এ কথা সবাই বলেছেন, রাজধানী সেন্ট পেটেরসবুর্গে (তখন অবশ্য রাশা জর্মনির সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লিপ্ত বলে তাদের সভ্যতায় জর্মনদের যে শতকরা আশি ভাগ অবদান, মায় তাদের ভাষায় প্রবেশপ্রাপ্ত জর্মন শব্দ, যেমন সেন্ট পেটেরসবর্গের জর্মন অংশ ‘বুর্গ’– ‘প্রাসাদ’, ‘কাসল’–সমূলে উৎপাটিত করে নামকরণ করেছে ‘পেত্রোগ্রাদ’। সর্বশেষে এর নামকরণ হয় ‘লেনিনগ্রাদ’, কিন্তু ততদিনে রাজধানী চলে গেছে মস্কোতে। জারের ‘উইন্টার পেলেস’ প্রাসাদে বিরাজ করত কেমন যেন এক অদ্ভুত রহস্যময় (প্রধানত ধার্মিক– mysticism) বাতাবরণ। সম্রাজ্ঞী—জারিনা– ছিলেন অতিশয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আচার-অনুষ্ঠানে সদালিপ্ত, প্রতি মুহূর্তে পুত্রের পুনর্বার রক্তক্ষরণ রোগে আক্রান্ত হবার ভয়ে উদয়াস্ত সশঙ্কিত; বিশেষ করে যখন হৃদয়ঙ্গম করলেন যে, প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি এই কঠিন পীড়ার সম্মুখে সম্পূর্ণ পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে, তখন যে তিনি পাগলিনীর মতো রাজ্যের যত প্রকারের টোটকামোটকা, তাবিজমাদুলির সন্ধানে লেগে যাবেন সেটা অবাঞ্ছনীয় হলেও অবোধ্য নয়– এমনকি কট্টর বৈজ্ঞানিকও সেখানে সহানুভূতি দেখাবে। একেই তো শীত-প্রাসাদে বিরাজ করত রহস্যময় বাতাবরণ, যেন সেখানে যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও প্রকারের অলৌকিক কাণ্ড ঘটে যেতে পারে, তদুপরি নানাশ্রেণির কুটিল ভাগ্যান্বেষী সেই প্রাসাদে কোনও প্রকারের চতুরতা দ্বারা অর্থ সঞ্চয়ের জন্য গমনাগমন করছে, সেখানে যদি নিত্যসঙ্গিনী দাসীটিও বলে যে, সে একজন ‘হোলিম্যান’, ‘সাধুতপস্বী’কে চেনে যাঁর হৃদয়ে প্রভু যিশুর সামান্যাংশ প্রবেশ করার ফলে (‘সেই শাশ্বত সত্তার একটি কণা আমাতে অবতাররূপে অবতীর্ণ হয়েছে’- রাসপুতিনের আপন ভাষায়) তিনি প্রভুরই মতো বহু দুরারোগ্য ব্যাধি, কোনও ঔষধ প্রয়োগ না করে অবলীলাক্রমে আরোগ্য করতে পারেন, তবে মহারানি যে নিমজ্জমানার ন্যায় সেই তৃণখণ্ডকেও দৃঢ়-হস্তে ধারণ করবেন সেটা তো তেমন-কিছু অসম্ভব আচরণ নয়।
অন্যপক্ষ বলেন, দাসী নয় ডিউক।
রাসপুতিন দিগ্বিজয় করতে করতে পেত্রোগ্রাদ– সম্ভব হলে রাজপ্রাসাদ– জয় করবেন বলে মনস্থির করেছেন। এদিকে সেখানকার যাজক সম্প্রদায়ের কেউ-বা তাঁর জনপ্রিয়তার সংবাদ শুনে, কেউ-বা তাঁর ধর্মের নবজাগরণ প্রচেষ্টার খ্যাতি শুনে, কেউ-বা তাঁর অলৌকিক কর্মক্ষমতার জনরবে আকৃষ্ট হয়ে সেটা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্য, এক কথায় অনেকেই। অনেক কারণে তার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে উদগ্রীব। রাসপুতিন সশিষ্য-শিষ্যা পেত্রোগ্রাদে প্রবেশ করে সে প্রবেশ প্রায় খ্রিস্টের পূতপবিত্র জেরুজালেমের পুণ্যভূমিতে প্রবেশ করার সমতুল– সাড়ম্বরে প্রতিষ্ঠিত হলেন এক প্রভাবশালী শিষ্যের গৃহে। শীঘই যোগসূত্র স্থাপিত হল পেত্রোগ্রাদের সর্বোৎকৃষ্ট ধর্মশিক্ষাশালার সুপণ্ডিত অধ্যক্ষের সঙ্গে। ইনি আবার মহারানির আপন ব্যক্তিগত পুরোহিত অর্থাৎ এরই সামনে মহারানি প্রতি সপ্তাহে একবার ‘কনফেস’ করেন, ওই সপ্তাহে তিনি যেসব পাপচিন্তা করেছেন, কর্মে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন, সেগুলো স্বীকার করে শাস্ত্ৰাদেশ অনুযায়ী প্রায়শ্চিত্তাদেশ গ্রহণ করেন প্রায়শ্চিত্ত সাধারণত উপবাস ও মালাজপের গণ্ডিতেই আবদ্ধ থাকে। এই কনফেশন গ্রহণ করে যে পুরোহিত প্রায়শ্চিত্তাদেশ প্রদান করেন তার পদটি স্বভাবতই সাতিশয় গাম্ভীর্য ও গুরুত্ব ধারণ করে। তিনি সম্রাজ্ঞী-হৃদয় কন্দরের অন্তরতম রহস্য জানেন বলে– এমনকি স্বীকারোক্তির সময় তিনি প্রশ্ন জিজ্ঞাসার অধিকারও ধরেন– তাকে থাকতে হয় অতি সাবধানে।
তাঁর প্রধান কৌতূহল রাসপুতিন কোন কোন কারণে কীভাবে হৃদয়ে ভগবানের প্রত্যাদেশ পেয়ে সমস্ত জীবনধারা পরিবর্তিত করে ‘নবজন্ম’ পেলেন। গ্রিক অর্থড চার্চ, ক্যাথলিক তথা অন্যান্য সম্প্রদায়ের ইতিহাসে এই নব-জীবন লাভ, গৃহী খ্রিস্টানের সন্ন্যাস-গ্রহণের জন্য এই কনভার্সনের উপ-ইতিহাস এক বিরাট অংশ গ্রহণ করে আছে। খ্রিস্ট সাধু মাত্রই এটি মনোযোগ সহকারে বারবার পাঠ করে তার থেকে প্রতিদিন নবীন উৎসাহ, তেজস্বী অনুপ্রেরণা সংগ্রহ করেন। মহারানির আপন যাজক ধর্ম-একাডেমির অধ্যক্ষরূপে এই উপ-ইতিহাসের অতিশয় অনুরক্ত ছিলেন, সেই পুস্তক তাঁরা শিষ্যমণ্ডলীর সম্মুখে সটীকা প্রতিদিন পড়িয়ে শোনাতেন এবং স্বভাবতই সেই পুস্তকের ভিন্ন ভিন্ন সাধুসন্তদের নিয়ে গভীর এবং সূক্ষ্ম আলোচনা করতেন। কিন্তু কোনও পাপাত্মা কীভাবে অকস্মাৎ দৈবাদেশ পেয়ে সর্বস্ব ত্যাগ করে ধর্মসংঘে প্রবেশ করে, কিংবা জনসেবায় আত্মনিয়োগ করে, অথবা পাণ্ডিত্য থাকলে সংঘে প্রবেশ করে নির্জনে নিভৃতে বাইবেল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থের এক নবীন টীকা নির্মাণে বাকি জীবন কাটিয়ে দেয় এ সম্বন্ধে তার কোনও ব্যক্তিগত অব্যবহিত অভিজ্ঞতা ছিল না, এবং অতি সহজেই অনুমান করা যায় যে, এরকম একটা আকস্মিক কনভার্সনের নায়ক যদি তার আপন কর্মস্থলে হঠাৎ এসে পৌঁছন তবে তিনি তৎক্ষণাৎ তার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনা করবেন। পূর্বেই বলেছি, রাসপুতিনের ভিতর কেমন যেন একটা বৈদ্যুতিক আকর্ষণ শক্তি ছিল, তার স্বাভাবিক অবস্থায়ও তিনি সাধারণ কেন, অসাধারণ জনকেও মন্ত্রমুগ্ধবৎ মোহাচ্ছন্ন করতে পারতেন। খ্রিস্ট ধর্মশাস্ত্রে তাঁর শিক্ষাদীক্ষা জ্ঞান-প্রজ্ঞা ছিল অতিশয় সীমিত, কিন্তু প্রভু যিশুর যে কটি সরল উপদেশ তিনি বহু কষ্টে কণ্ঠস্থ করতে পেরেছিলেন সেগুলো তিনি অতিশয় দৃঢ় বিশ্বাসের বীর্যশীল সরলতায় প্রকাশ করতে পারতেন। সঙ্গে সঙ্গে এ সত্যটিও নিবেদন করা উচিত যে, রাশায়, ধর্মশিক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে যে পণ্ডিতকুলমান্য সর্বোত্তম শাস্ত্রজ্ঞ অধ্যয়ন অধ্যাপনা করেন তিনি এই অশিক্ষিত হলধরসন্তানের কাছে আসবেন না শাস্ত্রের টীকাটিপ্পনী শ্রবণার্থে। তিনি আসবেন অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে। এস্থলেও প্রভু যিশুর সঙ্গে রাসপুতিনের সাদৃশ্য আছে। ইসরায়েলের স্মার্ত পণ্ডিতরা যখন প্রভু যিশুর সঙ্গে তর্কযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত তখন তিনি যেন তাচ্ছিল্যভরে বলেছিলেন আমি শাস্ত্রকে কার্যে পরিপূর্ণভাবে দেখাব।
