আবুল ফয়েজ বলিলেন, বিলক্ষণ, কিন্তু মসালা এতই পাচিদা যে মুক্ত রাজবর্যে তাহার সমূহ আলোচনা ও সমস্যা-নিরূপণ সহজে সম্ভব হইবে না। এই তো কাওয়াখানা, চলুন চা খাইতে খাইতে শাস্ত্রালোচনা ও অন্যান্য বিবেচনা করা যাইবে।
অন্যান্য বিবেচনার কথা শুনিয়া মুহতসিবের দুষ্টমুখে মিষ্টহাসি খেলিয়া গেল– যেন কাবুলি বরফে সোনালি রোদ– বাঙলায় যাহাকে বলেগাছে না উঠিতেই এক কাদি!
কাওয়াখানায় ঢুকিয়া মোল্লা আবুল ফয়েজ ছোকরাকে দুইজনের জন্য চা আনিতে বলিলেন। আমি নিজের জন্য চার হুকুম দিতে গেলাম মোল্লা ফয়েজ আমাকে থামাইয়া বলিলেন, সে কী কথা, দুইজনের চা তো তোমার-আমার জন্য। মুহতসিব সাহেবকে আমরা চা খাওয়াইব কী করিয়া, সে তো রিশও দেওয়া হইবে; তওবা তওবা, সে বড় অপকর্ম, কবিরা গুণাহ, ওস্তাগফিরুল্লাহি রব্বি জম্বি মিন কুল্লি, ওতুবু ইলাইহি।
বলিয়া মুহসিবের দিকে কটাক্ষে চাহিয়া একগাল হাসিয়া লইলেন।
মুহতসিব রাগে সিদ্ধ-চিংড়ির রঙ ধারণ করিয়াছেন। তবে কাওয়াখানার পাবলিক অর্থাৎ আমাণুন্নাসের সম্মুখে হুংকার দিবার ঠিক হিম্মত না পাইয়া বলিলেন, ফিতরতি রাখ, সওয়ালের জবাব দে।
মোল্লা ফয়েজ বলিলেন, খাস আরবিতে ইস্তানা সুগাইর, অর্থাৎ ধৈর্যংকুরু; মসালা খয়নি পেচিদা অর্থাৎ বড়ই প্যাচালো। ঝটপট উত্তর হয় না, প্রথম বিবেচনা করা উচিত বায়দ দিদা শওদ– ইঁদুর কেন ইঁদারায় পড়িল? সেইসব মজবুত পোকাঁপোখতা মওজুদ না হওয়া পর্যন্ত জবাব অত্যন্ত কঠিন, বসিয়ার দুশওয়ার!
মুহতসিব চটিয়া বলিলেন, কী বাজে বকিতেছ, ইঁদুর ইঁদারায় পড়িয়াছে সেই তো কাফি।
মোল্লা ফয়েজ বারতিনেক অর্ধচক্রাকারে দক্ষিণ হইতে বাম দিকে মস্তকান্দোলন করিয়া বলিলেন, ওয়াহ ওস্তাদ! কারণ বিনা কার্যের অনুসন্ধান– বেগয়ের ওয়াজহ তফতিশ বিলকুল বেফায়দা। প্রথম মনঃসংযোগ করিয়া দেখিতে হইবে ইঁদুর কেন ইঁদারায় পড়িল। তাই তো বলিলাম, খসালা বসিয়ার পেচিদা। তবু আপনার তকদির ভালো–আমার মতো পাক্কা ফিকাহ জাননেওয়ালা পাইয়াছেন। শুনুন, আমার মনে হয়, ইঁদুরকে কোনও বিড়াল তাড়া করিয়াছিল, তাই সে প্রাণের ভয়ে ইঁদারার দিকে পালাইয়া যায় ও জলে ডুবিয়া মরে। নয় কি?
এই বলিয়া মোল্লা ফয়েজ আমার দিকে এমনভাবে তাকাইলেন যেন গভীর অতল সমুদ্র হইতে অতি উজ্জ্বল বহুমূল্য খনি উত্তোলন করিয়াছেন। সে তাকানোতে আত্মশ্লাঘা যেন ঝিলমিল করিয়া উঠিল।
আমি হাওয়া কোন দিকে বহিতেছে ঠিক আন্দাজ করিতে না পারিয়া অন্ধকারেই লোষ্ট্র নিক্ষেপ করিয়া বলিলাম, বেশক, আলবৎ, জরুর।
মোল্লা ফয়েজ পরম পরিতোষের দিলখুস হাসি হাসিয়া বলিলেন, দেখুন মুহতসিব সাহেব, দীনদুনিয়ার মামলায় নাদান এই নওজোয়ানও সায় দিতেছে। আচ্ছা, আবার মোদ্দা কথায় ফিরিয়া যাই। যখন প্রমাণসবুত হইল যে প্রাণরক্ষার্থে মূষিক কূপতলস্থ হইয়া পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়াছে তখন সে তো শহিদ। কারণ, কোন উলু জানে না, জান বাঁচানা ফর্জ? ফর্জকাম করিতে গিয়া ইঁদুর শহিদ হইল। তাহার কবর হইবে বিনা দফন কাফনে। তাহাই হইল। শহিদের লাশ পানি নাপাক করিবে কেন? পানি দুরুস্ত।
মুহতসিব দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া বলিলেন, সে কী কথা?
মোল্লা ফয়েজ তাড়াতাড়ি বাধা দিয়া বলিলেন, ইস্তান্না, ইস্তান্না সুগহির, সবুর, সবুর। মসলা মসাইলের মামেলা, ধীরেসুস্থে কদম ফেলিতে হয়। ইঁদুর মরিবার আরও তো কারণ থাকিতে পারে, সব কি আর নাই?
এ-ও তো হইতে পারে যে, ইঁদুর জান বাঁচানার ফর্জকামে মশগুল ছিল না। সে ইঁদারার কিনারায় খেল-কুদ করিতেছিল, হঠাৎ পা পিছলাইয়া পড়িয়া গিয়া জান কজ হইল। তাহা হইলে তো সে আলবত্তা শহিদ নহে। তবেই সওয়াল– আর সে সওয়াল আরও পেচিদা– ইঁদুরের দরজা কী? আমি বহুত তফতিশ করিয়া দেখিলাম, ইঁদুর যে খেল-কুদ করিতেছিল সে সম্পর্কে হদিস আছে। নওমুসলিম ও আনসাররা মদিনা শরিফে বহুত খেল-কুদ করিতেন কাফেরের সঙ্গে লড়িবার জন্য। লেহাজা কাজে কাজেই আনসাররা যাহা কর্তব্যকর্ম বিবেচনা করিয়া করিতেন তাহা নবির উপদেশ মতোই। অতএব ফর্জ কাজের ফায়দা না পাইলেও সে কর্ম সুন্নতুন্নবী, অর্থাৎ নবীর আদেশে-কৃত অতিশয় অনুমোদিত পুণ্য কাজ। তাহার লাশেও তো পানি না-পাক হইতে পারে না। কী বল, আগা, জান? শুধাইয়া মোল্লা ফয়েজ আরেক দস্ত হাসিয়া লইলেন।
মুহতসিব বেশ কড়া সুরে বলিলেন, দেখ, ওসব ঠাট্টা-মশকরার কথা নয়
সবুর সবুর, মোল্লা ফয়েজ বলিলেন সবুর করুন সরকার। বুঝিলাম, আপনার রসকস বিলকুল নাই। তবে মরুন গিয়া আপনার দশ ডোল না বারো ডোল পানি তুলিয়া পাড়ার যে কোনও মোল্লাকে জিজ্ঞাসা করুন, সে বাতলাইয়া দিবে। ভাবিয়াছিলাম, গুণীজনের সহবতে আসিয়াছেন, জখনি মসলা-মসাইল দুরুস্ত করিয়া লইবেন, সে মতলব যখন নাই তখন আমি বে-চারা না-চার। চল হে আগাঁজান, তুমি না হেকিমের বাড়ি যাইবে!
বাহির হইবার সময় শুনিলাম, কাওয়াখানায় অট্টহাস্যের রোল উঠিয়াছে।
.
বড়লাটি লাঠি
বড়লাট ভারতবর্ষের নেতাদের ডাকিয়া তাঁহাদের হাতে লাঠি দিতে উদ্যত হইয়াছিলেন; যাহাতে তাহারা গাঁটের খাইয়া মনের আনন্দে বনের মহিষ তাড়াইতে পারেন। নেতারা সে লাঠিটা আত্মসাৎ করিবার লোভে একে অন্যের বাড়িতে বিস্তর হাঁটাহাঁটি বিস্তর লাঠালাঠি করিয়া দেখিলেন ভাগ-বখরার প্রচুর বখেড়া। কেহ চায় সে লাঠির পাঁচ বিঘৎ, কেহ চায় তিন বিঘৎ, কেহ বলে লাঠিটা উদয়াস্ত বনবন করিয়া ঘুরিবে, কেহ বলে, না, যখন বড়লাটি লাঠি তখন লাট সাহেব ইচ্ছা করিলেই বন্ধ করিয়া দিতে পারিবেন। ইত্যাকার বাক্য বিনিময় মনোমালিন্যের পর যখন কিছুতেই কোনওপ্রকার চরম নিষ্পত্তি হইল না, তখন লাট সাহেব প্রকাশ্যে অশ্রুবর্ষণ করিয়াও গোপনে সানন্দে মৌলা আলিতে মানত পূর্ণ করিয়া লাঠিখানা মাচাঙে তুলিয়া রাখিলেন। লাঠিখানি তিলোত্তমার কার্য উত্তমরূপে সমাধান করিয়াছে। ভবিষ্যতে যদি দেখা যায় আবার সুন্দ-উপসুন্দ ভাই-ব্রাদার হইয়া কৌসিল রণাঙ্গনে দেবতাদের পর্যুদস্ত করিবার উপক্রম করিয়াছে, তাহা হইলে শুষ্ক যষ্টিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।
