‘তখন স্থির হল পাল্লা দিয়ে দুজনে মিথ্যে কথা বলবে, যে সব চেয়ে বেহুদা বেশিরম মিথ্যে বলতে পারবে, টাকাটা সে-ই পাবে।
তখন ট্যুনিস বিসমিল্লা বলে আরম্ভ করলে,–
‘পরশুদিন ঘরে মন টিকছিল না বলে বাইরে এসে এক লম্ফে চলে গেলুম আমেরিকায়। সেখানে পৌঁছলুম এক সমুদ্রপারের লিডোতে। দেখি হাজার হাজার মেয়েমদ সেখানে চান করছে, সাঁতার কাটছে। আর ছুড়িগুলো কী বেহায়া! আমার এই একটা নেকটাইয়ের কাপড় দিয়ে তিনটে মেয়ের সুইমিং কস্ট্রম হয়ে যায় (ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘পেটার, আবার?’ নয়রাট বললেন, আচ্ছা, আচ্ছা, টাপোটোপে বলছি’ ) আমার ভয়ঙ্কর রাগ হল। করলুম কি, সব কটা হুলো-মেনিকে ধরে একটা ব্যাগে পুরে দিলুম আরেক লাফ। এবারে পৌঁছলুম, ফুজি-আমা পাহাড়ের কাছে। ব্যাগের ভিতর তিন হাজার বেড়াল ক্যাঁও ম্যাও করছিল বলে আমার দারুণ বিরক্তি বোধ হল। তাই আস্ত ব্যাগটা গিলে ফেলে গোটা আড়াই ঢেকুর তুললুম, তারপর-’
‘শেল বাধা দিয়ে বললে, ‘এতে আর মিথ্যে কোনখানটায় হল? আমি তো তোর সঙ্গেই ছিলুম, পষ্ট দেখলুম, তুই এসব করছিলি।’’
ফ্রানৎসিস্কা গল্পটা আগে শোনে নি বলে হাসলেন। আমিও বললুম, ‘এ গল্পটা ভারি নতুন ধরনের। শেলের উত্তরটা অত্যন্ত আচমকা একটা ধাক্কা দিলে।’
নয়রাট বললেন, ‘গল্পটা এখনো শেষ হয় নি।’
আমরা বললুম, ‘সে কি কথা?’
চীনা পদ্ধতি এসে গিয়েছে। এ গল্পে দুটো ‘সারপ্রাইজ’, কিংবা বলতে পারেন দুটো কিক আছে। খুলে বলছি;
‘ট্যুনিস আর শেল যখন রাইন নদীর পাড়ের রেলিঙে ভর করে মিথ্যের জাহাজ ভাসাচ্ছিল, তখন এক পাস্ত্রী সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যস্তসৌন্দর্য নিরীক্ষণ করছিলেন। অনিচ্ছায় কিংবা স্বেচ্ছায়ও হতে পারে, ট্যুনিস শেলের বিকট মিথ্যের বহর তার কানে এসে পৌঁছেছিল। থাকতে না পেরে বললেন, ‘ছি, ছি, বাছারা; এ-রকম ডাহা মিথ্যে তোমরা মুখ দিয়ে বার করছে কি করে? জানো না, মিথ্যা কথা মহাপাপ? আমি জীবন কখনো মিথ্যা বলি নি।’
‘ট্যুনিস পাদ্রীর কথা শুনে প্রথম হ’কচাকিয়ে গেল, তারপর থ মেরে গেল। সম্বিতে ফিরে শেষটায় ক্ষীণকণ্ঠে, বাজি হারার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে শেল্কে বললে, “ভাই শেল্ নোটটা ওকেই দে, টাকাটা ওরই পাওনা। তুই এ-রকম পাঁড় মিথ্যে বলতে পারবি নে; আন্মো পারবো না।’’
আমি বললুম, ‘খাসা গল্প; এটা মনে রাখতে হবে।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘কিন্তু আমি জানি, পেটার ওখানে থাকলে প্রাইজটা সে-ই পেত।’
আমি নয়রাটকে বললুম, ‘গল্পটি সুন্দর, কিন্তু এতে টিপিকাল কলোনের কি আছে? আমাদের মোল্লা-পুরুত সম্বন্ধেও তো এরকম বদনাম আছে।’
নয়রাট বললেন, ‘আমি জানতুম না। তবে শুনুন আরেকটা-আর এর জবোব আপনি দিতে পারবেন না!
‘ট্যুনিস-শেল আবার একখানা দশ টাকার নোট পেয়েছে (ট্যুনিস-শেল সাইক্লের ভিতরে এ হচ্ছে ‘নোটের সাব-সাইকেল’)। এবারে ঝগড়া হয় নি। দুজনে সেই টাকা দিয়ে মদ খেয়ে বেহুঁশি হয়ে পড়েছে রাস্তায়। পুলিশ তাদের পৌঁছে দিয়েছে হাসপাতালে। সকালবেলা তাদের ঘুম ভেঙেছে আর নেশা কেটেছে। দেখে চতুর্দিক ফিটফট, ছিমছাম। ট্যুনিস শুধালে, ‘ওরে শেল, এ আবার এলুম কোথায়?’ শেল বললে, ‘আমিও তাই ভাবছি। দাঁড়া, দেখে আসছি।’
‘শেল গেল। ঘরের বাইরে। পাঁচ সেকেন্ডের ভিতর ছুটে এসে বললে, ‘ওরে ট্যুনিস–আমরা ভারতবর্ষে পৌঁছে গিয়েছি।–রাতারাতি আমাদের ভারতে পাচার করে দিয়েছে।’
ট্যুনিস তো তাজ্জব। শুধালে, ‘কি করে জানলি?’
‘বললে, ‘করিডরে মোটা হরপে লেখা আছে, ‘Die Toiletten befinden sich auf jenseits des Ganges’.’
নয়রাট বললেন, ‘অর্থাৎ, ‘করিডরের দুপাশে বাথরুমের ব্যবস্থা আছে।’ এখন ‘করিডর’ শব্দ জর্মনে Gang আর Gang-এর দুপাশে–অর্থাৎ ষষ্ঠীতৎপুরুষ Ganges, তার মানে বাথরুম গঙ্গার (নদীর) দুপারে।’
‘তই ট্যুনিস-শেল রাতারাতি ভারতে পৌঁছে গিয়েছে।’
নয়রাট বললেন, ‘দেশভ্রমণের গল্পই যদি উঠল। তবে সেই সাব-সাইক্লই চলুক।’
আমি বললুম, ‘উত্তম প্রস্তাব।’
নয়রাট বললেন, ট্যুনিস-শেল পেটের ধান্দায় হামবুর্গ গিয়ে জাহাজের খালাসির চাকরি নিয়ে পোঁচেছে গিয়ে ইস্তাম্বুল শহরে, সেখানে–’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘না, পেটার, ওটা চলবে না।’
নয়রাট ব্যথা-ভরা নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, ‘গল্পটা কিন্তু ছিল খাসা; তার আর কি করা যায়! তবে তাদের নিয়ে যাই নিউ ইয়র্কে।
‘হয়েছে কি, টুনিসের এক মামা নিউ ইয়র্কে দুপয়সা রেখে মারা গিয়েছে। ট্যুনিস উকিলের চিঠি পেয়েছে তাকে সেখানে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজের সনাক্ত দিয়ে টাকাটা ছাড়িয়ে আনতে হবে। ওদিকে ট্যুনিস আবার ভয়ানক ভীতু ধরনের লোক। এক বিদেশ যেতে ডরায়-শেলকে বললে, ‘ভাই, তুই চ।’ শেল ভাবলে—আর আমিও তাই ভাবতুম–মন্দ কি, ফোকটে মার্কিনমুলুকটা দেখা হয়ে যাবে।
‘তারা নিউ ইয়র্ক পৌঁছিল। ঠিক বড়দিনের দিন। তামাম মার্কিন দেশ বেঁটিয়ে এসে জড়ো হয়েছে নিউ ইয়র্কে পরাব করার জন্য, সব হোটেল আগাগোড়া ভর্তি, করিডরে পর্যন্ত ক্যাম্প কটু পেতে শোবার ব্যবস্থা ফালতো গেস্টদের জন্য করা হয়েছে।
‘মহা দুর্ভাবনায় পড়ল দুই ইয়ার। ডিসেম্বরের শীতে আশ্রয় না পেলে শীতেই অক্কালাভ। দুই বন্ধু কলোন গির্জের মা-মেরিকে স্মরণ করে এক ডজন মোমবাতি মানত করলে। আপনি তো মুসলমান, এসব মানেন না, কিন্তু–’
