আমি বললুম, ‘এটা তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, গাঁধীজি যে সময়টা আশ্রমে কাটান, ঠিক সেই সময়ে রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীতই পাবে পয়লা নম্বর–বা ফার্স্ট প্রেফারেন্স, তার পর নিশ্চয়ই স্বদেশী গান (এখন যাকে গাল-ভরা নামে ডাকা হয় দেশাত্মমূলক সঙ্গীত), তার পর মন্দিরে উপাসনার সময় যে কটি ব্রহ্মসঙ্গীত গাওয়া হয়। এর পরও আছে– কিন্তু অদ্দূর আমার এলেম যায় না, যেমন মনে করো গুরুদেব তার আপন পছন্দের যে-সব গান বাছাই করে তাকে শুনিয়েছেন তার হদিস পাব কোথায়! সবাই একবাক্যে আমার বক্তব্য স্বীকার করে বললে, ‘এই তিন দফেতে যেসব গান পড়ে তারই সব কটা এত অল্প সময়ে কোরাসে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। অতএব এই নিয়েই উপস্থিত সন্তুষ্ট থাকা যাক।’ আমি তখন স্কেল, টি-স্কোয়ার-সেট-স্কোয়ারসহ– কথার কথা কইছি– লেগে গেলুম জরিপ করতে, মহাত্মাজি যে সময়টায় শান্তিনিকেতনে ছিলেন ঠিক সেই সময়ে গুরুদেব কোন কোন গান রচেছিলেন (এ-স্থলে একটি ফরিয়াদ জানিয়ে রাখি : যাঁরাই গুরুদেব নিয়ে কোনও কাজ করতে চান, তাঁরাই চান, গুরুদেবের কবিতা যে রকম কালানুক্রমিক পাওয়া যায়, গানের বেলাও ঠিক সেইরকম হওয়া উচিত, বরঞ্চ বেশি উচিত। আমার এক মিত্র ‘রবীন্দ্রনাথের ধর্ম’ নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে এরই অভাবে দিশেহারা হয়ে এগুতে পারছেন না। তাঁর মূল প্রশ্ন, একটা বিশেষ সময়ের পর মোটামুটি ১৯১৮- রবীন্দ্রনাথ কি একেবারেই আর কোনও ধর্মসঙ্গীত রচনা করেননি? করে থাকলে কটি?)? অবশেষে কষ্টেসৃষ্টে মোটামুটি একটি ফিরিস্তি তৈরি হল। বেশিরভাগ গায়কই গুজরাতি; তাদের পছন্দের ধর্মসঙ্গীত– যেগুলো কারও না কারও ভালো করে জানা ছিল সেগুলোও কোরাসে লিখে নেওয়া হল। সক্কলেরই এক ভরসা গাঁধীজির সুরজ্ঞান খুব একটা টনটনে নয়, মহারাষ্ট্রের মতো গাঁধীর জন্মভূমি কাঠিওয়াড়-গুজরাতে গান-বাজনার প্রাচীন সর্বব্যাপী কোনও ঐতিহ্য নেই।
“শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর” শেষটায় এল। ওরা ধরে নিয়েছিল আমি সঙ্গে যাব। আমার এক কথা ‘ক্ষেপেছ! আমি না পারি গাইতে, না জানি বাজাতে। আমাদ্বারা কোনওপ্রকারের শোভাবর্ধনই হবে না– “শোভা” জিনিসটা গাঁধীজি আদৌ পছন্দ করেন না।’
***
মহাত্মাজি বললেন, ‘গাও!’
ওরা কাঁচুমাচু হয়ে বললে, ‘কী গান…?’
‘তোমাদের যা জানা আছে।’
এসব আমার শোনা কথা। তার ওপর ইতোমধ্যে দীর্ঘকাল কেটে গিয়েছে। সঠিক মনে নেই, প্রাক্তন দল সক্কলের পয়লাই রঙের টেক্কা, অর্থাৎ ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়’–মেরেছিল, না সেটাকে তাঁর আদেশের জন্য জীইয়ে রেখেছিল। কিন্তু মোদ্দা, তারা এক একটা গান শেষ হলে যখন থামে, তখন তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানান এবং আরও গাইবার ইঙ্গিত করেন। তারা দু-একবার চেষ্টা দিয়েছিল গাঁধীজির আপন পছন্দ জানাবার জন্য– ফলোদয় হয়নি।
সর্বশেষে মহাত্মাজি দু-একটি প্রশ্ন শুধোন। কেউ উত্তর দিতে পারেনি। মারাঠি মপারা বাড়ি ফিরে তো আমাকে এই মারে কি তেই মারে। আমি থাকলে নাকি চটপট উত্তর দিয়ে দিতুম। আমি বললুম, ‘এগুলোর উত্তর তো বচুভাইও জানে, তদুপরি সে ওয়াডওয়ান অর্থাৎ গাঁধীজির মতোই কাঠিওয়াড়ের লোক– গুজরাতি– না, খাস কাঠিওয়াড়িতেই উত্তর দিয়ে তার জান ঠাণ্ডা করে দিতে পারত! সে নাকি নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল। আমি হতুম না, কী করে জানলে! ওই সিংগির সামনে!’
কিন্তু এহ বাহ্য!
আসলে পূর্বোল্লিখিত প্রেস-কনফারেন্স্ গাঁধীজি ডাকিয়েছিলেন ওই দিনই, ওই সময়ই, ওই স্থলেই।
এখন আমি যা নিবেদন করব সেটা ওই সময়কার খবরের কাগজ নিয়ে চেক্ অপ্ করে সন্দেহ-পিচেশ তথা গবেষক-পাঠক ধরে ফেলতে পারবেন, আমি কী “দারুণ” “গুলমগীর”। অলঙ্কারিকার্থে কিন্তু আমি “যদু” পতি বা “রাখাল” রাজা হওয়ার মতো তাদের লক্ষাংশের একাংশ শক্তি ধরিনে বলে আমি নাচার; বেচারার পক্ষে শুল্ মারাই একমাত্র চারাহ।
যতদূর মনে পড়ে সেই এভেমন্ডে বিজড়িত ভারতের সর্বজাতের সাংবাদিকগণই সেদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনবার সৌভাগ্য লাভ করেছিল।
গান শেষ হলে মহাত্মাজি ওঁদের বললেন, ‘তোমাদের কী কী প্রশ্ন আছে, শুধোও!’ আর যায় কোথায়! দুনিয়ার যত রকম প্রশ্ন; আবার নতুন করে অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হবে কি, এই কি তার জন্য উৎকৃষ্টতম মোকা নয়–মিত্রপক্ষ চতুর্দিকে বেধড়ক মার খাচ্ছে, আরম্ভ হলে কী প্রকারে হবে, ট্যাক্স বন্ধ করে না নয়া কোনও টেকনিকে, ১৯২০-এর মতো ছাত্রদের ডাকা হবে কি না, ইত্যাদি ইত্যাদি।
গাঁধীজি তাঁর চিরাচরিত ধৈর্যসহ উত্তর দিয়ে যেতে লাগলেন–যদ্যপি আমার মনের ওপর তখনকার, অর্থাৎ পরের দিনের খবরের কাগজ পড়ার পর যে দাগ পড়েছিল সেটা বোধ হয় এই যে মোক্ষম প্রশ্নগুলো মহাত্মাজি এড়িয়ে গিয়েছিলেন। অবশ্য ওই সময়ে ভবিষ্যতে তাবৎ প্ল্যান ফাঁস করে দেওয়া যে সদ্বুদ্ধির কর্ম হত না, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
হঠাৎ মহাত্মাজি দু হাত তুলে প্রশ্নধারা নিরুদ্ধ করে বললেন, ‘আমি বেনে। বেনে কাউকে কোনও জিনিস মুফতে দেয় না। আমিও খয়রাৎ করার জন্য তোমাদের ডাকিনি। রবীন্দ্রসঙ্গীত তো শুনলে। এবার আমার কথা শোনো। পোয়েট গত হওয়ার পূর্বে (তখনও বোধ হয় এক বছর পূর্ণ হয়নি। আমাকে আদেশ করেন, আমাদের উভয়ের বন্ধু এনড্রুজের স্মৃতিরক্ষার্থে যা কর্তব্য তা যেন আমি আপন কাঁধে তুলে নিই। এখন দেখতে পারছি, আসন্ন ভবিষ্যৎ বড়ই অনিশ্চিত। তাই আজই আমি “এনড্রুজ মেমোরিয়াল ফান্ড”-এর জন্য অর্থসঞ্চয় আরম্ভ করলুম। দাও।’
