১৯২৮-২৯-এর শীতকালে কাবুলের রাস্তায় একদিকে লুটতরাজ অন্যদিকে মুহতসিব।
আমাকে একদিন ওই সময় বিশেষ কর্মোপলক্ষে বাহির হইতে হইয়াছিল। বিশেষ কি, অত্যন্ত বিশেষ কর্ম থাকিলেও তখন কেহ বাহির হইত না। কারণ যেখানে মরণ-বাচন সমস্যা সেখানে রাস্তায় নিশ্চয় প্রাণ দিতে বাহির হইবে কে? কিন্তু আমি নিতান্ত নিরুপায় হইয়া দুইটি প্রাণ বাঁচাইবার জন্য বাহির হইয়াছিলাম– বন্ধুবরকে রাখিয়া গিয়াছিলাম তাহার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে সাহস দিতে ও নিজে ডাক্তারের সন্ধানে।
পথে মোল্লা আবুল ফয়েজের সঙ্গে দেখা। তিনি ছিলেন মকতব-ই-হবিবিয়ার ধর্মশাস্ত্র বা দীনিয়াতের অধ্যাপক আমার সহকর্মী। মোল্লাজি ছিলেন পরস্পরবিরোধী আচার-বিশ্বাসের মনোয়ারি জাহাজ। দেওবন্দের টাইটল কোর্স পাস ভাষ্যকর দিগগজ মৌলানা– অথচ পরিতেন সুট, পাগড়ি না– কারাকুলি টুপি অথবা ফেল্ট হ্যাট, গোঁফ ছিল কিন্তু দাড়ি অতি নিয়মিত কামাইতেন! নামাজ কড়াগণ্ডায় আদায় করিতেন, রোজা ফাঁকি দিতেন না; কিন্তু অন্য কোনও ধর্মকর্ম বা ধর্মালোচনায় কখনও তাঁহাকে লিপ্ত হইতে দেখি নাই। অনুসন্ধিৎসু হইয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে উত্তর দিতেন; কিন্তু কলেজের অন্যান্য মোল্লাদের সঙ্গে মসলা-মসাইল লইয়া কখনও বাকবিতণ্ডা করিতেন না। আমানউল্লার পক্ষ লইয়া হামেশা লড়িতেন এবং আফগানিস্তানের স্বাধীনতা রক্ষা করার একমাত্র উপায় যে ইংরেজ-রুশকে বাঁদরনাচ নাচাইয়া সে বিষয়ে তাহার মনে কোনও সন্দেহ ছিল না। প্রকাশ্যে সেই রায়ই জাহির করিতেন।
তাঁহাকে রাস্তায় পাইয়া যেন জান কলবে ফিরিয়া আসিল। কিন্তু তাঁহার বেশভূষা দেখিয়া আমার সেই কলব ধুকুধুকু করিতে লাগিল। বাচ্চার ভয়ে তখন বিদেশি ছাড়া কেহই সুট পরিবার সাহস করিত না। প্যারিস-ফের্তা পয়লা নম্বরের কাবুলি সায়েবরা তখন কুড়িগজি শেলওয়ার ও বাইশ-গজি পাগড়ি পরিতে আরম্ভ করিয়াছে। অথচ দেখি মোল্লা আবুল ফয়েজ সেই মারাত্মক চেকের কোটপাতলুন পরিয়া নির্বিকারচিত্তে ছড়ি ঘুরাইতে ঘুরাইতে চলিয়াছেন। আমাকে দেখিয়া আলিঙ্গন করিলেন ও আমার মৃদু আপত্তি সত্ত্বেও আমাকে আমার গন্তব্যস্থানে পৌঁছাইয়া দিবার প্রস্তাব নিজেই করিয়া নিজেই বহাল করিলেন। আমি তাহাকে ওই উল্কট সঙ্কটের সময় কেন সুট পরিয়াছেন জিজ্ঞাসা করিতে যাইব এমন সময় কোথা হইতে এক ভীষণ-দর্শন মুহতসিব ততোধিক রোমাঞ্চন প্রজনন চাবুক হস্তে লইয়া আমাদিগকে ক্যা করিয়া ধরিল।
আমার দিকে তাকাইয়া মুহতসিবজি বলিলেন, আপনি (শুমা) বিদেশি, আপনার উপর আমার কোনও হক নাই। আপনি যাইতে পারেন।
বান্ধব-ত্যাগ সংকটের সময় অনুচিত। বিশেষত সেই বান্ধব ত্যাগ করিয়া যখন বৈদ্যরাজের বাড়িতে একা যাওয়া ততোধিক অনুচিত অর্থাৎ প্রাণহানির সম্ভাবনা। সবিনয়ে বলিলাম, হুজুর যদি ইজাজত দেন তবে দোস্তের আখেরি হাল কী হয় দেখিয়া যাইবার ইরাদা। মুহতসিব বিরক্তির সঙ্গে বাঞ্ছিত ইজাজত মঞ্জুর করিলেন।
এদিকে দেখি মোল্লা আবুল ফয়েজ ঊর্ধ্বমুখে, নির্বিকারচিত্তে কাবুল পর্বত-গাত্রে চিনার পত্রে সূর্যরশির ক্রীড়াজনিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অভিনিবেশ সহযোগে নিরীক্ষণ করিতেছেন। কোন বিপদে, কোন ভাবে, তাহার খেয়ালই নাই।
মুহতসিবের মুখ দিয়া তখন শিকার ভোজনের লালা পড়িতেছে। সুটপরা কাবুলি! বেদীন নিশ্চয়ই দীনের দও জানে না, ইহাকে দীনিয়াতের তর্ক-বিতর্কের দয়ে মজাইতে ডুবাইতে কতক্ষণ। তার পর বিলক্ষণ অর্থাগম।
হায় মুহতসিব, তোমার হাতে চাবুক থাকুক আর না-ই থাকুক, জানিতে না কোন বাঘার খপ্পরে পড়িয়াছ!
হুঙ্কার দিয়া, শহর-আরা হইতে চিল-শকুন প্রকম্পিত করিয়া, মুহতসিব জিজ্ঞাসা করিলেন, বল তো দেখি (ফারসিতে দুইরকম সম্বোধন আছে, শুমা অর্থাৎ আপনি বা তুমি, আর তু অর্থাৎ তুই অপরিচিত কাহাকেও তু বলা অভদ্রতার চরম লক্ষণ) কোনও ইঁদারায় ইঁদুর পড়িয়া মরিয়া গেলে, সেই ইঁদারা হইতে কয় ডোল পানি তুলিলে পর সেই পানি নামাজের জন্য পুনরায় পাক বা জাহিজ হইবে?
প্রশ্নটি কিছু সৃষ্টিছাড়া নহে। কিন্তু সাধারণ নাগরিককে এহেন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা দুষ্টবুদ্ধির কর্ম। মুহতসিবের কর্তব্য সাধারণ নাগরিককে নিত্য অবশ্য প্রয়োজনীয় নামাজ রোজা সংক্রান্ত প্রশ্ন করা, সেগুলি না জানিলে ফর্জকর্মগুলো আদায় করা যায় না। ইঁদারা। কোন অবস্থায় পাক আর কোন অবস্থায় না-পাক এ প্রশ্নের উত্তর দিবেন আলিম মৌলবি-মৌলানারা। কারণ কাহারও ইঁদারায় ইঁদুর পড়িলে ব্যাপারটা এমন কিছু জরুরি দীন-ঘাতি নয় যে, তাহার ফৈসালা না জানিলে তদ্দণ্ডেই কাফির হইয়া যাইবার সমূহ সম্ভাবনা। সাধারণ নাগরিককে এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার অর্থ আর কিছুই নহে, তা হোকে বিপদারণ্যে নিক্ষেপ করা ও তৎপরে গুলি করিয়া তাহার মাংস ভক্ষণ করা।
দেখি মোল্লা আবুল ফয়েজ তখনও তাঁহার সঙহিট গুনগুন করিতেছেন–
শবি আগর আজ লবে ইয়ার বোসনেয় তলবম
জোয়ান শওম, জসেরো জিন্দেগি দুবারা কুনম।*
[* আজি এ নিশীথে প্রিয় অধরেতে চুম্বন যদি পাই
যৌবন পাব, গোড়া হতে হবে এ জীবন দোহরাই।]
মুহতসিব এবারে দারুল আমান হইতে খাক-ই-জব্বার পর্যন্ত বিদীর্ণ করিয়া চিৎকার করিলেন, শুনিতে পাস নাই?
