আমি বললুম, ‘এস্তার! হর-পার্বতী সাইকল, গোপালভাঁড় সাইকল, শেখ চিল্লী সাইকল এবং আরো বিস্তর। কিন্তু পলডি সাইকলের বিশেষত্ব কি?’
নয়রাট বললেন, ‘পল্ডি হলেন অতিশয় খানদানী ঘরের ছেলে, উত্তম বেশভূষায় ছিমছাম না হয়ে বেরোন না, সকলের সঙ্গে অতিশয় ভদ্র ব্যবহার-এ তো সব হল; কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, তিনি একটি পয়লা নম্বরের বক্কেশ্বর, আনাড়ির চূড়ামণি-বে-অকুফের শিরোমণি। দু-একটা উদাহরণ দিচ্ছি।–’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘কিন্তু প্লীজ, অশ্লীলগুলো না।’
নয়রাট বেদনাতুরতার ভান করে বললেন, ফ্রানৎসিস্কাকে নিয়ে ঐ তো বিপদ। একশ বার বোঝাবার চেষ্টা করেছি, শ্ৰীল-অশ্লীল-একেবারে স্বতঃসিদ্ধরূপে, অর্থাৎ perse-পৃথিবীতে নেই, যেরকম নিজের থেকে ‘ডাৰ্ট’ বা ময়লা বলে কোন জিনিস হয় না। অস্থানে পড়লেই জিনিস ডার্ট হয়। ডাস্টবিনের ভিতরকার ময়লা ময়লা নয়-একথা কেউ বলে না, ‘ডাস্টবিন ময়লা হয়ে গিয়েছে, ওটা সাফ করো’, বলে, ‘ডাস্টবিন ভর্তি হয়ে গিয়েছে।’ ঠিক তেমনি সুন্দরীর ঠোঁটের উপর লিপস্টিক ডার্ট নয়, কিন্তু যদি সেই লিপস্টিক আমার গালে লেগে যায়-’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘পেটার! আবার!’
আমার মনে হল, ফ্রানৎসিস্কা বাড়াবাড়ি করছেন, তাই নয়রাটকে সমর্থন করার জন্য গুনগুন করলুম,
‘অধরের তাম্বুল বয়ানে লেগেছে
ঘুমে ঢুলু ঢুলু আঁখি’
দুজনেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘মানে?’
আমি সালঙ্কার সবিস্তর নন্দকুমার গণ্ডে চন্দ্রাবলীর তাম্বলরাগের বর্ণনা দিলুম।
নয়রাটিকে আর পায় কে?–চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে বললেন, ‘শুনলে, গিন্নি শুনলে? শ্ৰীকৃষ্ণ ভারতীয়দের স্বয়ং ভগবান, আমাদের যেরকম যীশুখ্ৰীষ্ট। তিনি যদি রাধা। ভিন্ন অন্য রমনীকে দয়া দেখাতে পারেন, তবে আমার গালে কিংবা ইভনিং শার্টে লিপস্টিক আবিষ্কার করলে তুমি মর্মাহত হও কেন?’
ফ্রানৎসিস্কা বাধা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ঢিড্ মিথ্যেবাদী রে, বাবা! আমি আর মা-বোন ভিন্ন অন্য মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে হলে যে পুরুষ-স্থা পুরুষই বটে-শব্দের জন্য পকেট-ডিক্সনরি বের করে তার গালে লিপস্টিক! ডু লিবার হার গট ফন বেনটাইম (বাঙলায়—’হে পিণ্ডিদাদন খানের মা কালী!’)’
আমি বললুম, ‘কিন্তু হ্যার নয়রাট, একটা ভুল করবেন না। দেবতা যা করবার অধিকার রাখেন, সাধারণ মানুষের তা নেই। কিন্তু সে কথা থাক, শ্ৰীল-অশ্লীল সম্বন্ধে আপনি কি যেন বলছিলেন?’
নয়রাট বললেন, ‘Perse’ বাইইটসেলফ যে রকম ডার্ট হয় না, ঠিক তেমনি স্ব-হকে কোনো জিনিস অশ্লীল নয়। উদাহরণ দিয়ে বলি,–যেখানে বাইবেল পাঠ হচ্ছে, সেখানে হঠাৎ পেটের ব্যামো নিয়ে আরম্ভ করা অশ্লীল এবং তার চেয়েও ভালো দৃষ্টান্ত, ডাক্তাররা যেখানে যৌন সম্পর্কের আলোচনা করছেন, সেখানে বেমক্কা বাইবেল পাঠ আরম্ভ করা তার চেয়েও বেশি অশ্লীল।
অর্থাৎ বক্তব্য বস্তু প্রতীয়মান, জাজ্জ্বল্যমান করার জন্য যে কোন দৃষ্টান্ত, যে কোন তথ্য, যে কোন গল্প অশ্লীল—তা সে পচিশবার দাস্তের বয়ানই হোক, গণিকাজীবনকাহিনীই হোক। পক্ষান্তরে ইররেলেভেন্ট আউট অব প্লেস (বেমক্কা) জিনিস, তা সে ধৰ্মসঙ্গীতই হোক আর টমাস আকুনিয়াসের জীবনই হোক।’
আমার আশ্চর্য লাগল। কারণ দেশে ভটচাজ মসাই (পাদটীকা’’ দ্রষ্টব্য) এবং কাবুলের মৌলানা মীর আসলাম (‘দেশে-বিদেশে’ দ্রষ্টব্য)। ঐ একই কথা বলেছিলেন।
আমি বললুম, ‘খাটি কথা। কিন্তু এসব থাক না এখন। বরঞ্চ একটা পলডি গল্প বলুন।’
নয়রাট বললেন, ‘সেই ভালো।’ ‘পিয়ন পলডিকে মনি অর্ডারের টাকা দিলে। পলডি দিল জোর টিপস। পাশে বসেছিলেন বন্ধু, তিনি বললেন, ‘পলডি, অত বেশি টিপস দিলে কেন?’ পলডি পরম সন্তোষ সহকারে মাথা হেলিয়ে দুলিয়ে বললে, ‘ঐ তো! কিসসু জানো না, কিসসু সমঝো না; জোর টিপস দিলে ঘন ঘন মনি অর্ডার নিয়ে আসবে না?’
আমার হাসি শেষ হবার পূর্বেই নয়রাট বললেন, কিংবা ধরুন, পলডির বুকে ব্যথা। ডাক্তার অনেকক্ষণ ধরে বুক-পিঠ বাজিয়ে বললেন, ঠিক ডায়গনোজ করতে পারছি নে। তবে মনে হচ্ছে অত্যধিক মদ্যপানই কারণ।’
পলডি হেসে বললেন, ‘তই নিয়ে বিচলিত হবেন না, ডাক্তার, আমি না-হয় আরেকদিন আসব, যেদিন আপনি অত্যধিক মদ্যপান করে মাতাল হয়ে যান নি।’
নয়রাট বললেন, ‘পলডি রসিকতাতে শুধু থাকে রস। ও-গুলোর ভিতর দিয়ে পলডির দেশ, আচার-ব্যবহার, রীতিনীতি সম্বন্ধে বিশেষ কোনো খবর পাওয়া যায় না। কিন্তু ট্যুনিস-শেলের গল্পের ভিতর দিয়ে জর্মনি, কলোনের শ্রমিকশ্রেণী এবং তাদের জীবনধারণ সম্বন্ধে অনেক খবর পাওয়া যায় এবং তাতে করে গল্পগুলো বেশ একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের রঙ ধরে। এই ধরুন পাদ্রী সম্প্রদায়কে নিয়ে আমরা প্রায়ই ব্যঙ্গ করে থাকি। তারই একটা ট্যুনিস-শেল সাইক্লে বেশ খানিকটে রসের সৃষ্টি করেছে।
ট্যুনিস আর শেল একখানা দশ টাকার নোট কুড়িয়ে পেয়েছে (কাঁটলেটের গল্পে পূর্বেই বলেছি তারা হরদম রাস্তায় টাকা কুড়িয়ে পায়) এবং ঝগড়া লেগে গিয়েছে টাকাটার ওপর কার হক্ক। ট্যুনিস বলে সে আগে দেখেছে; শেল বলে সে আগে কুড়িয়ে নিয়েছে এবং পজেশন ইজ থ্রি-ফোর্থ অব ল’। তারপর এ বলে ও মিথ্যেবাদী ও বলে এ মিথ্যেবাদী। করতে করতে হঠাৎ ট্যুনিস বললে, ‘তাই সই, মিথ্যেবাদী হওয়াটাও কিছু সোজা কর্ম নয়, আমি হচ্ছি পোড় মিথ্যেবাদী আর তুই হচ্ছিস পেচি (এমেচার) মিথ্যেবাদী।’ শেল বললে,
