ওদিকে মানভূমি, সিংভূমের বাঙালির প্রতি আমাদের কর্তব্যবোধ ধর্মবোধও আছে। কোনও কোনও অদূরদর্শী বিহারিরা নাকি ওইসব অঞ্চল থেকে বাঙলা চর্চা তুলে দিতে চান– আমি হলফ করে কিছু বলতে পারব না, কারণ ওসব অঞ্চলে গিয়ে উকট সব সমস্যার সম্মুখীন হবার দায় থেকে শ্রীগুরু আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন; তাই যদি হয় তবে সেই-বা চোখ কান বন্ধ করে সয়ে নেব কী প্রকারে?
এই পিনসার মুভমেন্টের সামনে আমি হিমশিম খেয়ে গিয়েছি।
কিন্তু ঠিক এইখানেই তো পিথৌরাতে-শ্যামাপ্রসাদে তফাত। এ সমস্যার সমাধান পিথৌরা জানে না, দায়ও তার নয়; শ্যামাপ্রসাদ যদি শ্যামার প্রসাদ পান তবে সমস্যা-সমাধান করতে পারবেন বলে আশাকরি। না হলে নেতা হলেন কেন?
তবে শেষ কথা এই : তিনি নিজেই যা বলেছেন সেইটাই সত্যি। এ সমস্যার সমাধান তাঁকে করতে হবে তাঁর পার্টিগত দৃষ্টিবিন্দু বর্জন করে, একদম হানড্রেড অ্যান্ড টেন পার্সেন্ট নির্জলা, নির্ভেজাল খাঁটি বাঙালিরূপে।
এবং শ্যামাপ্রসাদের বাঙালিত্ব সন্দেহ করবে কে? যদি কেউ করে, তবে বিদ্যেসাগর মহাশয়ের ভাষাতে বলি (সাবধান, চ্যালেঞ্জ করবেন না, আমি গেল কয়েক মাস ধরে শুধু বিদ্যাসাগরই পড়েছি), তার বাপ নির্বংশ হোক!
বাঙালিকে একথা ভুললে চলবে না, সে বাঙালি। সে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রিশ্চান নয়– সে বাঙালি।
আমার পরম শুভানুধ্যায়ী, বিদ্রোহী বীর, পরলোকগত উপীনদা এ সম্বন্ধে নির্বাসিতের আত্মকথাতে যা লিখেছেন সেটা বাঙালি যেন বারবার পড়ে, উদয়াস্ত সেই মন্ত্র জপ করে।
একবার বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়লেই একথা সবাইকে মেনে নিতে হয়।
বাঙলা-সাহিত্যের আঁতুড়ঘর বৌদ্ধ-মন্দিরে–চর্যাপদ নিয়ে, বেদবেদান্ত নিয়ে নয়। তার পর তার বৈষ্ণব রূপ। আজ বৈষ্ণবধর্ম হিন্দু ধর্মের অঙ্গ, কিন্তু যে যুগে সে জন্মগ্রহণ করে সে যুগে সে ব্রাত্য–ব্রাহ্মণ চণ্ডীদাস ধোপানি রামীকে বলেছেন,
তুমি বেদ-বাদিনী হরের রমণী
তুমি হও মাতৃপিতৃ
ত্রিসন্ধ্যা যাজন তোমারে ভজন
তুমি বেদ মাতা গায়ত্রী।
এ যদি বিদ্রোহ না হয়, এ যদি স্বাধীন চিন্তাপদ্ধতি না হয়, তবে স্বাধীনতা কী? তার পর বাঙলা গদ্যের সূত্রপাত রামমোহন। তিনিও বিদ্রোহী— প্রচলিত হিন্দুধর্মের কতই না জঞ্জাল তিনি লৌহ-সম্মার্জনী দিয়ে পরিষ্কার করে দিয়ে গেলেন। তার পর বাঙলার শ্রেষ্ঠতম সন্তান বিদ্যাসাগর মহাশয়–তাকে বর্ণনা করার ভাষা আমার আয়ত্তের বাইরে–তিনিও সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন কর্মের বিজয়পতাকা তুলেছেন। তার পর মাইকেল–রাম রাম! তিনি তো কেরেস্তান; কিন্তু শুধাই, আজ এবং সে যুগেও কেউ তাঁকে তাই নিয়ে তাচ্ছিল্য করেছে? ওদিকে পূর্ব-বাঙলায় মুসলমানরা কেচ্ছা-সাহিত্য, মুর্শিদিয়া, জারি, দৰ্বেশি রচনা আরম্ভ করেছেন- হিন্দু দীনেশচন্দ্র তো সেগুলো অবহেলা করলেন না! আজ মৈমনসিংহী গীতকবিতা বাংলার অলঙ্কার। তার পর বঙ্কিম; তিনি তো বৃন্দাবনের রসরাজকে সর্বজনসমক্ষে খুন করলেন এবং আশ্চর্য, যে ব্রাহ্মসমাজ বৈষ্ণবধর্মকে তাচ্ছিল্য করে কদম্ববৃক্ষকে অশ্লীল বৃক্ষ বলেন আমার শোনা কথা– সেই সমাজের মহাপুরুষ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই থেকে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, রসরাজ চলে গেলে আমাদের থাকবে কী?)। এবং পশ্য, পশ্য, যে বাঙালি বঙ্কিমকে ঋষি উপাধি দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সে-ও রসরাজকে বর্জন করেনি। ঠিক ওই সময়ে কি না বলতে পারব না, কাঙাল হরিনাথের (কাঙাল যদি ছেলের মতো ছেলে হত তবে তুমি জানতে। কাঙাল জোর করে কোল কেড়ে নিত, তুমি পারতে না মা ছাড়তে) সখা মীর মশাররফ হোসেন বিষাদসিন্ধুতে মুসলমানের কারবালার কাহিনী লিখলেন; এ বই হৃদয়তাপের ভাপে-ভরা ফানুস, তত্ত্ব এতে নেই, তবু বাঙালি আজও সে বই কেনে। তার পর রবীন্দ্রনাথ তিনি কতখানি স্বাধীন চিন্তার প্রতীক ছিলেন সেকথা আপনারা আমার চেয়ে ঢের বেশি জানেন; তিনি হিন্দু নন, ব্রাহ্ম নন তিনি বাঙালি। তার পর সুকবি নজরুল ইসলাম। মুসলমান। তাঁর তখলুস্ (পেননেম) বিদ্রোহী কবি। একে মুসলমান, তায় বিদ্রোহী। অথচ বাঙালি হিন্দু তাকে কী শ্রদ্ধাই না দেখিয়েছে–আজও তাঁর জন্মদিনে তার রোগশয্যার চতুর্দিকে বহু বাঙালি জড় হয়। ক্ষীণ আশা নিয়ে যদি তিনি ক্ষণেকের তরে চৈতন্য পেয়ে আরও কিছু দেন (টুকরো খবর দ্রষ্টব্য)। সর্বশেষ পরশুরাম। তিনি আমাদের প্রচলিত ধর্ম নিয়ে যে উল্কট মশকরা করেন সে তো অবিশ্বাস্য। অন্য কোনও দেশ হলে বহু পূর্বেই তিনি লিচ, বার্নট এট দি স্টেক, কাফিররূপে কতলিত হতেন।
বাঙালি বাঙালি। হিন্দুধর্মের প্রতি তার সোহাগ নেই, মুসলমানকে সে অবহেলা করেনি, কেরেস্তানও তার ভাই। এরকম উদারতা কটা জাত, কটা সাহিত্য দেখিয়েছে?
আমি তো বিশ্বসাহিত্য জানিনে। অগ্রজপ্রতিম সখা শ্ৰীযুত সুনীতিকুমার জানেন। তিনিই বলুন না? ভুল প্রমাণ হলে দেহলিপ্রান্ত থেকে কলকাতা অবধি নাকে খৎ দেব।
অথচ কী আশ্চর্য! হিন্দুধর্ম বাঁচিয়ে রেখেছে বাঙালিই। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ এঁরা বাঙালি। আপনারা যদি সাহস দেন, তবে সে প্রলাপও একদিন নিবেদন করব।
উদ্ধৃতিতে ভুল থাকলে অপরাধ নেবেন না। এই পাণ্ডববর্জিত ইন্দ্রপ্রন্থে চণ্ডীদাস পাই কোথায়?
