মপারা রিপোর্ট দিতে গিয়ে আমায় বলেছিল, ‘গাঁধীজি অনেকক্ষণ ধরে এনড্রুজ সম্বন্ধে বলেছিলেন, in a very touching manner। আর তার পর মহাত্মাজির সামনে পড়তে লাগল, টাকা, পুরো মনিব্যাগ, গয়না, রিস্টওয়াচ, আংটি, কত কী! যেন বানের জলে ভেসে আসছে দুনিয়ার কুল্লে মূল্যবান জিনিস। অনেকে এমনই যথাসর্বস্ব দিয়ে ফেলেছিলেন যে, বোম্বায়ে ফেরার জন্য টিকিট কাটার পয়সা পর্যন্ত তাদের কাছে অবশিষ্ট ছিল না। কিন্তু জানেন। তো, রেলও এখন আর পুরোপুরি ইংরেজের নয়। ভিলেপার্লে থেকে চার্চ গেট স্টেশন– সবাই জানে, কেন এদের টিকিট নেই।’
ফান্ডের টাকা যখন জমে উঠছে, তখন কে একজন বললে, ‘মহাত্মাজি, এখন এসব কেন? স্বরাজ পাওয়ার পর এসব কাজ তো রাতারাতি হয়ে যাবে।’
আজ সত্যই আমার হাসিকান্নায় মেশানো চোখের জল নেমে আসে– এই ব্যক্তিটির ওই মন্তব্যটির স্মরণে। তারই মতো আমরা সবাই তখন ভাবতুম, ইংরেজই সর্ব নষ্টের মূল। বিহারে ভূমিকম্প হলে ইংরেজই দায়ী, মেদিনীপুরে সাগর জাগলে ওটা ওই ইংরেজেরই দুষ্কর্ম! ইংরেজকে খেদিয়ে দিয়ে স্বাধীন হওয়া মাত্রই–
When we shall have attained liberty, all those will be mere trifles!
গাঁধীজি সঙ্গে সঙ্গে মোক্ষম গরম কড়া গলায় জবাব দেন, ‘But Tagore did not wait to be born till India attained her liberty.’
পরাধীন ভারতে যদি কবি জন্ম নেন, তবে তাঁর সখার স্মৃতিরক্ষার ভার পরাধীন ভারতের স্কন্ধেই।
তাই বলছিলুম, হাসি পায় কান্নাও পায়– তখন আমরা কী naif (প্রায় ‘ন্যাকার’ মতো)-ই না ছিলুম, যে বিশ্বাস করতুম– স্বরাজ পাওয়ার পরই ‘পাঁচ আঙুল ঘিয়ে’ আর ‘ডেগ-এর ভিতর গর্দান ঢুকিয়ে ভোজন’!
তাই কি রবীন্দ্রনাথ সাবধানবাণী বলেছিলেন, (উদ্ধতিতে ভুল থাকলে ক্ষমা চাইছি) ‘একদিন (স্বরাজ লাভের পর) যেন না বলতে হয়, ইংরেজই ছিল ভালো!’
কিন্তু কোথায় গেল সেই ‘এনড্রুজ ফান্ড’ যার মোটা টাকাটা তুলেছিলেন গাঁধীজি?
তা সেটা যেখানে যাক, যাক! দুঃখ এই সেই চটিবইয়ে এবং অন্যত্র ‘এনড্রুজ ফান্ডের’ কথা উঠলে কেউ আর গাঁধীকে স্মরণ করে না, তিনি যে সেই সুদূর বোম্বায়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিয়ে ফান্ডের গোড়াপত্তন করেছিলেন সেটা সবাই ভুলে গেছে!!
৫/২/৬৬
———- ১. গুরুচণ্ডালী নিয়ে আলোচনা একাধিক স্থলে দেখেছি। চলতি ভাষা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে এটাকে অমার্জনীয় অপরাধের অনুশাসনরূপে সম্মান করা হত– যদিও যে দ্বিজেন্দ্রনাথকে কবি রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষায় সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞরূপে সশ্রদ্ধ সম্মান জানাতেন, তিনি স্বয়ং সে অনুশাসন তাঁর কঠিনতম সংস্কৃত শব্দে পরিপূর্ণ বাংলা দর্শগ্রন্থে পদে পদে লঙ্ঘন করতেন, এবং সকলকেই সে উপদেশ দিতেন। চলতিভাষা চালু হওয়ার পর, পরলোকগমনের মাত্র কয়েক বৎসর পূর্বে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও লেখেন, গুরুচণ্ডালী এখন আর অপরাধ নয় (বাংলা-অলঙ্কারের পিনাল-কোড থেকে গুরুচণ্ডালী সরিয়ে দেওয়া হল– ধরনের অভিব্যক্তি)। অধীন দ্বিজেন্দ্রনাথের আদেশ বাল্যাবস্থা থেকেই মেনে নিয়েছে, যদ্যপি সে সদাই ‘লড়াই শুরু হল’ এবং ‘যুদ্ধ আরম্ভ হল’ তথা ‘মোকদ্দমা শুরু হল’ এবং তর্কবিতর্ক আরম্ভ হল এ’দুয়ে পার্থক্য মেনে চলেছে।
রাসপুতিন
এক-একটা দুঃখ মানুষ আমৃত্যু বয়ে চলে। আমরা নিজের কথা যদি বলার অনুমতি দেন, তবে নিবেদন করি, অধ্যাপক বদানফের আমাকে বলা তাঁর নিজের জীবনের কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আমি যে কেন তখনই লিখে রাখিনি সেই নিয়ে আমার শোক, এ-শোক আমার কখনও যাবে না। তারই একটি ১৯১৭-র কম্যুনিস্ট বিপ্লব। তিনি অকুস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং সমস্ত ঘটনাটি বর্ণনা করতে তাঁর লেগেছিল পুরো ন টি ঘণ্টা। শান্তিনিকেতনে আশ্রমের ইস্কুলের শোবার ঘণ্টা পড়ে রাত নটার সময়; আমি কলেজে পড়তুম বলে অধ্যাপকের ঘরে ওই সময়ে যেতে কোনও বাধা ছিল না। পরপর তিন রাত্রি ধরে রাত বারোটা-একটা অবধি তিনি আমাকে সে ইতিহাস বলে যান। অবশ্য অনেকেই বলতে পারেন, ওই যুগপরিবর্তনকারী আন্দোলন সম্বন্ধে বিস্তর প্রামাণিক পুস্তক লেখা হয়ে গিয়েছে এবং অধ্যাপক বদানফের পাঠটা খোয়া গিয়ে থাকলে এমন কীই-বা ক্ষতি। হয়তো সেটা সত্য, কিন্তু ওই বিষয়ে আমি যে কটি সামান্য বই পড়েছি তার সব কটাই বড়ই পাণ্ডিত্যপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক। বদানফ তার কাহিনী বলেছিলেন একটি ষোল বছরের ছোকরাকে ঘটনার মাত্র চার-পাঁচ বৎসর পরে এবং সেটি তিনি তাই করেছিলেন সেই অনুযায়ী রসময়, অর্থাৎ সাহিত্যরসে পরিপূর্ণ। এস্থলে বলে রাখা প্রয়োজন মনে করি, অধ্যাপকের বর্ণনভঙ্গিটি ছিল অসাধারণ, তাই পরবর্তী যুগে তার ইরান ও আফগানিস্তান (এ দুটি দেশে তিনি দীর্ঘকাল বাস করেন) সম্বন্ধে লিখিত গবেষণামূলক পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধরাজি পণ্ডিতমণ্ডলীতে সাহিত্যিক খ্যাতিও পায়। মাতৃভাষা রাশানে তিনি লিখেছেন কমই– তাঁর পাণ্ডিত্যপ্রকাশ-যুগে রাশাতে এ ধরনের গবেষণার কোনওই মূল্য ছিল না বলে সেগুলো সেখানে ছাপানোই ছিল অসম্ভব। তিনি প্রধানত লেখেন ফরাসি, ইংরেজি ও ফার্সির মাধ্যমে। এবং সবচেয়ে বেশি সম্মান পান ফার্সি পণ্ডিতজন মধ্যে।(১)
তিনি যে দ্বিতীয় কাহিনী বলেন, সেটি রাসপুতিন সম্বন্ধে। প্রথমটির তুলনায় এটি অনেক হ্রস্ব। রাসপুতিনকে নিহত করা হয়, পুরনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর, নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বর ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। এর প্রায় কুড়ি বৎসর পর রাসপুতিনকে নিয়ে আমেরিকায় একটি ফিলম্ তৈরি হয় (এবং আমার যতদূর মনে পড়ে লায়োনেল বেরিয়োর রাসপুতিনের অংশ কৃতিত্বের সঙ্গে অভিনয় করেন) এবং ওই সময় রাসপুতিন-হন্তা রাশার শেষ জারের নিকটাত্মীয় গ্র্যান্ড ডিউক ইউসুপ (আরবি হিব্রুতে ইউসুফ, ইংরেজিতে জোসেফ) ইয়োরোপে। ১৯১৭-র রুশ বিপ্লবের মধ্যে তিনি ও তার স্ত্রী সেই সব ভাগ্যবানদের দু জনা, যারা প্রাণ নিয়ে রাশা থেকে পালাতে সক্ষম হন। তিনি লন্ডন আদালতে মোকদ্দমা করেন ফিনির্মাতাদের (বোধ হয় MGM) বিরুদ্ধে যে, তারা যে ফিমের ইঙ্গিত দিয়েছেন, রাসপুতিন তার অর্থাৎ ইউসুপফের স্ত্রীকে পর্যন্ত তাঁর কামানলের দিকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি মোকদ্দমাটি হেরে যান বটে, কিন্তু ওই মোকদ্দমাটি তখন এমনই cause celebre কজ্ব সেহ্রে রূপে যেমন আমাদের ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মোকদ্দমা প্রখ্যাতি লাভ করে যে তার অল্প দু-এক বৎসর পর ওই মোকদ্দমায় প্রধান অংশগ্রহণকারী একজন উকিল মোকদ্দমাটি সম্বন্ধে একটি প্রামাণিক এবং আমি বলব– সাহিত্যিক উচ্চপর্যায়ের প্রবন্ধ লেখেন। তিনি যদিও ইউসুপফের বিরুদ্ধ পক্ষের উকিল ছিলেন, তবু আদালতে ইউসুফ দম্পতির খানদানি সৌম্য আচরণের অকৃপণ প্রশংসা করেন। তার পর হয়তো আরো অনেক কিছু ঘটেছিল। কিন্তু তার খবর আমার কাছে পৌঁছয়নি। হঠাৎ গত মাসের ‘আনন্দবাজারে’র এক ইস্যুতে দেখি, ইউসুপফ ফের মোকদ্দমা করেছেন– এবার কিন্তু আমেরিকায়, কলাম্বিয়া বেতার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাসপুতিন ও তাঁর জীবন নিয়ে নাট্যপ্রচার করার জন্য এবং আবার মোকদ্দমা হেরেছেন। সেই সুবাদে আমার মনটা চলে গেল ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে, যখন অধ্যাপক বদান রাসপুতিন-কাহিনী আমাকে ঘণ্টা তিনেক ধরে শোনান।
