করলেন কোন সাহসে? বুঝলুম না হয় রাজা আর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে রক্ষা করছিলেন। কিন্তু সেইটেই তো শেষ কথা নয়। সে যুগে দেশের পাঁচজন কি ভাবতো না ভাবতো তার হয়ত খুব বেশি মূল্য ছিল না। কিন্তু মোল্লা সম্প্রদায়? সে যুগের রাজারাও তো ওদের সঙ্গে b6(5* ‘
আমি বললুম, হ্যাঁ, কিন্তু ভেবে দেখুন তো, রাজাতে পোপেতে যদি ঝগড়া লাগে তবে শেষ পর্যন্ত কি হয়? হুকুম চালাবার জন্য রাজারা সৈন্যের উপর নির্ভর করেন। সৈন্যরা যদি রাজার প্রতি সহানুভূতি রাখে তবে তারা হুকুম পাওয়া মাত্রই মোল্লাদের ঠ্যাঙাতে রাজী; পক্ষাস্তরে তারা যদি মোল্লাদের মতবাদে বিশ্বাস রাখে। তবে তারা বিদ্রোহ করে, অর্থাৎ রাজাকে ধরে ঠ্যাঙায়।
‘এ তো হল কমন-সেন্স। তাই এস্থলে প্রশ্ন ইরানের লোক সে আমলে কতখানি ইসলাম-অনুরাগী ছিল?
ইতিহাস থেকে আমার যেটুকু জ্ঞান হয়েছে-কিন্তু থাক, এসব কচকচানি হয়ত হ্যার নয়রাট পছন্দ করছেন না—’
নয়রাট বললেন, ‘ফের এটিকেট? আর এটিকেট হলেই বা-আমি আপনার বক্তব্যটা শুনছি ইন টার্মস অব চেস। আপনি এখন ওপনিং গেম আরম্ভ করেছেন, তারপর মিডু গেম আসবে—আমি দেখছি আপনি যুঁটিগুলো কি কায়দায় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন—যা বলছিলেন বলে যান।
আমি বললুম ইরানের সভ্যতা সংস্কৃতি আরবদের চেয়ে বহু শত বৎসরে খানদানী। ইরান ইসলাম প্রচারের বহু পূর্বেই রাজ্য-বিস্তার করতে গিয়ে গ্ৰীসের সঙ্গে লড়েছে, ভারতের পশ্চিম-সীমান্ত দখন করেছে, মিশরীদের সঙ্গে টক্কর দিয়েছে, রোমানদের বেকাবু করেছে, অর্থাৎ রাষ্ট্র হিসেবে ইরান বহু শত বৎসর ধরে পৃথিবীর পয়লা শক্তি হিসেবে গণ্য হয়েছে। পৃথিবীর সম্পদ ইরানে জড়ো হয়েছিল বলে ইরানীরা যে স্থাপত্য, যে ভাস্কর্য নির্মাণ করেছিল তার সঙ্গে তুলনা দেবার মতো কলানিদর্শন আজও পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। আর বিলাসব্যসনের কথা যদি তোলেন তবে আমার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস ইরানীরা যে রকম পঞ্চেন্দ্ৰিয়ের পূর্ণতম আনন্দ গ্ৰহণ করেছে সেরকম ধারা তাদের পূর্বে বা পরে কেউ কখনো করতে পারে নি।
‘এই ধরুন না, আরব্য-উপন্যাস। অথচ বেশির ভাগ গল্পে যে ছবি পাচ্ছেন সেগুলো আরবের নয়, ইরানের–আমার ব্যক্তিগত ’ফেন্সি’ মত নয়, পণ্ডিতেরা এ কথাই বলেন।
‘মনে পড়ছে সেই গল্প?—যেখানে এক সুন্দরী তরুণী এসে এক ঝাঁকামুটিকে নিয়ে চলল হরেক রকমের সওদা করতে। মাছমাংস ফলমূল কেনার পর সে তরুণী যে সব সুগন্ধি দ্রব্য কিনল। তার সব কটা জিনিসের অনুবাদ কি ইংরিজি, কি ফরাসি, কি বাঙলা কোনো ভাষাতেই সম্ভব হয় নি-করণ, এসব জিনিসের বেশির ভাগই আমাদের অজানা। এমন কি আজকের দিনের আরবরা পর্যন্ত সে-সব বস্তু কি, বুঝিয়ে বলতে পারে না। তুলনা দিয়ে বলছি, আজকের দিনে প্যারিসে যে পাঁচশ’ রকমের সেন্ট বিক্রি হয় সেগুলার বয়ান, ফিরিস্তি, অনুবাদ কি এসকিমো ভাষায় সম্ভবে?
ইরানের তুলনায় সে-যুগে আরবরা ছিল প্যারিসের তুলনায় অনুন্নত–অর্থাৎ সভ্যতা-সংস্কৃতি নিম্ন পর্যায়ে। সেই আরবরা যখন ধর্মের বাঁধনে একজোট হয়ে ইরানে হানা দিল তখন বিলাস-ব্যসনে ফুর্তি-ফার্তিতে বে-এক্তেয়ার ইরানীরা লড়াইয়ে হেরে গেল। আপনাদের ইতিহাস থেকে দৃষ্টান্ত দিতে গেলে গ্ৰীস-রোমের কাহিনী বলতে হয়, সে কাহিনী আমরা বলার প্রয়োজন নেই। সেটা হবে ‘সুইটজারল্যান্ডে ঘড়ি আনার মত’।
ইরানীরা মুসলমান হয়ে গেল, কেন হল সে-কথা আরেকদিন হবে, যারা হতে চাইল না অথচ জানত দেশে থাকলে অর্থনীতির অলঙ্ঘ্য নিয়মে একদিন হতেই হবে, তারা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিল আমার দেশ ভারতবর্ষে-সে। ইতিহাসও এস্থলে অবান্তর।
আরবরা মরুভূমির সরল, প্রিমিটিভ মানুষ; তারা ইরানের বিলাসব্যভিচার দেখে স্তম্ভিত-’শক্ট্’, ‘আউট-রেজড্’। আবার ইরানীরাও আরবদের বেদুইন ধরন-ধারণ দেখে ততোধিক স্তম্ভিত এবং ‘শক্ট্’।
‘তদুপরি আরেকটা কথা ভুললে চলবে না, আরবরা সেমিটি বংশের (ইহুদী গোত্রের সঙ্গে তাদের ‘মেলে), আর ইরানীরা আর্য। জীবনাদর্শ ভিন্ন ভিন্ন; ধর্ম এক হলে কি হয়? প্যারিসের ক্রীশচান। আর নিগ্রো ক্রীশচান কি একই ব্যক্তি?
‘এইবার মোদ্দা কথায় ফিরে যাই; ইরানীরা মুসলমান হল বটে (এবং এদের অনেকেই খাঁটি মুসলিম)। কিন্তু তাদের মজ্জাগত মদ্যাদি পঞ্চমকার ছাড়তে পারলো না। তাই ইরানের জনসাধারণ ওমরের মধ্য-দর্শনবাদ খুশিসে বরদাস্ত করে নিল।
‘দেশের লোক যখন গোপনে গোপনে মদ খায়। তখন রাজার আর কি ভাবনা? মোল্লারা যা বলে বলুক, যা করে করুক-এবং একথাও রাজার অজানা ছিল না যে, বহু লোক আপন হারেমে বসে ঐতিহ্যগত মদ্যপানে কার্পণ্য করেন না।
‘তাই ওমর বেঁচে গেলেন, রাজাও কোনো মুশকিলে পড়লেন না।’
***
নয়রাট বললেন, ‘আপনাদের ওমর খৈয়াম যা আমার ট্যুনিস-শেলও তা।’
আমি ঠিক বুঝতে না পেরে শুধালুম, ‘ট্যুনিস-শেল নিয়ে তো সব রসিকতার গল্প, আর খৈয়াম তো রচেছেন চতুষ্পদী।’
নয়রাট বললেন, ‘মিলটা অন্য জায়গায়। আপনিই বললেন না, দুনিয়ার যত ঈশ্বরবিদ্রোহী, মধ্যোৎসাহী চতুষ্পদী—তা সে ওমরের হোক, হাফিজের হোক, আত্তারের হোক, সব কটা এসে জুটেছে ওমরের চতুর্দিকে, ঠিক তেমনি রসিকতার গল্পে নায়ক যদি মাত্র দুজন হয়, আর তার একজন আর একজনের উপর টেক্কা মারার চেষ্টা করে তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলো ট্যুনিস-শেলের নামে চালু হবেই হবে। এগুলোকে তাই সাইকল (চক্র) বলা হয়। ওমর সাইকল, ট্যুনিস-শেল সাইকল কিম্বা পলডি সাইকল। ওমর যেরকম ইরানের, ট্যুনিসশেল তেমনি জর্মনীর কলোন শহরের আবার পলডি সুইটজারল্যান্ডের। আপনাদের ভারতবর্ষে এরকম সাইকল আছে?’
