শিষ্য সবিনয়ে বলল, টোল খুলেছি।
গুরুর মস্তকে এটম বোমাঘাত! খানিকক্ষণ পরে সামলে নিয়ে শুধালেন, তা কী পড়াও?
শিষ্য বলল, আজ্ঞে সবকিছুই, তবে ব্যাকরণটা পড়াইনে।
গুরু আরও আশ্চর্য হয়ে বললেন, সে কী কথা? আমার যতদূর মনে পড়ছে তুমি তো ব্যাকরণটাই একটুখানি বুঝতে।
শিষ্য বলল, আজ্ঞে, তাই এটা পড়াতে একটুখানি বাধো বাধো ঠেকে।
***
রায় পিথৌরা যে সর্বাবদে এই শিষ্যটির মতো সেকথা আর লুকিয়ে রেখে লাভ কী? এই দেখুন না, দিনের পর দিন সে সম্ভব অসম্ভব কত বিষয়ে কত তত্ত্ব কথাই না বেহায়া বেশরমের মতো লিখে যাচ্ছে। কারণ? কারণ আর কী? সর্ববিষয়ে যার চৌকস অজ্ঞতা তার আর ভাবনা কী?
কিন্তু প্রশ্ন গবেট শিষ্য কিঞ্চিৎ ব্যাকরণ জানত বলে ওই বিষয়ে পড়াতে তার বাধো বাধো ঠেকত। পিথৌরার কি সেরকম কোনও কিছু আছে?
সেই তো বেদনা, সুশীল পাঠক, সেই তো ব্যথা।
মা সরস্বতী সম্বন্ধে কোনও কিছু লিখতে বড় বাধো বাধো ঠেকে। চতুর্দিকে গণ্ডা গণ্ডা সরস্বতী পুজো হয়ে গেল। আমি গা-ঢাকা দিয়ে, কিংবা পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি।
আর কোনও দেবতার সেবা করার মতো সুবুদ্ধি আমার হয়নি প্রথম জীবনে মা সরস্বতীই আমার স্কন্ধে ভর করেছিলেন আর আমি হতভাগ্য তাঁর সেবাটা কায়মনোবাক্যে করিনি বলে আজ আমার সবকিছু ভণ্ডুল বরবাদ হয়ে গিয়েছে। এখন মা সরস্বতীর দিকে মুখ তুলে তাকাতেও ভয় করে। হায়, দেবীর দয়া পিথৌরার প্রতি হয়েছিল, কিন্তু মুখ তাঁকে অবহেলা করে আজ এই নিদারুণ অবস্থায় পড়েছে।
হায়, আমি যদি আজ আমার এক বন্ধুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে পারতুম,
নিতান্ত বালক যবে পুরাণের দেব-সভাস্থলে
চুপে চুপে দেখিয়াছি ইন্দ্র যম বরুণের গলে
মন্দারের মালা আর হস্তে নানা রতন সম্পদ
বৈভব সৌন্দর্য কত। অপরূপ নর্ম লঘুপদ
উর্বশীর সম্মোহনী ইন্দ্রজাল নৃত্যচ্ছন্দময়
শুনেছি সুরের কণ্ঠে হর্ষধ্বনি আর জয় জয়।
লক্ষ্মীর বৈভব হেরি নিষ্কম্প তরুণ আঁখি মম,
মহেন্দ্র-অঞ্চলার পশ্চাতে ফিরিছে ছায়াসম।
হে পিথৌরা, আজি আমি লজ্জা নাহি মানি,
মুগ্ধ মোরে করেছিল সর্বাধিক শ্বেত বীণাপাণি।
কী মন্ত্রে সে ভানুমতী বালকের চিত্তাসনখানি
জয় করে নিয়েছিল; মর্ম তার আজও নাহি জানি।
ঊনবিংশ শতকের বাংলা দেশের প্রধান দার্শনিক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, পূজনীয় দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর কত যে এবং কী অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল তার সন্ধান বাঙলা দেশ আজ আর রাখে না। অথচ সমসাময়িক যুগে বাঙলার জ্ঞান দর্শনশাস্ত্র চর্চার ওপর তিনি যে গভীর প্রভাব রেখে গিয়েছেন তা সে সময়ের যেকোনও লেখকের রচনা থেকে বোঝা যায়।
সেই দার্শনিককে এক ব্যক্তি বলেন, আপনার মতো পাণ্ডিত্য বাঙলা দেশের কারও নেই- একমাত্র আপনিই বাঙলায় মন্দাক্রান্তা ছন্দে কবিতা লিখতে সক্ষম।
দ্বিজেন্দ্রনাথ আপন পাণ্ডিত্যের প্রতি ইঙ্গিত করে একখানি চতুষ্পদী মন্দাক্রান্তায় লেখেন।
ইচ্ছা সম্যক জগ দরশনে
কিন্তু পাথেয় নাস্তি
পায়ে শিকলি মন উড়ু উড়
এ কি দৈবের শাস্তি
টক্কা দেবী করে যদি কৃপা
না রহে কোনও জ্বালা
বিদ্যাবুদ্ধি কিছু না কিছু না।
শুধু ভস্মে ঘি চালা।
দ্বিজেন্দ্রনাথেরই যখন এই অবস্থা তখন আর আমাদের ভাবনা কী?
জয় মা বীণাপাণি!
.
২১.
স্বরাজ পাওয়ার পর একটা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সেটা কেউই লক্ষ করছেন না কারণ জিনিসটা চট করে চোখে পড়ে না।
স্বরাজ লাভের পূর্বে খুব কম বিদেশি ছেলেই ভারতে পড়াশোনা করতে আসত। পাঠক হয়তো আশ্চর্য হয়ে বলবেন, সেই তো স্বাভাবিক; আমাদের যে শিক্ষা-ব্যবস্থা তার থেকে তো সুস্থ মানুষ দূরে থাকতেই চাইবে। এদেশে আবার পড়াশোনা করতে আসবে কে? টাকা থাকলে আমরাই আমাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়াশোনা করতে পাঠাই।
কথাটা খুব ঠিক। বাঘা বাঘা যে সব ন্যাশনালিস্টরা ভারতীয় ঐতিহ্য ভারতীয় কৃষ্টির জিগির গেয়ে সভাস্থল গরম করে তোলেন তারা পর্যন্ত ছেলেমেয়েকে বিদেশি ঐতিহ্যের স্কুল-কলেজে পড়াবার জন্য তাদের অক্সফোর্ড-কেম্ব্রিজ পাঠান।
কিন্তু তৎসত্ত্বেও বিদেশি ছেলেরা ভারতে পড়তে আসে। তার প্রধান কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং পদ্ধতি যতই খারাপ হোক না কেন, আমাদেরই মতো কু-ব্যবস্থা মেলা প্রাচ্য দেশে এখনও মজুদ এবং আমাদের চেয়েও অধম ব্যবস্থা কোনও কোনও দেশে আছে।
***
মিশরের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় এদেশেরই মতো। তাই মিশরের লোক যদি এদেশে কালেভদ্রে আসে, তবে খুব বেশি আশ্চর্য হওয়ার কথা নয়। অবশ্যই মিশরীয়রা এদেশে আরবি পড়তে আসবে না– আমরা যেরকম সংস্কৃত পড়ার জন্য মক্কা কিংবা মদিনায় যাইনে। তাই যে মিশরি ছেলেটি এসেছে সে শিখতে চায় মোগল-চিত্রকলার ইতিহাস।
উপযুক্ত গুরুর হাতে পড়েছে; কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারলুম, ইতোমধ্যেই বেশ খানিকটা উন্নতি করতে পেরেছে।
***
আমার বিশ্বাস আমাদের চেয়েও অনুন্নত কিংবা আমাদের মতো দুর্ভাগা দেশের ছেলেরা প্রধানত আসবে ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি ইত্যাদি শিখতে কিছুদিন পূর্বে শুনতে পাই, ইরান থেকে নাকি কিছু ছেলে আসবে কৃষি-বিদ্যা শিখতে। এবং তার পর আসবে আমাদের চারুকলার নিদর্শন দেখতে এবং তার ইতিহাস শিখতে। সাহিত্য বা দর্শন শিখতে যে বেশি ছেলে আসবে না সে বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহ কারণ সংস্কৃত শেখার ব্যবস্থা ভারতের বাইরে প্রাচ্য দেশে নেই বললেও চলে, তাই তারা সে বাবদে প্রাথমিক উৎসাহ পাবে না এবং দর্শনের চর্চা আজ পৃথিবীর সর্বত্রই কমে আসছে।
