আমি তখন বুঝতে পারিনি, পরে পারি যে আর পাঁচজনের মতো তিনিও রাসপুতিনের রগরগে কাহিনী কীর্তন করতে প্রস্তুত ছিলেন বটে, কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল এরই মাধ্যমে– ফাঁকি দিয়ে শটকে শেখানোর মতো– আমাকে সাধারণ ভারতীয় ছাত্রের পাঠ্যবস্তুর গণ্ডি থেকে বের করে পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেওয়া। বলা বাহুল্য, এসব আমার সম্বন্ধে নিছক ব্যক্তিগত কথা হলে আমি এগুলো উল্লেখ করতুম না, আমার অন্যতম উদ্দেশ্য, এই সুবাদে তখনকার দিনের স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ-চালিত বিশ্বভারতীয় (স্কুল ও কলেজ– যথাক্রমে ‘পূর্ব’ ও ‘উত্তর’ বিভাগ) অধ্যাপকগণ কী প্রকৃতি ধারণ করতেন তারই যৎকিঞ্চিৎ বর্ণনা।
অধ্যাপক বলেছিলেন, এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ অবাধে করা যাচ্ছে এবং তদুপরি সেটা ধর্ম নামে প্রচারিত হচ্ছে, এটা যে জনপ্রিয় হবে– অন্তত জনগণের অংশবিশেষে সেটা তো অতিশয় স্বাভাবিক। কিন্তু এই যে এক অজানা-অচেনা অর্ধলুপ্ত ধূলিসৃতি সম্প্রদায় হঠাৎ নবজীবন লাভ করে খুদ জারের প্রাসাদ পর্যন্ত পৌঁছে গেল, এটা তো আর একটা আকস্মিক অকারণ কর্তাবিহীন কর্ম নয়। এরকম একটা নব আন্দোলন আনয়নকারী পুরুষের কোনও না-কোনও অসাধারণ গুণ, আকর্ষণ বা সম্মোহনশক্তি থাকা নিশ্চয়ই প্রয়োজন।
পূর্বেই বলেছি, অধ্যাপক ছিলেন কট্টর ‘অর্থডকস গ্রিক চার্চ’-এর অন্ধ ভক্ত। কিন্তু এস্থলে এসে তিনিও স্বীকার করলেন, রাসপুতিন একাধিক অলৌকিক শক্তি ধারণ করতেন। তিনি যে কঠিন দুরারোগ্য রোগ কোনও প্রকারের ঔষধ প্রয়োগ না করে প্রশম করতে পারতেন সেটারও উল্লেখ করলেন। কী প্রকারে? কেউ জানে না।
ইতোমধ্যে জার-প্রাসাদের ওপর মৃত্যু যেন তার করাল ছায়া বিস্তার করেছে। হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বালক যুবরাজ আহত হন। তাঁর রক্তক্ষরণ আর কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। ভিয়েনা-বার্লিন থেকে বড় বড় চিকিৎসক এসেছেন। আমি অধ্যাপককে শুধিয়েছিলুম, ‘চিকিৎসাশাস্ত্রে কি রাশা তখনও এতই পশ্চাৎপদ?’ তিনি বলেছিলেন, ‘বলা শক্ত, তবে সাহিত্যের বেলা চেখফ যা বলেছেন এস্থলেও হয়তো সেটা প্রযোজ্য: তোমার প্রিয় লেখক চেখফ বলেছেন, ‘হ্যাঁ, আলবৎ আমরা রুশি সাহিত্য পড়ি। কিন্তু সেটা ওই যে রকম আমরা কুটিরশিল্পকে মেহেরবানি করে সাহায্য করি। আসলে মালের জন্য যাই ফরাসি সাহিত্যে।’ হয়তো চিকিৎসার বেলাও তখন তাই ছিল।’
.
দাসী না ডাচেস– সমাজের দুই প্রান্তের দু জনা– কে প্রথম রাসপুতিনকে নিয়ে গেল জারের রাজপ্রাসাদে?
সে কে? যুবরাজ মৃত্যুশয্যায়, আপন ‘কটেজ ইনডাসট্রি’র রাশান ডাক্তাররা তো হার মেনেছেনই, ভিয়েনা-বার্লিনের রাজবৈদ্যরাও, যারা কি না কাইজারের, এমপেরার ফ্রানৎস যোসেফের প্রাসাদের গণ্যমান্যদের চিকিৎসা করে করে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছেন তারা পর্যন্ত রাশা ছেড়ে পালাতে পারলে বাঁচেন। কারণ রুশ যুবরাজের যে রোগ হয়েছে সেটার নাম হ্যামোফিলিয়া– আমরা গরিবদের, না জানি কোন পুণ্যের ফলে, আমাদের হয় না– ব্যামোটা শব্দার্থেই রাজসিক, শুধু রাজা-রাজড়াদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ। পূর্বে ছিল এই বিশ্বাস; পরে দেখা গেল, গরিবদেরও হয়। আমরা বললুম, সেই কথাই কও! ভগবান যে হঠাৎ খামোখা এহেন দুরারোগ্য ব্যাধি শুধু বড়লোকদের জন্যই রিজার্ভ করে রেখে দেবেন, এটা তো অকল্পনীয়। ব্যামোগুলো তো আমাদের মতন গরিবদের জন্যই তৈরি হয়েছে। ভগবান স্বয়ং তো রাজাদের দলে। কিংডম অব দি হেভেন বা স্বর্গরাজ্যে যাঁরা বাস করে, তিনি তো ফেভার করবেন তাঁর জাতভাই তাঁদেরই, যাঁদের কিংডম্ অব দি আর্থ বা পৃথ্বীরাজ্য আছে।(২) তাই যদি হয়, তবে স্বর্গরাজ্যই হোক, আর ভূস্বর্গই হোক, ভিয়েনা-বার্লিনের অশ্বিনীকুমারদ্বয় যেখানে রুগীকে হরিনামের গুলি দিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ার তালে, সেখানে দাসী ‘ফার্সি’ পড়বে? হয়তো ঠিক সেইখানেই, কিন্তু অন্য কারণও আছে।
আমরা এ দেশে যত কুসংস্কারাচ্ছন্নই হই-না কেন, একাধিক বাবদে অন্তত সে যুগে, অর্থাৎ শতাব্দীর প্রারম্ভে জারের রাশা আমাদের অনায়াসে হার মানাতে পারত। সে রাশার গ্রিক অর্থডকস চার্চ ছিল শব্দার্থেই অর্থডক্স্ গোঁড়া, কট্টর কুসংস্কারাচ্ছন্ন। আর চাষাভুষোদের তো কথাই নেই। তন্ত্রমন্ত্র, জড়িবড়ি, মাদুলি-কবচ থেকে আরম্ভ করে নিরপরাধ ‘প্রভু যিশুর হত্যাকারী ইহুদিদের সুযোগ পেলেই বেধড়ক মার, এবং সেখানেই শেষ নয়– আপন রক্তের আপন ধর্মের জাতভাই যারা এসব কুসংস্কার থেকে একটুখানি মুক্ত হয়ে, অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ স্বাধীনভাবে প্রভু যিশুর বাণী জীবন দিয়ে গ্রহণ করার চেষ্টা করত যেমন ‘দুখবর’, ‘স্তান্দিন্ত’ সম্প্রদায়– তাদের ওপর কী বীভৎস অত্যাচার।(৩) এবং চাষাভুষোদের এই অত্যাচার-ইন্ধনে কাষ্ঠ সরবরাহ করতেন জার-সম্প্রদায় এবং তাঁদের অনুগ্রহে লালিত-পালিত বিলাসব্যসনে গোপন পাপাচারে আকণ্ঠ নিমগ্ন অর্থডক্স চার্চ তার আপন ‘পোপ’–হোলি সিনডকে নিয়ে। যে ইউসুপফ এর কয়েক বত্সর পর রাসপুতিনের ভবলীলা সাঙ্গ করেন, তিনি বা তাঁর ভাই, আরেজ গ্রান্ড ডিউক প্রকাশ্য ‘ডুমা’ বা মন্ত্রণা-সভায় প্রস্তাব করেন এবং বহু বিনিদ্র যামিনী যাপন করে স্বহস্তে নির্মিত পরিকল্পনা সঙ্গে সঙ্গে পেশ করেন, ইহুদিদের সবংশে বিনাশ করার জন্য কী প্রকারে, স্তরে স্তরে শল্য প্রয়োগ দ্বারা তাদের পুরুষদের সন্তান-প্রজনন ক্ষমতা হরণ করা যায়? বগদান সাহেব বলেছিলেন, মাই বয়, হি সাবৃমিটেড় ইট ইন অল সিরিয়াসনেস্! অবশ্য তৎসত্ত্বেও মার্জিত রুচিসম্পন্ন ভদ্রসন্তান অধ্যাপক বগদানফ ইহুদিদের। ঘৃণা করতেন– হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে, ওই-জাতীয় আর পাঁচটি বর্বর রুশের মতো। বিশ্বভারতীতে তখন একটি সুন্দরী, বিদেশিনী, ইহুদি অধ্যাপিকা ছিলেন; কী প্রসঙ্গে তাঁর কথা উঠতে বগদানফ তিক্ত অবজ্ঞায় মুখ বিকৃত করে বললেন, ‘আই উফ নট টাচ হার উইথ এ পেয়ার অব টংস!’– সাঁড়াশি দিয়েও তিনি তাঁকে স্পর্শ করতে রাজি হবেন না!
