পেটার বললেন, ‘ডার্লিং, কিন্তু সে রাত্রের সব চেয়ে সেরা নাচের জন্য কে পেল সেটা তো বললে না।’
তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘মা পেলেন ফাস্ট প্রাইজ, আমি সেকেন্ড। তাই তো আমি শাশুড়িদের বিলকুল পছন্দ করি নে।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘আচ্ছা আহাম্মুক তো! নাচের পয়লা প্রাইজ হামেশাই রমণী পায়। দুসরাটা পুরুষ। এটা হচ্ছে শিভালরি। তোমাকে কি করে পয়লা প্রাইজ দিত?’
পেটার আমার দিকে মুখ করে বললেন, ‘গিন্নির রাগ, আমি ওর সঙ্গে নাচলুম না। কেন? আচ্ছা মশায়, বলুন তো, আপনি যদি কবিতা পড়ে শোনান, খোশগল্প করেন, বাজনা বাজান কিংবা কালোয়াতি করেন তবে যে সমে সমে মাথা নাড়তে পারে তাকে আদর-কদর করবেন, না। আপনি স্ত্রীকে? যেহেতু তিনি আপনি স্ত্রী। রসের বাজারে আপনি পর করা যায়?’ আমি উল্লসিত হয়ে বললুম, ‘তই তো আমি নিবেদন করলুম, ‘যাঁর চরিত্র উদার–অর্থাৎ যিনি রসিক জন—ৰ্তার কাছে সর্ব বসুধা আত্মজন’।’
পেটার নয়রাট বললেন, ‘গিন্নি অবশ্যি একটা কথা ঠিক বলেছেন, আমরা কেউ এটিকেটের ধার ধারি নে। এ বিষয়ে চমৎকার একটা ‘ট্যুনিস’, ‘শেলে’র গল্প আছে। ‘ট্যুনিস-শেল’ কে চেনেন?’
আমি বললুম, ‘ঠিক মনে পড়ছে না।’
‘আগাগোড়া একটি ‘প্রতিষ্ঠান’ বলতে পারবেন। ‘ট্যুনিস’ কথাটা এসেছে লাতিন ‘আন্তনিয়ুস’ থেকে। আন্তনিয়ুস গালভরা, গেরেমভারী, খানদানী ঐতিহ্যসিক নাম। আর ট্যুনিস অতিশয় প্লিবিয়ান অপভ্রংশ-নামটাতেই তাই একটুখানি রসের আমেজ লাগে।’
আমি বললুম, ‘আমাদের ‘পঞ্চানন’ নামটাও গেরেমভারী কিন্তু তার গাৰ্হস্থ্য সংস্করণ ‘পাঁচু’টাতেও ঐরকম রসসৃষ্টি হয়।
‘তাই নাকি? আপনারাও তাহলে এ রসে বঞ্চিত নন? আর ‘শেল’ কথাটার মানে ‘ট্যারা’। বুঝতেই পারছেন পিতৃদত্ত নাম নয়, পাড়া দত্ত। এবং নাম থেকেই বুঝতে পারছেন, এরা দুজন ডুক ব্যারন নন-খাঁটি ওয়ার্কিং কেলাস। খায়দায়, ফুতিফর্তি করে, ফোকটে দু পয়সা মারার তালে থাকে, কাজে ফাঁকি দিতে ওস্তাদ আর বিয়ার-খানায় আড্ডা জমাতে পারলে এরা আর কিছু চায় না।’
‘একদিন হয়েছে কি, ট্যুনিস-শেল রাস্তায় একখানা দশ টাকার নোট কুড়িয়ে পেয়েছে—তা ওরা হামেশাই ওরকমধারা রাস্তায় টাকা কুড়িয়ে পায়, না হলে গল্পই বা জমবে কি করে?’
ট্যুনিস বললে, ‘চ, শেল; এই দিয়ে উত্তমরূপে আহারাদি করা যাক।’ দুজনা ঢুকল গিয়ে এক রেস্তোরাঁয় আর অর্ডার দিলে দুখানা কটলেটের।
‘ওয়েটার এসে ছুরিকাঁটা আর দুখানা প্লেট সাজিয়ে দিয়ে আনল একখানা বড় ডিশে করে। দুখানা কাটলেট।’
নয়রাট বললেন, ‘কটলেট তো আর অ্যারোপ্লেনের স্ক্রু নয় যে ফিতে দিয়ে মেপেজুপে কিংবা ছাঁচে ঢেলে, ঠিক একই সাইজে বানানো হবে, কাজেই একখানা কটলেট আরেকখানার চেয়ে সামান্য একটু বড় হবে তাতে আর আশ্চর্য কি?’
ট্যুনিস তাই ঝাপ করে বড় কাটলেটখানা আপন প্লেটে তুলে নিল। শেল চুপ করে। দেখল। তারপর আস্তে আস্তে ছোট কাটলেটখানা তুলে নিয়ে ট্যুনিসকে বললে, ‘ট্যুনিস, তুই আদব-কায়দা একদম জানিস নে।’–যেন নিজে সে মহা খানদানী ঘরের ছেলে।
‘ট্যুনিস শুধালে, ‘কেন, কি হয়েছে?’
‘শেল বললে, ‘ভদ্রতা হচ্ছে, যে ডিশ থেকে প্রথম খাবার তুলবে, সে নেবে ছোট টুকরোটা।’
ট্যুনিস বললে, ‘আ। আচ্ছা, তুই যদি প্রথম নিতিস তবে তুই কি করতিস?’
‘শেল দম্ভ করে বলল, ‘নিশ্চয়ই ছোট কাটলেটটা তুলতুম।’
‘তখন ট্যুনিস বললে, ‘সেইটেই তো পেয়েছিস, তবে ভ্যাচর ভ্যাচর করছিস কেন?’
নয়রাট গল্প শেষ করে খানাতে মন দিলেন।
বলতে পারব না, আমার পাঠকদের গল্পটা কি রকম লাগিল—আমার কিন্তু উত্তম মনে হল, তাই প্রাণভরে খানিকক্ষণ হেসে নিলুম।
নয়রাট বললেন, ‘তই যখন কেউ এটিকেট নিয়ে বড় বেশি কপচাতে শুরু করে। তখনই আমার এই গল্পটা মনে পড়ে আর হাসি পায়। আরে বাবা, সংসারে থাকবি মাত্র দুদিন। তার ভিতর কত হাঙ্গামা কত হুজ্জত। সেই সব সামলাতে গিয়েই প্ৰাণটা খাবি খায়। তার উপর যদি এটিকেটের নাগপাশ দিয়ে সর্বাঙ্গ আর নবদ্বার বেঁধে দাও। (ফ্রানৎসিস্কার আপত্তি শোনা গেল, ‘পেটার, আবার অশ্লীল কথা!’) তবে দম ফেলবে কি করে? হাঁচবার এটিকেট, কাশবার এটিকেট, থুথু ফেলার এটিকেট, গা চুলকাবার এটিকেট-প্ৰাণটা যায় আর কি।’
আমি সায় দিলুম।
তখন নয়রাট শুধালেন, ‘বলুন তো, কি সে জিনিস যা চাষা অনাদরে, তাচ্ছিল্যে, এমন কি বলতে পারেন, ঘেন্নাভরে রাস্তায় ফেলে দেয়, আর ভদ্রলোক সেটাকে ধোপদূরস্ত দামী রুমালে ঢেকে, পকেটে পুরে অতি সন্তৰ্পণে বাড়ি নিয়ে আসেন?’
আমি খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে বললুম, ‘তা তো জানি নে।’
বললেন, ‘সিকিনি। চাষা ফাত করে রাস্তায় নাক ঝেড়েও ওদিকে আর তাকায় না, ভদ্রলোক রুমাল খুলে ছিক করে তারই উপর একটুখানি নাক ঝেড়ে সেটিকে সযত্নে ভাঁজ করে, পকেটে পুরে বাড়ি ফেরেন।
ফ্রানৎসিস্কা হঠাৎ বললেন, ‘পেটার, তুমি তো বকবক করে এটিকেটের নিন্দাই করে যাচ্ছ, ওদিকে একদম ভুলে গিয়েছে, ভদ্রলোক প্রাচ্যদেশীয়, সেখানে এটিকেটের অন্ত নেই; এদেশে তো প্রবাদই রয়েছে, ‘ওরিয়েন্টাল কার্টাসি’। যে আচার ওঁদের প্রিয় তুমি তাই নিয়ে মাস্করার পর মাস্করা করে যাচ্ছি।’
পেটার বললেন, ‘আদপেই না। আমি তো ভদ্রতার (ম্যানার্স) নিন্দে করছিনা, আমি করছি। এটিকেটের। দুটো তো এক জিনিস নয়।’
