‘ভারতবর্ষের যে প্রান্তে আমার দেশ, সেখানে সব সময় জাফরান পাওয়া যায় না। তাই মা তারই একটা ‘এরজাৎস’ সব সময়ে হাতের কাছে রাখেন। বুঝিয়ে বলছি
‘আমাদের দেশে এক রকম ফুল হয় তার নাম শিউলি। শিউলির বেঁটা সুন্দর কমলা রঙের আর পাপড়ি সাদা। ফুল বাসি হয়ে গেলে মা সেই বেঁটাগুলো রোদুরে শুকিয়ে বোতলে ভরে রাখেন। সেই শুকনো বেঁটা গরম জলে ছেড়ে দিলে চমৎকার সুগন্ধ আর কমলা রঙ বেরয়। মেয়েরা সাধারণত ঐ রঙ দিয়ে শাড়ি ছোপায়। মা খুব সরু চালের ভাত ঐ রঙে ছুপিয়ে নিয়ে চিনি, কিসমিস, বাদাম দিয়ে ভারি সুন্দর মিঠাখানা’ তৈরি করেন।
‘এটা মায়ের আবিষ্কার নয়। কিন্তু তবু যে বললুম, তার কারণ প্রকৃত গুণী কলাসৃষ্টির জন্য দেশী-বিদেশী কোনো উপকরণ অবহেলা করেন না।’
নয়রাটদের বাড়িতে এটিকেট বারণ, তবু আপন মায়ের কথা একসঙ্গে এতখানি বলে ফেলে কেমন লজ্জা পেলুম।
***
রুশ কবি পুশকিনের রচিত একটি কবিতার সারমর্ম এই—
‘হে ভগবান, আমার প্রতিবেশীর যদি ধনজনের অন্ত না থাকে, তার গোলাঘর যদি
খ্যাতি-প্রতিপত্তি যদি দেশদেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তবু তাতে আমার কণামাত্র লোভ নেই; কিন্তু তার দাসীটি যদি সুন্দরী হয় তবে-তবে, হে ভগবান, আমাকে মাপ করো, সে অবস্থায় আমার চিত্তচাঞ্চল্য হয়।’
পুশ্কিন সুশিক্ষিত, সুপুরুষ এবং খানদানী ঘরের ছেলে ছিলেন, কাজেই তার ‘চিত্তদৌর্বল্য’ কি প্রকারের হতে পারত সেকথা বুঝতে বিশেষ অসুবিধে হয় না। এইবারে সবাই চোখ বন্ধ করে ভেবে নিন কোন জিনিসের প্রতি কার দুর্বলতা আছে।
আমি নিজে বলতে পারি, সাততলা বাড়ি, ঢাউস মোটরগাড়ি, সাহিত্যিক প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এ সবের প্রতি আমার কণামাত্র লোভ নেই। আমার লোভ মাত্র একটি জিনিসের প্রতি—অবসর। যখনই দেখি, লোকটার দু’পয়সা আছে অর্থাৎ পেটের দায়ে তাকে দিনের বেশির ভাগ সময় এবং সর্বপ্রকারের শক্তি এবং ক্ষমতা বিক্রি করে দিতে হচ্ছে না। তখন তাকে আমি হিংসে করি। এখানে আমি বিলাসব্যসনের কথা ভাবছি নে পেটের ভাত ‘–’র(১) কাপড় হলেই হল।
অবসর বলতে আমি কুঁড়েমির কথাও ভাবছি নে। আমার মনে হয়, প্রকৃত ভদ্রজন অবসর পেলে আপন শক্তির সত্য বিকাশ করার সুযোগ পায় এবং তাতে করে সমাজের কল্যাণলাভ হয়। এই ধরুন, আমার বন্ধু ‘শ্ৰী ‘ক’ দাশগুপ্ত। বদ্যির ছেলে-পেটে অসীম এলেম, তুখোড় ছোকরা, তালেবর ব্যক্তি। সদাগরী আপিসে কর্ম করে, বড় সাহেবকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়—মোটা তনখা ভী পায়।
বয়স তার এখনো তিরিশ পেরোয় নি। পার্টিশনের পর মারোয়াড়ি কারবারীরা যখন ‘বসকে ঘায়েল করে ব্যবসা কেনবার জন্য উঠে পড়ে লাগল, তখন আমার এই বদ্যির ব্যাটা সায়েবকে এমন সব ‘কৌশাল’ বাতিলালে যে উল্টে ওনারা চোখের জলে নাকের জলে।
সায়েবও বড় নেমকহালাল(২) লোক। প্রায়ই হ্যালো, ড্যাস-গুপটা’ বলে বাড়িতে ঢোকেন, ‘লৌচি’ (লুচি)। খেয়ে যান, ড্যাস-গুপটার ছেলেদের জন্য পূজার বাজারে দু’চারখানা ‘ডোঁটি’ (ধুতিও)ও রেখে যান। আমি বরাবর সকালটা দাশগুপ্তের বাড়িতে কাঁটাই, তাই সায়েবের সঙ্গে মাঝে মাঝে মোলাকাত হয়ে যায়। লোকটি এদেশে-আসা সাধারণ ইংরেজদের মত গাড়ল নয়, ইংরিজি শোলোক খাসা কপচাতে পারে, অর্থাৎ মধুরকণ্ঠে উচ্চ-স্বরে শেলি-কীটস আবৃত্তি করতে পারে।
সায়েবের কথা উপস্থিত থাক। দাশগুপ্তের কথায় ফিরে যাই।
আমি জানি দাশগুপ্ত কোনো চেম্বার অব কমার্সের বড়কর্তা হবার জন্য লালায়িত নয়। দেড় হাজার টাকার মাইনেকেও সে থোড়াই কেয়ার করে।
আমি জানি, আজ যদি তাকে কেউ পাঁচশ টাকা প্রতি মাসে দেয়, তবে সে কলকাতা শহরের হেথা-হোথা সর্বত্র দশখানা নাইট স্কুল খুলবে। এখন সে আপিসে দিনে সাতঘণ্টা কাটায়—নাইট স্কুল খোলবার মোক পেলে সে পরমানন্দে দিনে চোদ্দ ঘণ্টা সেগুলোর তদারকিতে, ক্লাস নেওয়াতে কাটাবে। বিশ্বাস করবেন না, সে তার উড়ে চাকরিটাকে স্বাক্ষর করার জন্য উড়ে কায়দায় বর্ণমালা পর্যন্ত শিখিয়েছে-চোখ বন্ধ করে মাথা দুলিয়ে দিব্য বলে যায়,–
‘ক’রে কমললোচন শ্ৰীহরি।
করেন শঙ্খ-চক্ৰধারী।
‘খ’ রে খাগ-আসনে খগপতি।
খাটন্তি লক্ষ্মী-সরস্বতী।।
‘গ’ রে গরুড়-ইত্যাদি—
(আমার সহৃদয় উড়িষ্যাবাসী পাঠকবৃন্দ যেন কোনো অপরাধ না নেন–যদি নামতাতে কোনো ভুল থেকে যায়; আমি দাশগুপ্তের মুখে মাত্র দু’তিনবার শুনেছি; কেউ যদি আমাকে পুরো পাঠটা পাঠিয়ে দেন, তবে বড় উপকৃত হই)।
অর্থাৎ আজ যদি দাশগুপ্তকে পেটের ধান্দায় আপিস না যেতে হয়, তবে সে তার জীবস্মৃত্যুর চরম কাম্য কাজে ফলাতে পারবে। ক ক’লক্ষ মণ পাট কিনল, কে ধাপ্পা এবং ঘুষ দিয়ে ক’খানা ওয়াগন বাগালে তাতে দাশগুপ্তের কোনো প্রকারের চিত্তদৌর্বল্যও (হেথাকার ভাষায় দিলচসপী) নেই। দেড় হাজার টাকার মাইনে কমে গিয়ে পাঁচশ হলে সে দুম করে মোটরখানা বিক্রি করে দিয়ে ট্রামে চড়ে ইস্কুলগুলোর তদারক করবে।
আপনি বিচক্ষণ লোক, আপনি শুধাবেন, এ পাগলামি কেন?
এটা পাগলামি নয়।
আসলে দাশগুপ্ত ইস্কুল মেস্টার। তার বাবা টোলে আয়ুৰ্বেদ শেখাতেন, তার ঠাকুরদাও তাই, তার বাপও তাই, তার উপরের খবর জানি নে।
এবং আমার সুহৃদ যে কী অদ্ভূত ইস্কুল-মেস্টার সে কথা কি করে বোঝাই? চাকরির ঝামেলার মধ্যিখানেও সে একটা নাইট ইস্কুল চালায়।
একদিন ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দেখি, সে তার ইস্কুলে ইংরেজি পড়াচ্ছে। চেঁচিয়ে বলছে, ‘আই গো!’
