ছোড়ারা তীব্ৰকণ্ঠে ঐক্যস্বরে বলছে, ‘আই গো!’
‘উই গো!’
‘উই গো!’
‘ইউ গো!’
‘ইউ গো!’
‘উই গো!’
‘হী গোজ!’
‘হী গোজ!’
‘রাম গোজ!’
‘রাম গোজ!’
‘শ্যাম গোজ!’
‘শ্যাম গোজ!’
দাশগুপ্ত সদার-পোড়োর মত বলে যাচ্ছে আর ছোঁড়ারা চিৎকার করে দোহার গাইছে।
সর্বশেষে দাশগুপ্ত লাফ দিয়ে উচ্চতম কণ্ঠে চেঁচোল, ‘রাম অ্যান্ড শ্যাম গো গো গো!’
দাশগুপ্তের স্বপ্ন কখনো বাস্তবে পরিণত হবে না। এমন দিন কখনো আসবে না যে, সে পেটের চিন্তার ফৈসালা করে নিয়ে তামাম শহর নাইট স্কুলে নাইট স্কুলে ছয়লাপ করে দিতে পারে।
দাশগুপ্তের কথা যাক। আমি তার উল্লেখ করলুম নয়রাট-জীবনীটা তুলনা দিয়ে খোলসা করার জন্য।
ইয়োরোপে এ জিনিসটা হামেশাই হচ্ছে।
নয়রাটি মেট্রিক পাস করেন ১৮ বছর বয়সে, সংসারে ঢোকেন। ১৯ বছর বয়সে। তারপর ঝাড়া ছাব্বিশটি বছর ব্যবসা-বাণিজ্য করে পয়তাল্লিশ বছর বয়সে দেখেন এতখানি পুঁজি জমেছে যে, বাকী জীবন তাকে আর সংসার-খরচের জন্য ভাবতে হবে না।
‘টাকা জমানোর নেশা আমাকে কখনো পায় নি। আমি জানি এ দুনিয়ার বহু লোকই আমার ধারণা নিয়ে সংসারে ঢোকে। কিন্তু বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত ধর্মচ্যুত হয়। জীবনে আমার কতকগুলো শখ ছিল–কিন্তু হিসেব করে দেখলুম, –সেগুলো বাগে আনতে হলে পেটের একটা ফৈসাল পয়লাই করে নিতে হবে। তাই খাটলুম ছাব্বিশ বছর ধরে একটানা। আমার অসুখবিসুখ করে না, আমি একদিনের তরে কাজে কামাই দিই নি—ঐ শুধু বিয়ের সময় যে সাতদিন হনিমুনে কাঁটাই বাধ্য হয়ে তারই জন্য ছুটি নিতে হয়েছিল।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘তা ছুটি নিয়েছিলে কেন? আমি বলি নি, তোমার আপিসঘরে, কিম্বা সেখানে জায়গা না হলে তোমার গুদোমঘরে পাদ্রী ডেকে মন্ত্র পড়লেই হবে।’
নয়রাট বললেন, ‘অন্য মতলব ছিল, ডার্লিং, তোমাকে তো আর সব কিছু খুলে বলি নি।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘বটে!’
নয়রাট আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাকে খুলে কই।
‘বিয়ে করেই বউকে নিয়ে চলে গেলুম এক অজ পাড়াগাঁয়ে। সে গাটা খুঁজে বের করতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল এবং সে গা থেকেও আধ মাইল দূরে একটি ‘শালে’ ভাড়া নিলুম সাতদিনের জন্য। সেখানে ইলেকটিরিক আছে—ব্যস্ আর কিছু না। জলের কল না, খবরের কাগজ না, দুধওয়ালা দুধ পর্যন্ত দিয়ে যায় না।’
‘রাত্তিরের ডিনার খেয়েই আমরা সে বাড়িতে গিয়ে উঠলুম।
ফ্রানৎসিস্কা বাড়িতে ঢুকেই সোহাগ করে বললে—’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘চোপ।’
নয়রাট বললেন, ‘আচ্ছা, আচ্ছা’ চোপ।’ তারপর আমাকে বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে কমিয়ে-সমিয়ে বলছি-বাদবাকিটা পরে আপনাকে একলা একলি বলব।’
‘ভোর তিনটের সময় আমি চুপসে খাট ছেড়ে উঠে পা টিপে টিপে নোমলুম নিচের তলায়। পিছনের বাগানে গিয়ে সেখান থেকে জল সংগ্রহ করে গেলুম রান্নাঘরে। সেখানে নাকে-মুখে বিস্তর ধুঁয়ো গিলে ধরালুম উনুন। তারপর বেকন ফ্রাই করে, গরম কফি, টেস্ট ইত্যাদি বানিয়ে যাবতীয় বস্তু একখানা বিরাট খুঞ্চাতে সাজিয়ে গেলুম উপরের তলায় ফ্রানৎসিস্কার বিছানার কাছে। আস্তে আস্তে জাগিয়ে বললুম, ‘ব্রেকফাস্ট তৈরি।’
‘ফ্রান্ৎসিসকা আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললে। (আবার ‘চোপ’ এবং ‘আচ্ছা, আচ্ছা, চোপ’ শোনা গেল), ‘ডার্লিং’ তুমি আমাকে কত ভালোবাসো-এই ভোরে এই শীতে আমাকে কিছু না বলে তুমি এত সব করেছ।’
‘আমি বললুম, ‘ডার্লিং না। কচু, ভালোবাসা না হাতি। আমি এসব তৈরি করে। আনলুম শুধু তোমাকে দেখাবার জন্য যে, বাদবাকি জীবন তোমাকে এই রকম ধারা করতে হবে। আর আমি শুয়ে শুয়ে ব্রেকফাস্ট খাবো।’
আমি প্রাণ খুলে হাসলুম।
দেখি নয়রাটও মিটমিটিয়ে হাসছেন। ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘আপনি এই তাড়িখানার বেহুদা প্ৰলাপটা বিশ্বাস করলেন?’
আমি বললুম, ‘কেন করব না? শাদীর পয়লা রাতে শুধু ইরানেই নয়, আরো মেলা দেশে মেলা বর বেড়াল মেরেছে, এ তো আর নূতন কথা কিছু নয়। এবারে সুইস সংস্করণটি শেখ হল এই যা।’
দুজনেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘সে আবার কি?’
আমাকে বাধ্য হয়ে শাদীর পয়লারাতে বেড়াল মারার গল্পটা বলতে হল, কিন্তু নয়রাটের মত জমাতে পারলুম না।–রাসিয়ে গল্প বলা আমার আসে না, সে আমার বন্ধুবান্ধব সকলেই জানেন।
দুজনেই স্বীকার করলেন, ইরানী গল্পটাই ভালো।’(৩)
তখন ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘পেটারের বকুনিতে অনেকগুলো ভুল রয়েছে। প্রথমত আমরা হনিমুন যে বাড়িতে কাঁটাই, সেখানে গ্যাস ছিল, উনুন ধরাবার কথাই ওঠে না, দ্বিতীয়ত পেটার ককখনো ব্রেকফাস্ট খায় না এবং সর্বশেষ বক্তব্য, যে-ব্রেকফাস্টের বর্ণনা সে দিল সেটা ইংলিশ ব্রেকফাস্ট। কোনো কনটিনেন্টাল শূয়ারের মতো ব্রেকফাস্টের সময় একগাদা বেকন আর আণ্ডা গেলে না। পেটার গল্পটা শুনেছে নিশ্চয়ই কোনো ইংরেজের কাছ থেকে, আর সেটা পাচার করে দিলে আপনার উপর দিয়ে।’
পেটার বললেন, ‘রোমব্রান্ট একবার এক ভদ্রলোকের মায়ের পট্রেট একেছিলেন। ভদ্রলোক ছবি দেখে বললেন, ‘তাঁর মায়ের সঙ্গে মিলছে না। রেমব্রান্ট বললেন, ‘একশ বছর পর আপনার মায়ের সঙ্গে কেউ এ ছবি মিলিয়ে দেখবে না।–তারা দেখবে ছবিখানি উতরেছে কিনা।’
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গল্পটি ভালো কি না সেইটেই হচ্ছে আসল কথা। ঘটেছিল কি না, সে প্রশ্ন সম্পূর্ণ অবান্তর; আপনি কি বলেন?’
আমি বললুম, ‘সুন্দর-ই সত্য-না ঘটলেও ঘটা উচিত ছিল।’
