মুর্গীর ঠ্যাংটি হাতে তুলে নিয়ে কড়কড়ায়তে, মড়মড়ায়াতে’ বাড়িতে বেশির ভাগ ইউরোপীয়ই করে, কিন্তু বাইরে নৈব নৈব চ। তবে কোন কোন জর্মন এবং সুইস রেস্তোরাঁয় রোস্ট সার্ভ করবার সময় মুর্গীর ঠ্যাংগুলো উপরের দিকে সাজিয়ে রাখে এবং ঠ্যাংগুলোর ডগায় বাটার পেপারের ক্যাপ পরিয়ে দেয়, যাতে করে আপনি হাত নোংরা না করে ঠ্যাংটা চিবুতে পারেন। এ ব্যবস্থা দেখে ইংরেজের জিভে জল আসে, কিন্তু সেটা চেপে গিয়ে বলে, ‘জার্মানরা বর্বর!’
অপিচ এসপেরেগাস এবং আর্টিচোক ছুরি-কাঁটা দিয়ে খাওয়া গো-হত্যার ন্যায় মহাপাপ–খেতে হয় হাত দিয়ে।
ইংরেজ যদিস্যাৎ কখনো রাইস-কারি কিংবা ইটালিয়ান রিসোট্রো (এক রকমের কিমাপোলাও) খায়, তবে টেবিল কিংবা ডেসার্ট স্পপুনি দিয়ে সে খাদ্য মুখে তোলে। তাই দেখে ফরাসি-ইতালি আঁতকে ওঠে—বলে, কী বর্বরতা! একটা আস্ত চামচ মুখে পুরছে।-বাপস। তারা রাইস-কারি খায় ডান হাতে কাঁটা নেয়—বিনা ছুরিতে। তাই দেখে চীনা ভদ্রসন্তান আবার ভিরমি যায়। বলে, একটা আস্ত ফর্ক মুখে ঢোকাচ্ছে-কী বর্বরতা! তার চেয়ে চপস্টিক কত পরিষ্কার, কত পরিপাটি।
আর বঙ্গসন্তান আমি বলি, এ সবকটি পদ্ধতিই বর্বর না হোক, অন্তত নোংরা। ফর্ক, স্পপুনি, এমন কি চপস্টিক পর্যন্ত আমার আপনি আঙুলের চেয়ে নোংরা। সব চেয়ে বটীয়া হোটেলের স্পপুনি নিয়ে আপনি আচ্ছাসে ন্যাপকিন দিয়ে ঘষুন-দেখতে পাবেন ন্যাপকিন কালো হয়ে গেল। অথচ আপনি হাত ধুয়ে যে খেতে বসেন, তখন কাপড়ে আঙুল ঘষলে কাপড় ময়লা হয় না।
কিন্তু আমার প্রধান আপত্তি টেবিলে বসে খাওয়াতে। টেবিল ক্লথ বাঁচিয়ে, ছুরি-কাঁটা না বাজিয়ে, জল খাওয়ার সময় গ্লাসে ঠোঁটের দাগ না লাগিয়ে টেবিলের তলায় পাশের কিংবা আসনের লোকের পায়ে গুস্তা না মেরে আপন গেলাস আর পরের গেলাসে খিচুড়ি না পাকিয়ে, আঁত্রের ফর্ক আর জয়েন্টের ফর্কে গোলমাল না বাধিয়ে, প্লেট শেষ হওয়ার পূর্বে ছুরি-কাঁটা পাশাপাশি না রেখে, ডাইনে-বঁয়ে সব কিছু রদিবরবাদ না করে, এবং আহারান্তে ঘোত ঘোত করে ঢেকুর না তুলে আহার করা আমার পক্ষে কঠিন, সুকঠিন। বিলিতি ডিনার খেতে পারেন মাত্র ম্যাজিশিয়ানরাই যাঁদের হাত-সাফাই আছে, যাঁরা চিড়িতনের টেক্কাকে বেমালুম হরতনের নয়লা বানিয়ে দিতে পারেন।
এবং সব চেয়ে গর্ভ-যন্ত্রণা, খাওয়ার দিকে আপনি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবেন। না। এর সঙ্গে ওর সঙ্গে আপনাকে মধুর মধুর বাক্যালাপ করতে হবে। আবহাওয়া থেকে আরম্ভ করে আপনাকে রিলেটিভিটি পর্যন্ত কপচাতে হবে। আবার শুধু গল্প করলে চলবে না—সঙ্গে সঙ্গে খেতে হবে। এর পরিমাণ সঠিক রাখা সেও এক কঠিন কর্ম। আপনি যদি প্রধান অতিথি হন, তবে আপনাকে বকর বকর করতে হবে বেশি, যদি আমার মতো ব্যাকবেঞ্চার হন, তবে চুপ করে সব কিছু শুনে যেতে হবে-তা সে যতই নিরস নিরানন্দ হোক না কেন?
বলুন তো মশাই, ভোজনের নেমন্তন্ন কি এগজামিনেশন হল?
***
নয়রাট লোকটি খুশ গল্প করে ঘরবাড়ি জমজমাট করে রাখতে চান সে কথাটা দু মিনিটেই বুঝে গেলুম, আর গৃহিণীর ভাবসাব দেখে অনুমান করলুম। ইনিও সাদাসিধে লোক, লৌকিকতার বড় ধার ধারেন না। খানাটেবিলের পাশে পৌঁছেই বললেন, ‘এ বাড়িতে পোলিশ গৰ্ভমেন্ট, (পোল্যান্ডের ইতিহাসে এত ঘন ঘন অরাজকতা আর বিদ্রোহ হয়েছে যে, জর্মন ভাষায় ‘পোলিশ গভর্নমেন্ট’ বলতে ‘এলো-মেলো’ ‘ছন্নছাড়া’ বোঝায়) যে যেখানে খুশি বসতে পারেন।’
নয়রাট বাধা দিয়ে বললেন, ‘সে কি করে হয়? আমি বসব আমার পশ্চাদেশের উপর, তুমি বসবে।–’
ফ্রানৎসিস্কা রাগ করে বললেন, ‘ছিঃ, পেটার, ভদ্রলোকের সঙ্গে তোমার আলাপ হয়েছে এই আজ সকালে; আর এরই ভিতর তুমি আরম্ভ করে দিয়েছ যত সব অশ্লীল কথা! তার উপর উনি আবার বিদেশী।’
নয়রাট বললেন, ‘দেখো, প্রিয়া, তুমি অনেকগুলো ভুল করেছ। প্রথমত তুমি বিলক্ষণ জানো, আমি দিশি-বিদেশীতে কোন ফারাক দেখতে পাই নে। যার সঙ্গে আমার মনের মিল, রুচির মিল হয় সে-ই আমার আত্মজন। কি বলেন আলিসাহেব?’
আমি বললুম, ‘অতি খাঁটি কথা। তবে ভারতীয় ঋষি বলেছেন, ‘আমি’ ‘তুমি’তে পার্থক্য করে লঘুচিত্তের লোক, যার চরিত্র উদার তার কাছে সর্ব বসুধা আত্মজন।
নয়রাটি গুম মেরে শুনলেন। অনেকক্ষণ ধরে ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় নাড়িয়ে শেষটায় বললেন, ‘এটা হজম করতে আমার একটু সময় লাগবে—ফ্রানৎসিস্কার রান্নার মতো।’
ফ্রানৎসিস্কা ভয়ঙ্কর চটে যাওয়ার ভান করে (আমার তাই মনে হল) বললেন, ‘দেখো, পেটার, তুমি খাওয়া বন্ধ করে এখখুনি রেস্তোরাঁ যাও; না হলে এই ডিশ ছুঁড়ে তোমার মাথা ফাটাব।’
পেটার অতি ধীরে ধীরে আরেক চামচ টমাটো সুপ গিলে নিয়ে প্রথম গিন্নিকে শুধালেন, আরো সুপ আছে কি না, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সবাইকে আত্মজ করা কি কখনো সম্ভব? এই দেখুন না, সেদিন ফ্রানৎসিস্কা বললেন, একজোড়া ফেন্সি নূতন জুতো কিনবে—দাম চল্লিশ ফ্রাঁ (৩৮)–আমি বললুম, আমার অত টাকা নেই, ফ্রানৎসিস্কা বললে, সে আমার কাছ থেকে টাকা চায় না, তার মা আসছেন দুদিন পরে, তিনি টাকাটা দেবেন। কি আর করি বলুন তো? তদন্ডেই টাকাটা ঝেড়ে দিলুম। ফ্রানৎসিস্কার মা! বাপরে বাপ! আপনি কখনো ম্যান-ইটার বাঘের মুখোমুখি হয়েছেন?’
আমি কিছু বলবার পূর্বেই ফ্রানৎসিস্কা আমাকে বললেন, ‘দোহাই মা-মেরির! এই পেটারটা যে কি মিথ্যাবাদী আপনাকে কি করে বোঝাই? (পেটারের আপত্তি শোনা গেল, ‘ডার্লিং, অশ্লীল গল্পের চেয়ে গালি-গালাজ অনেক বেশি খারাপ’) আমার মা যাতে বড়দিন এক-একা না কাটান তার জন্য নিজে-আমাকে না বলে—লুৎর্সেন গিয়ে তাঁকে এখানে নিয়ে এল। তার পর বছরের শেষ রাত্রে তার সঙ্গে ধেই ধেই করে নাচলে ভোর চারটে অবধি-ওঁর সঙ্গে নাচলে অন্তত পাঁচিশটা নাচ, আমার সঙ্গে দুটো, জোর তিনটে। বুড়িকে শ্যাম্পেন খাইয়ে খাইয়ে টং করিতে দিয়ে, যত সব অদ্ভুত পুরানো রাশান আর পোলিশ নাচ। কখনো সে মাটিতে বসে। উবুন্থাবড়ায়-মা তখন তার চতুর্দিকে পাই পাই করে চক্কর খাচ্ছেন-কখনো বঁদরের মত লম্ফ দিয়ে ছাতে মাথা ঠোকে-মা তখন ১৫ ডিগ্ৰীতে কাত হয়ে স্কার্ট তুলেছেন হাঁটু অবধি। তারপর তাকে কাঁধের উপরে তুলে নিয়ে বঁই বঁই করে ঘুরলে ঝাড়া দশ মিনিট। বাদবাকি নাচনে-ওলা-নাচনে-ওলীরা ততক্ষণে ফ্লোর তাদের জন্য সাফ করে দিয়ে আপন আপন টেবিলে চলে গিয়েছে। অরকেস্ট্রাও বদ্ধ পাগল হয়ে গিয়েছে, একটা নাচের জন্য ওরা বাজনা বাজায় দশ, জোর পনের মিনিট-ঐ মাৎসুর্কা না কি পাগলা নাচের জন্যে। ওরা বাজনা বাজালে পাকা এক ঘণ্টা। নাচের শেষে মা তো পড়ল চেয়ারে, ওদিকে কিন্তু চোখ বন্ধ করে বুড়ি মিটমিটিয়ে হাসছে—খুশিতে ডগোমগো!
