ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘বটে!’
নয়রাট বললেন, ‘আমার শখ ছিল দাবা-খেলাতে এবং সে ব্যসনে মেতে আমার কত সময়-সামর্থ্য বরবাদ গিয়েছে তার হিসেবা-নিকেশ আমি কখনো করি নি। দাবা-খেলা আমি
রোজ রাত্তিরে বাবার সঙ্গে দাবা খেলতে আসতেন। এক রাত্রে আসতে পারলেন না জোর বরফের ঝড় বইছিল ব’লে, আর ওদিকে বাবা তো মৌতাতের সময় হন্যে হয়ে উঠলেন। আমি থাকতে না পেরে বললুম, ‘তা আমার সঙ্গেই খেলো না কেন?’ বাবা তো প্রথমটা হেসেই উড়িয়ে দিলেন, কিন্তু জানেন তো, দাবার নেশা কী নিদারুণ জিনিস-বরঞ্চ মদের মাতাল খুনীর সঙ্গে এক টেবিলে মদ খেতে রাজী হবে না, দাবার মাতাল তার সঙ্গে খেলতে কণামাত্রও আপত্তি জানাবে না। বাবা অত্যন্ত তাচ্ছিল্যাভরে খেলতে বসলেন, প্রথম দু’বাজি জিতলেনও কিন্তু তৃতীয় বাজি হল চালমাত এবং তারপর তিনি আর কখনো জেতেন নি। তবে তার হল বুড়ো হাড়, এখনো খুব শক্ত শক্ত চালের চমৎকার চমৎকার উত্তর বাতলে দিতে পারেন।’
আমার আশ্চর্য লাগল, কারণ শরৎ চাটুজ্জেও কৈলাস খুড়োর বর্ণনাতেও ঐ কথাই বলেছেন; খুড়োর শেষ বয়সে আটপৌরে খেলা ভুলে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু কঠিন সমস্যা সমাধানের জন্য খেলোয়াড়রা তার কাছে যেত। সে কথাটা নয়রাটকে বলতে তিনি বললেন, ‘অতিশয় হক কথা। পৃথিবীতে মেলা ধৰ্ম আছে—তাই ক্রীশচান, জু এবং দাবাড়ে। দাবাখেলা ধর্মের পর্যায়ে পড়ে, আর যারাই এ ধর্ম মানে তারা সব-ভাই-সব-ব্রাদার। দাবাড়েদের ‘পেনফ্রেন্ড’ পৃথিবীর সর্বত্র যে রকম ছড়ানো তার সঙ্গে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনা হয় না।’
তারপর বললেন, ‘সেই যে বাবা দাবা ধরিয়ে দিলেন তারপর ওর হাত থেকে আমি আর রেহাই পাইনি। একবার এক পািড় মাতালকে বলতে শুনেছিলুম, সে নাকি জীবনে মাত্র একবার মদ খেয়েছে। আমরা সবাই আসমান থেকে পড়লুম, উলুকটা বলে কি-উদয়াস্ত যে লোকটা ‘ট্যানিসে’র উপর থাকে, সে কি না জীবনে কুন্নে একটিবার মদ খেয়েছে! বেহেড মাতাল এরেই কয়। তখন মাতাল বললে সে মদ খেয়েছে একবারই-তারপর থেকে এ অবধি শুধু তার খোঁয়ারিই ভাঙছে।’
আমি বললুম, ‘ওমর খৈয়াম এ বাবদে যা নিবেদন করেছেন সেটা ঠিক হুবহু এর সঙ্গে খাপ খায় না, তবু অনেকটা এরই কান ঘেষে। খৈয়াম বলেছেন, ‘রোজার পয়লা রাত্রিতে অ্যায়সা পীনা পীউংগা যে তারই নেশার বেঙুণীতে কেটে যাবে রোজার ঝাড়া পুরো মাসটা। ইশ হবে ঈদের দিন। ঈদ মানে পরব। (পরবpar excellence), পরব মানতে হয়, না। হলে জাত যাবে, ধর্ম যাবে, তাই তখন ফের বসে যাব সুরাহী পেয়ালা প্রিয়া নিয়ে।’ তারপর খৈয়াম কি করেছিলেন সে হদিস তার রুবাইতে মেলে না, তবে বিবেচনা করি, দুসরা রমজান তক তিনি তাঁর কায়দা-কানুনে কোনো রদবদল করেন নি।’(৪)
ফ্রানৎসিস্কা এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। এখন বললেন, ‘আমি তো এ রুবাই ফিটজিরান্ডে পাই নি। আপনি কি ফার্সীতে পড়েছেন?’
আমি বললুম, ‘ফিটজিরাল্ড তো তর্জমা করেছেন মাত্র বাহাত্তর না বিরাশীটি রুবাইয়াৎ। ওমরের নামে প্রচলিত আছে আট শ’ না এক হাজার, আমি ঠিক জানি নে। তবে এ রুবাইটি আপনি নিশ্চয়ই হুইনসফিল্ড কিংবা নিকোলার অনুবাদে পাবেন। ওঁরা ওমরের প্ৰায় কোনো রুবাই-ই বাদ দেন নি।’
ফ্রানৎসিস্কা শুধালেন, ‘আপনি যে বললেন, ‘ওমরের নামে প্রচলিত রুবাইয়াৎ’ তার অর্থ কি? আপনি কি বলতে চান, এগুলো ওমরের রচনা নয়?’
আমি বললুম, ‘গুণীদের মুখে শুনেছি, ওমরের বেশির ভাগ রুবাইয়াতের মূল বক্তব্য ছিল, ‘এই বিরাট বিশ্ব-সংসার কোন নিয়মে চলে, কি করলে ঠিক কর্মকরা হয় এসব বোঝা তোমার আমার সাধ্যের বাইরে। অতএব যে দুদিন এ সংসারে আছ সে দুদিন ফুর্তি করে নাও; মরার পর কে কোথায় যাবে, কি হবে, না হবে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।’ তারপর থেকে অন্য যে কোনো কবি এই মতবাদ প্রচার করে নূতন রুবাই লিখতেন। তিনি তক্ষুনি সেটা ওমরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতেন। তার কারণও সরল। ওমর রাজানুগ্রহ পেয়েছিলেন, প্রধান মন্ত্রী নিজাম-উল-মুলুকও ছিলেন তার ক্লাসফ্রেন্ড। তাই তিনি নিৰ্ভয়ে ইসলাম-বিরোধী এই চার্বাকী মতবাদ প্রচার করে যেতে পেরেছিলেন; কিন্তু পরের আমলে আর সব কবির সৌভাগ্য তা হয় নি-তারা মোল্লাদের বিলক্ষণ ডরাতেন। তাই তারা তাদের বিদ্রোহী মতবাদ ওমরের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে আপন প্ৰাণ বাঁচাতেন-ওদিকে যা বলবার তাও প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে যেতেন।
তাই দেখতে পাবেন, হাফিজের (এবং অন্য আরও কয়েক কবির) দিওয়ানে (তথাকথিত ‘কমগ্ৰীট ওয়ার্কসে) ওমরের কবিতা, আবার ওমরের দিওয়ানে হাফিজের কবিতা। এ জট ছাড়িয়ে ওমরের কোনগুলো, হাফিজের কোনগুলো সে বের করা আজকের দিনে অসম্ভব।’
নয়রাট বললেন, ‘আপনাদের ওমর কোনো কম্মের নয়। তার স্বৰ্গপুরীর বর্ণনাতে তিনি বলেছেন,
“সেই নিরালা পাতায়-ঘেরা
বনের ধারে শীতল ছায়
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে,
ছন্দ গেথে দিনটা যায়।
মৌন ভাঙ্গি তার কাছেতে
গুঞ্জে তবে মঞ্জু সুর
সেই তো সখি, স্বৰ্গ আমার,
সেই বনানী স্বৰ্গপুর।”
‘অত সব বায়নাক্কার কী প্রয়োজন!
‘এক দাবাতেই যখন তাবৎ কিস্তি মাত হয়?’
ফ্রানৎসিস্কা শুধালেন, ‘ওমর সম্বন্ধে নানারকমের আজগুবী গল্প শোনা যায়— আমার মন সেগুলো মানতে রাজী হয় না, কিন্তু সেগুলো মানা না-মানার চেয়েও বড় প্রশ্ন, খুদ সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে, ইস
