কৈশোরের সেই অনাবিল প্রেম কিরূপে আস্তে আস্তে তার বিকাশ পেয়েছিল, তুৰ্গেনিয়েফা তার সবিস্তার বর্ণনা দেন নি।–তাই নিয়ে আমার শোকের অন্ত নেই।
দুজনে দেখা হত। হাতে হাত রেখে তারা নদীর ওপারের ঘনায়মান অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত। চাঁদ উঠত। সন্ধ্যার ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে আরম্ভ করলে তুৰ্গেনিয়েফ তার ওভারকেট দিয়ে মেয়েটিকে জড়িয়ে দিতেন। সে হয়ত মৃদু আপত্তি করত—কিন্তু নিশ্চয়ই জানি ইভানের কোনো ইচ্ছায় সে বেশিক্ষণ বাধা দিতে পারত না।
তুৰ্গেনিয়েফ সম্পূর্ণ সেরে উঠেছেন। বাড়ি থেকে হুকুম এসেছে প্যারিস যেতে।
বিদায়ের শেষ সন্ধ্যা এল। কাজ সেরে মেয়েটি যখন ছুটে এল ইভানের কাছ থেকে বিদায় নিতে, তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।
অঝোরে নীরবে কেঁদেছিল। শুধু মেয়েটি। তুৰ্গেনিয়েফ বারে বারে সাত্বনা দিয়ে বলেছিলেন ‘তুমি এরকম ধারা কাঁদিছো কেন? আমি তো আবার ফিরে আসব-শিগগিরই। তোমার কান্না দেখে মনে হচ্ছে, তুমি ভাবছি, আমি আর কখনও ফিরে আসব না।’
কিন্তু হায়, এসব কথায় কি ভাঙা বুক সান্ত্বনা মানে? জানি, তুৰ্গেনিয়েফের তখনো বিশ্বাস ছিল তিনি ফিরে আসবেন, কিন্তু যে ভালোবসেছে সমস্ত সত্তা সর্বৈব অস্তিত্ব দিয়ে তার হৃদয় তো তখন ভবিষ্যৎ দেখতে পায়-বিধাতা পুরুষেরই মত।
তুৰ্গেনিয়েফ বললেন, ‘তোমার জন্য প্যারিস থেকে কি নিয়ে আসব?’
কোনো উত্তর নেই।
‘বল কি নিয়ে আসব?’
‘কিচ্ছু না–শুধু তুমি ফিরে এসো।’
কিছু না? সে কি কথা? আর সবাই তো এটা, ওটা, সেটা চেয়েছে। এই দেখো, আমি নোটবুকে সব কিছু টুকে নিয়েছি। কিন্তু তোমার জন্য সব চেয়ে ভালো, সব চেয়ে দামী জিনিস আনতে চাই। বলো কি আনব?’
‘কিচ্ছু না।’
তুৰ্গেনিয়োফকে অনেকক্ষণ ধরে পীড়াপীড়ি করতে হয়েছিল, মেয়েটির কাছ থেকে কোন একটা কিছু একটার ফরমাইশ বের করতে। শেষটায় সে বললে, ‘তবে আমার জন্য সুগন্ধি সাবান নিয়ে এসো।’
তুৰ্গেনিয়েফ তো অবাক। এই সামান্য জিনিস! কিন্তু কেন বলে তো, তোমার আজ সাবানে শখ গেল? কই তুমি তো কখনো পাউডার সাবানের জন্য এতটুকু মায়া দেখাও নি—তুমি তো সাজগোজ করতে পছন্দ কর না।’
নিরুত্তর।
‘বলো।‘
‘তা হলে আনবার দরকার নেই।’ তারপর ইভানের কেলৈ মাথা রেখে কেঁদে বলল, ‘ওগো, শুধু তুমি ফিরে এসো।’
‘আমি নিশ্চয়ই সাবান নিয়ে আসব। কিন্তু বল, তুমি কেন সুগন্ধি সাবান চাইলে?’
কোলে মাথা গুঁজে মেয়েটি বলল, ‘তুমি আমার হাতে চুমো খেতে ভালোবাসো আমি জানি। আর আমার হাতে লেগে থাকে সব সময় মাছের আঁশটে গন্ধ। কিছুতেই ছাড়াতে পারি নে। প্যারিসের সুগন্ধি সাবানে শুনেছি সব গন্ধ কেটে যায়। তখন চুমো খেতে তোমার গন্ধ লাগবে না।’
অদৃষ্ট তুৰ্গেনিয়োফকে সে গ্রামে ফেরবার অনুমতি দেন নি।
সে দুঃখ তুৰ্গেনিয়েফও বুড়ো বয়স পর্যন্ত ভুলতে পারেন নি।
নয়রাট
দেশভ্রমণের সময় যারা ছন্নের মতো ছুটোছুটি করে-অর্থাৎ সকালে মিউজিয়াম, দুপুরে চিত্রশালা, বিকেলে গির্জে দর্শন, সন্ধ্যায় অপেরা, রাতদুপুরে কাবারে, আমি তাদের দলে নেই। দেশে ফেরার পর কোনো পাক্কা টুরিস্ট যদি আশ্চর্য হয়ে বলেন, ‘সে কি হে? তুমি প্রাগে তিন দিন কাটালে। অথচ বলছি। রাজা কালের বর্মাভিরণ-অস্ত্রশস্ত্রের মিউজিয়াম দেখ নি-এ তো অবিশ্বাস্য’, আমি তাহলে তা নিয়ে তর্কাতর্কি করিনে কারণ মনে মনে জানি আমি প্রত্যেকটি কড়ির পুরো দাম তোলার জন্য দেশভ্রমণে বেরই নি। ছ। পয়সার টিকিট আমাকে শ্যামবাজার পর্যন্ত নিয়ে যায়-আমি নামিব হেদোয়-তাই আমাকে শ্যামবাজার পর্যন্ত গিয়ে সেখানে নেমে, পায়ে হেঁটে ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে হেদোয় এসে বেঞ্চিতে বসে ধুঁকতে হবে নাকি? আটনম্বরের জুতো ছটাকায় দিচ্ছে বলে আমার ছ নম্বরী পা-কে আট-নম্বরী পরাতে যাব নাকি?
তাই আমার উপদেশ ও কর্মটি করতে যাবেন না। খাওয়ার যেরকম সীমা আছে, ভালো জিনিস দেখারও একটা সীমা আছে। ক্লান্তি বোধ হলেই দেখা ক্ষান্ত দিয়ে একটা কাফেতে বসে যাবেন কিংবা যদি বাগানে বসবার মতো আবহাওয়া হয় তবে বাগানে বসে কফি, চা, বিয়ার কিছু একটা অর্ডার দিয়ে সিগারেটটি ধরিয়ে আরামসে গা এলিয়ে দেবেন।
এই হল জাবর-কাটার মোকা। এ কদিনে যা কিছু দেখেছেন তার মধ্যে যে কটি মনে ঢেউ তুলেছিল। সেই ঢেউগুলি শুনবেন। কিংবা বলব আপনার মনের ফিল্ম যে ছবিগুলো তুলেছিল তার গুটিকয়েক ডিভলাপ প্রিনটিং করবেন, চোখ বন্ধ করে এক-একটা দেখবেন
আমার পাশের টেবিলে দুই পাঁড় দাবাখেলনেওলা বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে দাবা খেলছিলেন। দু’কাপ কফি হিম হয়ে গিয়েছে—উপরে কফির ঘন সর পড়েছে। জামবাটি সাইজ অ্যাশ-ট্রে পোড়া সিগারেটে ভর্তি। আরো জনতিনেক লোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে, কিন্তু কারো মুখে কথা নেই, এ দৃশ্য বাঙালিকে রঙ ফলিয়ে দেখাতে হবে না। কৈলাস খুড়োর যে ছবি শরচ্চন্দ্র এঁকে গিয়েছেন তার দোহার গাইবার প্রয়োজন বাঙলাদেশে বহুকাল ধরে হবে না।
খেলোয়াড়দের একজন দেখলুম ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে আসছেন। আধা ঘণ্টাতেই কাবু হয়ে গেলেন। গজের কিস্তিতে যখন মাত হবু-হবু, তখন ঘাড়গির্দানে ‘শ্রাগ’ করে। বললেন, ‘স্পাঞ্জ ফেলে দিলুম, অর্থাৎ আমার খেলা গয়াগঙ্গাগদাধরহরি।
দর্শকদের একজন তখন মিনমিনিয়ে বললেন, ‘কেন? ঐ বড়েটা একঘর ঠেলে দিলে হয় না?’
খাসা চাল তো! ওদিকে কারো নজরই যায় নি। এ চালে আরো খানিকক্ষণ লড়াই দেওয়া যেতে পারে।
