে রাজশেখরবাবুকে লেখা আমার চিঠি পড়েছ, তখন, সাধু সাবধান, খেয়াল রেখো, তিনি যেন বেআইনিভাবে তোমাকে লেখা আমার চিঠি না পড়েন।
শিগগিরই কলকাতাতে টেস্ট আরম্ভ হবে। তার প্রস্তুতির জন্য তোমাকে একটি কবিতা বেতারের ভাষায় স্বরচিত কবিতা) পাঠালুম। গত মার্চ মাসে ঢাকায় দেখি আমার এক ভগ্নী (এম.এ. পড়ে বাঙলায়, তবে রাতারাতির চিংড়ির মতো চটপটে নয়, লেখক মনোজবাবুর সঙ্গে তার দোস্তি) ঘড়ি ঘড়ি রেডিয়ো খুলে West Indies vs Pakistan খেলার স্কোর শুনছে। অথচ ক্রিকেটের ক অক্ষর তার কাছে গোমাংস কিংবা শূয়রের। তাকে এই কবিতাটি দিয়েছিলুম। ঢাকাতে লেখা বলে আরবি-ফার্সি শব্দের প্যাজ-ফোড়নটা কিঞ্চিৎ ঝাঝালো।
–আশীর্বাদক
সৈয়দ মু. আলী
.
(২)
শান্তিনিকেতন
১৫। ৩। ৬০
স্নেহাস্পদেষু,
তোমার তাবৎ লিখনই পেয়েছি। উত্তর কেন দিতে পারিনি সেটা বলতে গেলে আসল মহাভারত না হোক, রাজশেখরীয় মহাভারত নিশ্চয়ই ছাড়িয়ে যাবে। উর্দুতে বলে,
মুসিবৎ কা অহওয়াল্ হর এক্ এক্ সে কহ না–
মুসিবৎ সে হৈ অহ্ মুসিবৎ জ্যাদহ!
বিপদের কাহিনী প্রত্যেককে বয়ান করে বলার হ্যাপা আসল বিপদের চেয়েও বড় বিপদ।
তোমার দাদুকে একটু বাজিয়ে নিয়ে তো, আমি তাঁকে একখানা বই উৎসর্গ করতে চাই। তার অনুমতি আছে কি না? টাপে-টোপে ঠারেঠোরে শুধিয়ো। বেশ খুশিমনে যখন থাকেন। তোমাকে বলছি, বইখানা আমার সমজদার বন্ধুদের প্রশংসা পেয়েছে বলেই এ প্রগল্ভতা করছি।
রবীন্দ্রকাব্যের নতুন নতুন অর্থ শুধু নয়, এমন সব কঠিন প্যাসেজও আমি মোলায়েম করতে পারি যা অন্যে পারে না। আমি একটা দিগগজ নই– পারি অন্য কারণে। সেটা দেখা হলে বাতলে দেব।
ইতিমধ্যে এটার মানে কী বলো তো!
ওরে, এতক্ষণে বুঝি/তারা-ঝরা নিঝরের স্রোতঃপথে পথ খুঁজি খুঁজি/গেছে সাত ভাই চম্পা। যাত্রা, পূরবী, রচনাবলী ১৪ খণ্ড, পৃ-১৯। এখানে সবাই কাৎ। পূর্বেই বলেছি, আমি মেলা মুসিবতে আছি। আশীর্বাদ জেনো–
—সৈয়দ মু. আলী
.
(৩)
শান্তিনিকেতন,
১৯।৩।৬০
স্নেহাস্পদেষু,
আমি যখন লন্ডনে ছিলুম তখন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথও সেখানে ছিলেন। আমাকে শুধিয়েও ছিলেন, আমার কোনও-কিছু করে দেবেন কি না। বললেই তিনি খুশি হয়ে বার্ট্রান্ড রাসল বার্নার্ড শর নামে আমাকে চিঠি দিতেন। আমি চাইনি।
দলের দু একজন আমার ক্লাস-ফ্রেন্ড ছিল। হিটলার। যখন খ্যাতি-প্রতিপত্তির মগডালে তখন তারা চেপে ধরেছিল আমাকে হিটলারের সঙ্গে দেখা করতে। বলেছিল, ফুরারের মেলা গুণ আছে কিন্তু ভাষা বাবদে তুই জর্মন ভাষাতে যা জমাবি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যাইনি। আমি কোনও কালেই হিটলার-ভক্ত ছিলুম না।
