খেলোয়াড়টি উঠে দাঁড়িয়ে সেই দর্শককে বললেন, ‘আপনি তাহলে বসেন।’ দর্শক তখন খেলোয়াড়রূপে বসে প্রথম সামলালেন। আপনি ঘর, তার পর দিতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে চাপ। স্পষ্ট বোঝা গেল ইনি উচ্চাঙ্গের লেঠেল। এবার অন্য পক্ষের প্রাণ যায় আর কি। শেষটায়। তাই হল। পয়লা বারের কসাই এবারে বকরি হয়ে বললেন-যা বললেন-তার অর্থ ‘হরিবোল বল হরি!’
আমরা লক্ষ্য করি নি কেইবা এরূপ স্থলে করে-আরো জনতিনেক দর্শক তখন বেড়ে গিয়েছেন। তাঁদেরই একজন তখন মিনমিনিয়ে বললেন, ‘কেন, গজটা পেছিয়ে নিলে হয় না?’
এ চালের অর্থটা আমার কাছে ধরা পড়ল না। কিন্তু কসাই দেখলুম ধরতে পেরেছেন। শুধু বললেন, ‘হুঁ।’ তখন পয়লা বারের কসাই, দুসর বারের বকরি উঠে বললেন, ‘আপনি তা হলে বসুন।’
অর্থাৎ খোল-নীলচে দুইই তখন বদলে গিয়েছে।
এবারে সত্যি সত্যি লাগল মোষের লড়াই।
শেষটায় খেলা চাল-মাত হল।
***
ফিরে এসে আপন চেয়ারে বসলুম।
খেলোয়াড়দের একজন তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। এক চণ্ডু-খানায় যখন এতক্ষণ একসঙ্গে আফিং খেয়েছি তখন খানিকটে পরিচয় হয়ে গিয়েছে বই কি-একটা ছোট নড় করলুম। ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সুপ্ৰভাত।’ আমি বললুম, ‘বসুন, বসুন!’
ঝুপ করে বসে পড়ে বললেন, ‘‘বসুন’, হুঁঃ, ‘বসুন’’। ওদিকে আমার প্রাণ যায় আর কি?’
আমি শুধালুম, ‘কেন, কি হয়েছে?’ বুঝলুম লোকটি দিলখোলা।
বললেন, ‘জবাই করবে, মশাই, জবাই করবে। আমাকে-বউ। বলেছিলুম, এই এলুম। বলে। কি করে জানব বলুন, দাবার চক্করে পড়ে যাব। বলতে পারেন, মশাই, এই বিদঘুটে খেলা বের করেছিল কে? হাঁ, হাঁ, ভারতবর্ষেই তো এর জন্মভূমি। কিন্তু এদেশে এল কি করে?’
‘শুনেছি পারসিকরা আমাদের কাছ থেকে শেখে, আরবরা তাদের কাছ থেকে, তারপর ক্রুসেডের লড়াইয়ে বন্দী ইয়োরোপীয়রা শেখে আরবদের কাছ থেকে, তারা দেশে ফিরে-’
‘আমাদের মজালে। কিন্তু এখন আমার উপায় কি? আপনারা এ অবস্থায় দেশে কি করেন?’
‘চাঁদ-পানা মুখ করে গাল সই।’
‘ব্যস! ব্যামোটা বাধিয়ে বসে আছেন ঠিক; ওষুধটা বের করতে পারেন নি। কিন্তু আমি পেরেছি। চলুন, আমার সঙ্গে, লঞ্চ খাবেন।’
‘আর গালও খাব? না?’
‘না, না, আপনাকে বকিবে কেন? আমি বলব, এর সঙ্গে গল্প করতে করতে কি করে যে বেলা বয়ে গেল ঠাহর করতে পারি নি। চলুন, চলুন আর দেরি করা নয়।’
চললুম।
ভদ্রলোকের বয়স-এই ধরুন ৪৫-৪৬। স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ, পরনে উত্তম রুচির কোটপাতলুন-টাই। সব কিছু পরিপাটি। তাই অনুমান করলুম। তাঁর অর্ধাঙ্গিনী তাকে বকুন-ঝকুন আর যা-ই করুন না কেন, গৃহিণী হিসেবে তিনি ভালোই।
বললেন, ‘যা খুশি তাই বউকে বলে যাবেন, কিছু ভয় করবেন না। তাকে যদি ভুলিয়ে-ভালিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুণী বানিয়ে সিংহলে পাঠিয়ে দিতে পারেন, তাতেও আমি কোনো আপত্তি করব না, কিন্তু স্যার, দয়া করে ঐ দাবা খেলার কথাটি চেপে যাবেন।’
আমি বললুম, ‘নিশ্চয়ই।’
দরজা খুলে দিলেন স্বয়ং স্ত্রী। কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার পূর্বেই ভদ্রলোক আলাপ করিয়ে দিলেন, ‘ইনি আমার স্ত্রী, ফ্রানৎসিসকো-ফ্রানৎসিস্কা নয়রাষ্ট্ৰ।’ আমি বললুম, ‘আমার নাম আলী।’
ফ্রানৎসিস্কার বয়স ৩৫-৩৬ হবে। সুইজারল্যান্ডে এই বয়সে মেয়েদের পূর্ণ যুবতী বলে ধরা হয়। এ-যৌবনে কুমারীর রূপের নেশা আর মাতৃত্বের মাধুরী মিশে গিয়ে যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে তার রস মানুষ নিৰ্ভয়ে উপভোগ করতে পারে—স্বামী সন্দেহের চোখে দেখে না, রমণী আপনার চোখে চটক লাগাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে না। মেয়েদের আচরণ এ সময় সত্যই বড় মধুর হয়; কখনো তারা তরুণীর মতো ভাবে বিহ্বল আত্মহারা হয়ে অকারণ বেদনার কাহিনী বলে যায়, কখনো আবার মাতৃত্বের গর্ব নিয়ে আপনাকে নানা সদুপদেশ দেয়, বিয়ে-থা করে ঘর-সংসার পাতবার জন্য স্নিগ্ধচোখে অনুনয়-বিনয় করে।
স্ত্রীকে কিছু বলতে না দিয়েই হ্যার নয়রাটু বকে যেতে লাগলেন, ‘বুঝলে ফ্রানৎসিস্কা, আমি ঠিক সময়েই ফিরে আসতুমি কিন্তু এই হার আলীর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। ইনি ভারতবর্ষের লোক-শুনেছি তো ভারতবর্ষের লোক কি রকম গুণী-জ্ঞানী হয়। ইনি তাঁদেরই একজন। তার প্রমাণও আমি হাতে-নোতে পেয়ে গিয়েছি। রাস্তায় আসতে আসতে তাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেলুম, সাতদিন ধরে এসেছেন জিনীভায়, এখনো লীগ অব নেশনসের ‘চিড়িয়াখানা’ দেখতে যান নি, শামুনিক্স চড়েন নি, অপেরা থিয়েটার কিছুই দেখেন নি। আর সব টুরিস্টদের মতো সুইটজারল্যান্ডের প্রত্যেক দ্রষ্টব্য বস্তুকে পিঁপড়ে নিঙড়ে ঘি বের করাবার জন্য উঠে পড়ে লাগেন নি। আমার তো মনে হয়, এ-দেশের উচিত এঁকে এঁর খর্চর পয়সা কিছু ফেরৎ দেওয়া। কী বল?’
পাছে ভদ্রমহিলার অভিমানে ঘা লাগে, আমি তার দেশের কুতুব তাজ ভারতীয় দম্ভের নেশায় তাচ্ছিল্য করছি তাই তাড়াতাড়ি বললুম, ‘আমি বড় দুর্বল, বেশি ঘোরাঘুরি করলে ক্লাস্ত হয়ে পড়ি। আস্তে আস্তে সব-কিছুই দেখে নেব।’
ফ্রানৎসিস্কা বললেন, ‘সেই ভালো। শামুনিরুক্স পাহাড় তো আর বসন্তের বরফ নয় যে দুদিনে গলে যাবে, সুইটজারল্যান্ড ভ্ৰমণ তো আর দাবাখেলা নয় যে সুযোগ পেয়েও দুটি কিস্তি না দিলে—’
বাকিটা আমি আর শুনতে পাইনি। আমি তখন ওয়াল-পেপার হয়ে দেওয়ালের সঙ্গে মিশে যাবার জন্য আস্তে আস্তে পিছুপা হতে আরম্ভ করেছি।
শুনি, হ্যার নয়রাটু ব্যথা-ভরা সুরে বলছেন, ‘গিন্নি, ছিঃ।’
