আমার অবস্থা তখন এক মাতাল আরেক স্যাঙাত মাতালকে সাফাই গাইবার জন্য নিয়ে এসে ধরা পড়লে যা হয়।
নাঃ, ভুল করেছি। ফ্রানৎসিস্কার কামড়ানোর চেয়ে ঘেউ-ঘেউটাই বেশি। বললে, ‘আঃ, আপনারাও যেমন। মেয়েছেলে এরকম দু-একটা কথা সব সময়েই কয়ে থাকেনওসব কি গায়ে মাখতে আছে? তুমি দাবা-খেলায় দু-একটা আজেবাজে চাল মাঝে মাঝে দাও না-দুশমন কি করে তাই দেখবার জন্য?’
আবার দাবা। খেয়েছে।
ফ্রানৎসিস্কা স্বামীকে বললেন, ‘আজ তো লাঞ্চের ব্যবস্থা বড় মামুলী। সুপ ফিশ আ লা রুসে (রাশান কায়দায়) আর অ্যাপল টার্ট উইথ হুইপটু ক্রম। তার চেয়ে বরঞ্চ চল রেস্তোরাঁয়-জিনীভা লেকের মাছ সুইস কায়দায় রান্না—ভালোমন্দ এটা সেটা।’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে শুধালেন, ‘আপনি কি খেতে ভালোবাসেন?’
আমি নিৰ্ভয়ে বললুম, ‘সুপ, ফিশ আ লা রুস, অ্যাপল টার্ট উইথ হুইপটু ক্ৰীম।’
হ্যার নয়রাষ্ট্র তো আনন্দে গদগদ। বললেন, ‘দেখলে গিন্নি, কি রকম অদ্ভুত আদবকায়দা। তুমি যদি বলতে আজ রোধেছি স্ট্রিকনিন-সুপ, পটাসিয়াম সায়ানাইড-ফ্রাইড, আর্সেনিক-পুডিং আর কোবরা-রসের কফি তা হলে উনি বলতেন, ‘দি আইডিয়া, আমি দু, বেলা ঐ জিনিস খাই’।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘দেখো, পেটার, বিশ্বসংসারের লোককে তুমি আপন মাপকাঠি দিয়ে মেপো না। তোমার মত ওঁর পেট অজুহাতের মানওয়ারী জাহাজ নয়।’
পেটার বললেন, ‘সব দাবা-খেলোয়াড়কেই অজুহাত-বিদ্যে আয়ত্ত করতে হয়। বিয়ের পরেই যে রকম হনিমুন, দাবা-খেলার পরই সেই রকম অজুহাত অন্বেষণ!’
আমি বললুম, ‘কিন্তু আমি তো দাবা খেলি নে!’
কথা শুনে দুজনাই খানিকক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। শেষটায় পেটার বললেন, ‘দেখলে গিন্নি, অজুহাতের রাজা করে কয়? একদম কবুল জবাব উনি দাবা খেলেন না! বাপস! মারি তো হাতি লুটি তো ভাণ্ডার। অজুহাত যদি দিতেই হয় তবে এমন একখানা ঝাড়ব যে মানুষ রা কাড়বার ফাঁকটি পাবে না। পাক্কা আড়াই ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে দেখলেন আমাদের খেলা, আর এখন অস্নান বদনে বলছেন। উনি দাবা খেলেন না!’
আমি সবিনয়ে শুধালাম, ‘আপনি কনসার্ট শুনতে যান? আচ্ছা, সেখানে তো পাকি সাড়ে তিন ঘণ্টা বাজনা শোনেন; তাই বলে কি আপনি পিয়ানো, ব্যালা, চেল্লো কত্তাল বাজান?’
ওদিকে দেখি ফ্রানৎসিস্কা আমাদের তর্কাতর্কিতে কান দিচ্ছেন না; শুধু বললেন, ‘তাই বলো, দাবা খেলা হচ্ছিল।’
চাণক্য বান্ধবের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজস্বারে যে সঙ্গ দেয় সে বান্ধব। আমার বিশ্বাস চাণক্য কখনো বিয়ে করেন নি। তা না হলে তিনি ‘রাজদ্বারে’ না বলে জায়াদ্ধারে’ বলতেন।
জানি, অতিশয় অভদ্রতা হল—তবু বললুম, ‘আমার ক্ষিদে পেয়েছে।’
বন্ধুর ফাসিটাকে মুলতুবী করাতে পারলুম—এই বা কি কম সান্ত্বনা।
***
আমরা বাড়িতে রান্নাঘরের বারান্দায় বসে যেরকম হাপুসহুপুস শব্দ করে আহারাদি
সমাপন করি, নেমন্তন্ন খেতে গিয়েও প্রায় সেই রকমই করে থাকি। তফাত মাত্র এইটুকু যে, বাড়িতে চিৎকার করে বলি, ‘আরো দুখানা মাছভাজা দাও’, নেমন্তন্ন বাড়িতে বলি, ‘চৌধুরী মশাইকে আরো দুখানা মাছভাজা দাও।’
সায়েব-সুবোদের কিন্তু বাড়ির খাওয়াতে, রেস্তোরাঁয় আহারে এবং নেমন্তন্নের ভোজনে ভিন্ন ভিন্ন কায়দা-কেতায় খাওয়া-দাওয়া করতে হয়। সায়েবরা বাড়িতে খেতে বসে গোগ্রাসে গোস্ত গেলে আর পোশাকী ডিনারে কিংবা ব্যানকুয়েটে একরকম না খেয়েই বাড়ি ফেরে। ব্যানকুয়েটে আপনাকে সুপ দেওয়া হবে আড়াই চামচ, তার থেকে আপনি খাবেন। দেড় চামচ। ডিনারে সুপ খেয়ে ন্যাপকিন দিয়ে মোলায়েম কায়দায় ঠোঁট ব্লট করবেন, কিন্তু ডুক অব উইন্ডসরের সঙ্গে ব্যানকুয়েট খেতে বসলে ঠোঁট ব্লট করাও নিষিদ্ধ, অর্থাৎ তখন ধরে নেওয়া হয়, আপনি এতই কম সুপ খেয়েছেন যে, আপনার ঠোঁট পর্যন্ত ভেজে নি। তারপর পদের পর পদ উত্তম খাদ্য আসবে-আপনি আপন প্লেটে তুলে নেবেন কখনো আড়াই আউন্স, কখনো দু আউন্স এবং খাবেন তার থেকে এক আউন্স কিংবা তার চেয়েও কম। মুর্গীর হাডি থেকে যে ছুরি দিয়ে মাংস চাচবেন তার উপায় নেই এবং গ্ৰেভিটুকুর মোহ করেছেন কি মরেছেন। সাইড প্লেটে যে এক স্নাইস টেস্ট দিয়েছিল তার একদশমাংসের বেশি খেলে পাঁচজনে ভাববে, আপনি রায়লসীমার দুৰ্ভিক্ষ-প্ৰপীড়িত ‘পারিয়া’ কিংবা মধ্য-আফ্রিকার মিশনারি-খেকো হটেনটট্।
বিশ্বাস করবেন না, এক খানদানী ক্লাবে আমি দুই পক্ষকে পাকি দু ঘণ্টা ধরে তর্কাতর্কি করতে শুনলুম, সসেজ কি করে খেতে হয়। সমস্যাটা এইরূপ:—(ক) সসেজ থেকে ছুরি দিয়ে চাক্তি কেটে নিয়ে তার উপর মাস্টার্ড মাখাবে কিংবা (খ) প্রথম সসেজের ডগায় মাস্টার্ড মাখিয়ে নিয়ে পরে সসেজ থেকে চাক্তি কেটে তুলবে? আমি প্রথম পক্ষের হয়ে লড়াই করেছিলুম এবং শেষটায় আমরা ভোটে হেরে গেলুম। এর থেকেই বুঝতে পারছেন, আমি খানদানী খানা খেতে শিখি নি-ব্যানকুয়েটে আমার নাভিশ্বাস ওঠে।
বিশ্বাস করবেন না, মাসখানেক হল এক সুইস খবরের কাগজে দেখি, এক ভদ্রলোক প্রশ্ন করেছেন, প্লেটে যে গ্ৰেভি পড়ে থাকে, তার উপর রুটি টুকরো টুকরো করে ফেলে সেই গ্রেভি চেটেপুটে নেওয়া (জর্মন শব্দ tunken) ব্যাকরণসম্মত-অৰ্থাৎ কায়দাদুরস্ত-কি না?
উত্তরে এক ‘খানদানী মনিষ্যি’ বলেছেন, কিছুকাল পূর্বেও এ-অভ্যাস কি বাড়িতে, কি রেস্তোরাঁয়, কি ব্যানকুয়েটে সর্বত্রই অতিশয় নিন্দনীয় বলে গণ্য করা হত, কিন্তু আজকের বিশ্বময় খাদ্যাভাবের দিনে বাড়িতে-আপনি ডাইনিং রুমে কর্মটি ক্ষমার্হ।
