আমি বললুম, আলবত মানি। একশবার মানি। কলকাতায় মৌলা আলীর দৰ্গায় মোমবাতি মানত করলে বহু বাসনা পূর্ণ হয়। আর আমাদের দেশে এমন জায়গাও আছে যেখানে মানত করলে মোকদ্দমা পর্যন্ত জেতা যায়।’
ফ্রানৎসিস্কা শুধালেন, ‘ডিভোর্স পাবার দরগা আছে?’
আমি বললুম, বিলক্ষণ, তবে সেখানে স্বামী-স্ত্রীকে একসঙ্গে গিয়ে কামনোটা জানাতে হয়।’
নয়রাট আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ তারপর গল্পের খেই তুলে নিয়ে বললেন, ‘কলোনের মা-মেরি বড় জাগ্ৰত দেবতা। একটা হোটেলে শেষটায় একটা ডবল রুম জুটে গেল, কিন্তু ব্যবস্থাটা শুনে দুই ইয়ারই আঁতকে উঠলেন।
‘ঘর পঞ্চাশ তলায়, আর লিফট্ৰ বিগড়ে গিয়েছে!
‘দুইজনই একসঙ্গে বললে, ‘হে মা-মেরি, এতটা দয়াই যখন করলে, তখন লিফট্টা সারাতে পারলে না মা?’
আমি বললুম, ‘আমাদের গোপালভাড়াও তাই বলেছিল,–
’এত দয়াই যদি করলি, মা কালী,
তবে আরেকটু দয়া করে,
বনে আছে দেদার ফড়িং
খা না দুটো ধরে।’
নয়রাট বললেন, ‘গল্পটা কি?’
আমি বললুম, ‘আপনাকে একদিন সময়মত আমাদের ‘গোপালভাঁড়-সাইক্ল’ শোনাব, তার অনেকগুলি ফ্রানৎসিস্কার সামনে বলা চলবে না।
নয়রাট বললেন, ‘তবে নিয়ে চলুন আপনাদের ডিভোর্স-দর্গায়।’
সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে ফ্রানৎসিস্কা ভাড়ারঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। আমি বললুম, ‘অত তাড়া কিসের? ভারত যাবার জাহাজ আরো সপ্তাহখানেক পর ছাড়ে।’
নয়রাট বললেন, ‘তখন ট্যুনিস শেলকে বললে, ‘ভাই, এ ছাড়া আর উপায় যখন নেই তখন চ্য, সিঁড়ি ভাঙি আর কি?’
‘শেল বললে, ‘একটা ব্যবস্থা করলে হয় না, প্রতি তলা উঠতে উঠতে তুই এক-একটা করে গল্প বলবি আর তাতেই মশগুল হয়ে আমরা পঞ্চাশতলা বেয়ে নেব। তুই তো মেলা গল্প জানিস।’
ট্যুনিস বললে, ‘যা বলেছিস, সাধে কি আর তোকে সঙ্গে এনেছিলুম? তবে শোন,’ বলে আরম্ভ করলে সিঁড়ি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে গল্প-বলা।’
নয়রাট বললেন, ‘সে কত বাহারে গল্প! আমি গল্প কলেকটু করি নে, কিন্তু আমার এক বন্ধু আছেন, তাঁর সঙ্গে আমি আপনাকে আলাপ করিয়ে দেব, তিনি সব কটা জানেন।
‘তা সে কথা থাক।’
ট্যুনিস আর শেল এক এক তলার সিঁড়ি ভাঙে আর ট্যুনিস এক-একখানা জান–তর-র-র গল্প ছাড়ে। হেসেখেলে বিন-মেহন্নত, বিনা-কসরতে তারা পাঁচশতলা এক ঝটিকায় মেরে দিলে।
তখন ট্যুনিস বললে, ‘ভাই শেল, আমার সব গল্প খতম। আর কোন গল্প মনে পড়ছে না।’
‘তখন শেল বললে, ঘাবড়াস নি। আমারো কিছু পুঁজি আছে।’
বলে তখন শেল আরম্ভ করল গল্প বলতে। সেও কিছু কম বাহারে নয়, তবে ট্যুনিস তালেবর ব্যক্তি, তার সঙ্গে তুলনা হয় না।
‘করে করে তারা আরো চব্বিশখানার সিঁড়ি ভাঙলে-গল্প বলার সঙ্গে সঙ্গে।’
‘মাত্র একতলা বাকি। শেল দুম করে মাটিতে বসে পড়ল। এক ঝটিকায় হোক আর উনপঞ্চাশ ঝটিকায়ই হোক পা-গুলো তো আর গল্প শুনতে পায় না। শেল ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়ে বললে, ‘ভাই আমার গুদোমও খতম।’
‘তখন টুনিশ বললে, ‘কুছ পরোয়া নদীরদ। আমার একখানা গল্প মনে পড়েছে— একদম সত্যি গল্প। —আমরা ফ্রাটের চাবি সঙ্গে আনতে ভুলে গিয়েছি।’
***
লঞ্চ খেতে এসে তখন প্ৰায় চায়ের সময় হয়ে গিয়েছে অথচ গাল-গল্পের কম্বলের ভিতর এমনি ওম জমে গিয়েছে যে সে কম্বল ফুটো করে বেরতে ইচ্ছে করে না। শীতের দেশ তো-উভয়ার্থে শীতের দেশ, ইয়োরোপীয়দের মনেও শীত; আড্ডা জমিয়ে সঙ্গ-সুখের আলিঙ্গনে সেটাকে গরম করতে জানে না-তাই এদের কুণ্ডুলিতে বহুদিন পরে যেন বসন্ত রেস্টুরেন্টে’র আনন্দ পেলুম।
শেষটায় একটা হাফ-মোক পেয়ে বললুম, ‘আমি তা হলে উঠি।’
নয়রাটি একটি কথা বললেন, ‘কেন?’
আমি একটু অবাক হয়ে গেলুম। এরকম অবস্থায় সচরাচর বলা হয়, ‘সে কি কথা? এখনই যাবেন কেন?’ কিংবা ‘বড় কাজ পড়ে আছে বুঝি?’ অথবা অন্য কিছু। আমার কোনো জবাব যোগাল না।
নয়রাট বললেন, ‘দেখুন মশাই, আপনাকে বলি নি, কিন্তু আপনাকে আমি বিলক্ষণ চিনি। গোল কয়েকদিন ধরে যখনই লেকের পাঁড় দিয়ে কাজকর্মে কোথাও যেতে হয়েছে, তখনই আপনাকে দেখেছি, ঐ একই বেঞ্চের উপর-তাও আবার একই পাশে-বাসে আছেন। শুনেছি, ইংলন্ডের পার্কে চেয়ারে বসলে তার জন্যে ট্যাক্স দিতে হয়—’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘সেখানে দম ফেলতেও ট্যাক্স দিতে হয় এবং তারই ভয়ে কেউ যদি দম বন্ধ করে, তবে মরে গিয়ে তাকে ডেথ ট্যাক্স দিতে হয়।’
নয়রাট বললেন, ‘তাহলে বিবেচনা করি সেখানে বিয়ের উপরও ট্যাক্স আছে। আহা, ইংলন্ডে জন্মালে হত।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘আহা আমি যদি তিব্বতে জন্মাতুম। সেখোন প্রত্যেক রমণীর পাঁচটা করে স্বামী থাকে, আর সব কটাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়।’
আমি বললুম, ‘ষাট, ষাট (ইংরেজিতে tut-tut), ও রকম অলুক্ষণে কথা কইবেন না।’
সমস্বরে, ‘কেন?’
আমি বললুম, ‘তাহলে আসছে জন্মে পেটারকে জন্মাতে হবে ইংলন্ডে আর মাদাম ফ্রানৎসিস্কা (বলে তাঁর দিকে ‘বাও’ করে বললুম), আপনাকে জন্ম নিতে হবে তিব্বতে।’
দুজনাই কিচির-মিচির করে উঠলেন। তার থেকে যে প্রশ্ন ওতরালো তার মোটামুটি জিজ্ঞাসা, ‘আসছে জন্মে’ কথাটার মানে কি? আমরা তো মরে গিয়ে হয় স্বগে যাব, কিংবা নরকে, কিংবা কঙ্গুর হয়ে যাব, ‘আসছে জন্মে’ তার অর্থ কি?
আমি বললুম, ‘এই যে পেটার শুধালেন, আমি বেঞ্চিতে সর্বসময় বসে থাকি কেন? তার অর্থ আমি চলাফেরা, হাঁটাহাঁটি করি না কেন? সুইটুজারল্যান্ডে যদি ইংলিশ কায়দায় বেঞ্চিতে বসতে হত তাহলে ট্যাক্স দিয়ে দিয়ে আমি ফতুর হয়ে যৌতুম সেকথা আমি খুব ভালো করেই জানি কিন্তু চলাফেরা করলে আমাকে খেসারতি দিতে হবে অনেক বেশি।’
