পরবর্তী যুগে ফিলম বেরুল, তার পর লন্ডনের উকিল তার বক্তব্য বললেন, এবং ‘আনন্দবাজার’ বিদেশ থেকে যে সংবাদ পেয়েছেন, তাই প্রকাশ করেছেন। এদের ভিতর পরস্পরবিরোধ তো রয়েইছে, কিন্তু আমার পক্ষ থেকে এ-স্থলে আসল বক্তব্য এই যে, বদানফ বলেছিলেন, সম্পূর্ণ না হোক, অনেকখানি ভিন্ন কাহিনী। আমি আদৌ বলতে চাইনে, তার বিবরণী, জবানি বা ভার্সন– যাই বলুন– সেইটেই নির্ভুল আপ্তবাক্য; বস্তুত তিনি নিজেই আমাকে বারবার বলেছিলেন, ‘মাই বয়! সেন্ট পেটেরসবুর্গে তখন এত হাজারও রকমের গুজব নিত্য নিত্য ডিউক সম্প্রদায় থেকে আস্তাবলের ছোকরাটা পর্যন্ত গরমাগরম এ-মুখ থেকে ও-মুখ হয়ে রাশার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে যে আমারটাই যে অভ্রান্ত সেই-বা বলি কোন সাহসে? তবে এটা সত্য আমার জীবনের সর্বপ্রধান কাজ “টেস্ট ক্রিটিসিজ্ম্” তখনও ছিল, এখনও আছে অর্থাৎ কোনও পুস্তকের পেলুম তিনখানি পাণ্ডুলিপি, তাতে একাধিক জায়গায় লেখক বলেছেন পরস্পর-বিরোধী তিনরকম কথা। আমার কাজ, যাচাই করে সত্য নিরূপণ করা, কিংবা সত্যের যতদূর কাছে যাওয়া যায় তারই চেষ্টা দেওয়া। অতএব, বুঝতেই পারছ, রাসপুতিন সম্বন্ধে গুজবগুলো আমি সরলচিত্তে গোগ্রাসে গিলিনি, আমার বুদ্ধিবিবেচনা প্রয়োগ করে যেটা সর্বাপেক্ষা সত্যের নিকটতম সেইটেই বলছি।’
অধ্যাপক রাসপুতিনের প্রথম জীবনাংশ সংক্ষেপে সারেন। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে এই চাষি পরিবারের ছেলে রাসপুতিনের জন্য সাইবেরিয়াতে। ‘রাসপুতিন’ তাঁর আসল নাম নয়– সেটা পরে অন্য লোকে তাঁর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বিশেষ করে কামাদি ব্যাপারে জানতে পেরে তাঁর ওপর চাপায়। লেখাপড়ার চেষ্টা তিনি ছেলেবেলায় কিছুটা দিয়েছিলেন সত্য, কিন্তু সেদিকে ছিলেন, ক্লাসের মামুলি চাষার ছেলেরও অনেক নিকৃষ্ট। এরপর তিনি তাঁর সমাজের দ্রঘরেই বিয়ে করেন– আর পাঁচটা ছেলের মতো। কিন্তু তার কিছুকাল পরেই হঠাৎ তাঁর ঝোঁক গেল ধর্মের দিকে, কিন্তু প্রচলিতার্থে আমরা ধর্মাচরণ বলতে যা বুঝি সেদিকে নয়। হিন্দুধর্মে যে-রকম একাধিক মতবাদ, শাখা-প্রশাখা– রুশের প্রচলিত (অর্থডক্স) সনাতন খ্রিস্টধর্মেও তাই। তারই একটার দিকে আকৃষ্ট হলেন গ্রেগরি (রাসপুতিন)। এস্থলে উল্লেখ প্রয়োজন বলে মনে করি, অধ্যাপক বগদানফ ছিলেন অতিশয় ‘গোঁড়া’–আমি সজ্ঞানে শব্দটি ব্যবহার করছি– রাশার সরকারি ধর্ম গ্রিক অর্থডক্স চার্চে বিশ্বাসী এবং আচারনিষ্ঠ খ্রিস্টান। শান্তিনিকেতনে তাঁর কামরায় (তখনকার দিনের অতিথিশালা, এবং বোধ হয় দর্শন-ভবন) দেয়ালে ছিল ইকন এবং তার নিচে অষ্টপ্রহর জ্বলত মঙ্গলপ্রদীপ এবং তারই নিচে তিনি অহরহ দাঁড়িয়ে স্বদেহে আঙুল দিয়ে ক্রশচিহ্ন অঙ্কিত করতে করতে–ঠিক আমাদের বুড়িদের মতো বিড়বিড় করে দ্রুতগতিতে মন্ত্রোচ্চারণ করতেন। বলা বাহুল্য রাসপুতিন যে খলিসতি (Khlisti) সম্প্রদায়ে প্রবেশ করলেন সেটাকে অধ্যাপক অপছন্দ করতেন। এ সম্প্রদায় উন্মত্ত নৃত্য, সঙ্গীত (এবং লোকে বলে যৌনাভিচার) ইত্যাদির মাধ্যমে পরমাত্মাকে মানবাত্মায় অবতীর্ণ করিয়ে স্বয়ং পরমাত্মায় পরিবর্তিত হওয়ার চেষ্টা করে। এ মার্গ বিশ্বসংসারে কিছু আজগুবি নতুন চিজ নয়। তবে এরা বলতে কসুর করতেন না যে, স্ত্রী-পুরুষের যৌনসম্পর্ক সম্বন্ধে এঁরা উদাসীন, অর্থাৎ এ বাবদে কে কী করে সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। রাসপুতিন এটাকে নিয়ে গেলেন তার চরমে। তিনি প্রচার করতে লাগলেন, ‘পাপ না করলে ভগবানের ক্ষমা পাবে কী করে? অতএব পাপ করো!’ এছাড়া তাঁর আরেকটি বক্তব্য ছিল, তিনি পরমাত্মার অংশাবতার, এবং তার সঙ্গে দেহে মনে আত্মায় আত্মায় যে কেউ সম্মিলিত হবে তারই চরম মোক্ষ তদ্দণ্ডেই। তার শিষ্যাগণের সঙ্গে তার সেই সম্মিলিত হওয়াটা কোন পদ্ধতিতে হত সেটা বলতে শ্লীলতায় বাধে, এবং একথা প্রায় সর্বাদিসম্মত যে তিনি তার শিষ্য-শিষ্যাগণকে নিয়ে একই কামরায় যেসব ‘সম্মিলন’ ঘটাতেন সেটা শুধু তিনি নিজেতেই সীমাবদ্ধ রাখতেন না, শিষ্য-শিষ্যাগণ নিজেদের মধ্যেও সম্মিলিত হতেন। ইংরেজিতে একেই ‘অর্জি’ ‘সেটারনেলিয়া’ ইত্যাদি বলে থাকে।
এটা সত্য, রাসপুতিনের কথা আমিই উত্থাপন করেছিলুম এবং অধ্যাপকও রাসপুতিন সম্বন্ধে তাঁর যা জানা ছিল সেটি সবিস্তর বলেছিলেন, কিন্তু তিনি রাসপুতিনের ধর্মসম্প্রদায় সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তার পূর্ণ বক্তব্যের প্রায় অর্ধাংশ ব্যয় করেন ওই সম্প্রদায় নিয়ে, এবং বিশ্বের অন্যান্য ধর্মে কোথায় কোথায় এ প্রকারের অর্জি স্বীকৃত এবং কার্যে পরিণত হয়েছে তাই নিয়ে। এ বাবদে তার শেষ বক্তব্য আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে; ধর্মের নামে এ ধরনের অনাচার কেন যুগে যুগে হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, কিংবা গোপনে গোপনে বিশেষ কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে প্রাচীন ধারাটি অক্ষুণ্ণ রাখে, এ তত্ত্বটি সাতিশয় গুরুত্ব ধারণ করে এবং এর অধ্যয়ন প্রচলিত ভিন্ন ভিন্ন ধর্মশাস্ত্রীয় পুস্তক অধ্যয়ন করে হয় না, এর জন্য প্রথমত প্রয়োজন নৃতত্ত্ব এবং পরে সমাজতত্ত্বের গভীর অধ্যয়ন (এর পূর্বে Anthropology ও Sociology এ দুটো শব্দ আমি কখনও শুনিইনি।)
