তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের দেশে ব্যবস্থাটা কি রকম?’
আমি বললুম, অনেকটা আপনাদের দেশেরই মতো। অর্থাৎ, ভদ্রতরক্ষার চেষ্টা আমরাও করে থাকি তবে এটিকেটের বাড়াবাড়ি দেখলে তাই নিয়ে আপনার-ই মতো টীকাটিপ্পানী কেটে থাকি। তবে কি না ভারতবর্ষ বিরাট দেশ-তার নানা প্রদেশে নানা রকমের এটিকেট। এই ধরুন লক্ষ্মেী। সেখানে কোনো খানদানী বাড়িতে নিমন্ত্রণে যেতে হলে বাড়িতে উত্তমরূপে আহারাদি সেরে যেতে হয়। কারণ, খানার মজলিসে গল্প উঠবে, কোন মৌলানা দিনে আড়াই তোলা খেতেন, কোন সাহেব-জাদা দুই তোলা, কোন পীর-জাদা এক তোলা আর কোন নওয়াব একদম খেতেনই না। অথচ সংস্কৃত আপ্তবাক্য এ বিষয়ে যাঁরা রচনা করেছেন তারা এ এটিকেট আদপেই মানতেন না।’
কর্তা-গিন্নি উভয়েই শুধালেন, ‘আপ্তি-বাক্য কি?’
আমি বললুম,-
‘পরান্নং প্রাপ্য দুৰ্বদ্ধে, মা প্ৰাণেষু দয়াং কুরু।
পরান্নং দুর্লভং লোকে প্ৰাণাঃ জন্মনি জন্মনি।।
অর্থাৎ
ওরে মুর্খ, নেমন্তন্ন পেয়েছিস, ভালো করে খেয়ে নে। প্রাণের মায়া করিস নি, কারণ ভেবে দেখ, নেমন্তন্ন কেউ বড় একটা করে না। বেশি খেয়ে যদি মরে যাস তাতেই বা কি–প্ৰাণ তো ভগবান প্ৰতি জন্মে ফ্রি দেয়, তার জন্য তো আর খর্চা হয় না।’
***
আমি বললুম, চমৎকার রান্না হয়েছে’–রান্না সত্যই মামুলী রান্নার চেয়ে অনেক ভালো হয়েছিল, পোশাকী রান্না বললেও অত্যুক্তি হয় না। তারপর জিজ্ঞেস করলুম, রুশ কায়দায় মাছ কি করে রাঁধতে হয়?’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘আপনার বুঝি রান্নার শখ?’
আমি বললুম, ‘না; তবে আমার মা খুব ভালো রাঁধতে পারেন আর নূতন নূতন দিশী-বিদেশী পদ শেখাতে তাঁর ভারি আগ্রহ। আমি প্রতিবার দেশ-বিদেশ ঘুরে যখন বাড়ি ফিরি তখন সবাই আমাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা রকম গল্প শোনে, মাও শোনে, কিন্তু বলার প্রথম ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর তিনি আমাকে একলা-একলি শুধান, নূতন রান্না কি কি খেলুম। আমি ভালো ভালো পদগুলোর নাম করলে পর মা শুধাতেন। ওগুলো কি করে। রাঁধতে হয়। গোড়ার দিকে রন্ধনপদ্ধতি খেয়াল করে শিখে আসতুম না বলে মাকে কষ্ট করে। একসপেরিমেন্ট করে করে শেষটায় পদটা তৈরি করার পদ্ধতি বের করতে হত। এখন তাই মোটামুটি পদ্ধতিটা লিখে নিই; মাকে বলা মাত্রই দুইট্রয়েলের পরই ঠিক জিনিস তৈরি করে দেন।
ফ্রানৎসিস্কা আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘বলেন কি?’
বললুম, হ্যাঁ, আশ্চর্য হবারই কথা। আমিও একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, তিনি কোনো পদ না দেখে না চোখে তৈরি করেন কি করে? মা বলেছিলেন,–’এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে-’আরো বাপু, রান্না মানে তো হয় সেদ্ধ করা, নয়। তেলে-ঘিয়ে ভাজা, কিংবা শুকনো শুকনো ভাজা অথবা শিকে ঝলসে নেওয়া। এরই একটা, দুটো কিংবা তিনটে কায়দা চালালেই পদ ঠিক উতরে আসবে। আর তুইও তো বলেছিস আমাদের দেশের বাইরে এমন কোনো মশলা জন্মায় না। যা এদেশে নেই। তা হলে তুই যা বিদেশে খেয়েছিস, আমি তৈরি করতে পারব না কেন?’
তারপর বললুম, ‘অবশ্য মা আমাকে কখনো এসপেরেগাস কিংবা আর্টিচোক খাওয়ান নি কারণ ওগুলো আমাদের দেশে গজায় না। তাই নিয়ে মায়েরও কোনো খেদ নেই-কারণ যে সব শাক-সন্তজী আমাদের দেশে একদম হয় না। সেগুলোর কথা আমি মায়ের সামনে একদম চেপে যেতুম।’
ফ্রানৎসিস্কা বুদ্ধিমতী মেয়ে, বললেন, ‘ওঃ, পাছে তার দুঃখ থেকে যায়, তিনি তাঁর ছেলের সব প্রিয় খাদ্য খাওয়াতে পারলেন না।’
আমি বললুম, হ্যাঁ। কিন্তু তিনি যে তরো-বেতরো রান্না শেখার জন্য উঠে পড়ে লেগে যেতেন তার আরো একটা কারণ রয়েছে। রান্না হচ্ছে পুরোদস্তুর আর্ট। আর আমার মা—‘
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘থামলেন কেন?’ আমি লজ্জার সঙ্গে বললুম, ‘নিজের মায়ের কথা সত্যি হলেও বলতে গেলে কেমন যেন বাধো-বাধো ঠেকে। আপনারা হয়তো ভাববেন ফুলিয়ে বলছি।’
নয়রাট এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন, এখন হুঙ্কার দিয়ে বললেন, ‘ব্যস! হয়েছে। আপনাকে আর এটিকেট দেখাতে হবে না। ফ্রানৎসিস্কা আপনাকে বলে নি, এ বাড়িতে এটিকেট বারণ?’
ফ্রানৎসিস্কা তাড়াতাড়ি বললেন, ‘ছিঃ, পেটার, তুমি ওরকম কড়া কথা কও কেন?’
আমি সঙ্গে সঙ্গে উল্লসিত হয়ে বললুম, আদপেই না। ওঁর ধমক থেকে স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, আপনারা সরল প্রকৃতির লোক, আপনাদের সামনে সব কিছু অনায়াসে খুলে বলা যায়। তা হলে শুনুন, যা বলেছিলুম, রান্না হচ্ছে পুরোদস্তুর আর্ট বিশেষ আর আমার মা খাঁটি আর্টিস্ট। ঠিক আর্ট ফর আর্টস সেক নয়, অর্থাৎ তিনি মনের আনন্দে খুদ-খুশির জন্য রোধেই যাচ্ছেন, কেউ খাচ্ছে না, কিংবা খেয়েও কেউ ভালোমন্দ কিছু বলছে না-তা নয়। তিনি রান্নার নূতন নূতন টেকনিক শিখতে ভালোবাসতেন সত্যকার আর্টিস্ট যে রকম নূতন নূতন টেকনিক শিখতে ভালোবাসে। আপনি ভালো প্যাস্টেল পেন্টিং করতে পারেন, কিন্তু অয়েলপেন্টিং দেখে কিংবা তার কথা শুনে আপনারও কি ইচ্ছে হবে না। সেই টেকনিক রপ্ত করার? কিংবা আপনি উড়ুকাট করেন—যদি লাইন এনগ্ৰেভিং, এচিং, মেদজোটিন্ট, আকওয়াটিন্টের খবর পান, তবে সেগুলোও আয়ত্ত করার বাসনা আপনার হবে না?
অথচ দেখুন, খাঁটি আর্টিস্ট অজানা জিনিস আয়ত্ত করার জন্য যত উদগ্ৰীবই হোক না কেন, হাতের কাছের সামান্যতম মালমশলাও সে অবহেলা করে না-নানা রঙের মাটি, শাকসব্জী থেকেও নূতন রঙ আহরণ করার চেষ্টা করে।
