একদা শয়তানের রাজা, ধাড়ি শয়তান এক বাচ্চা শয়তানকে তালিম দিচ্ছিল, সৎপথগামীদের কোন কোন পদ্ধতিতে বিপথগামী করা যায়। ধাড়ি শয়তান অতিশয় ধুরন্ধর গুরু এবং বিশ্বপর্যটক (জাহানদিদা) রূপে অপর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সম্যক অবগত আছে, কোন প্রকারের মানুষ কোন পদ্ধতিতে চলে, কাকে সমঝে চলতে হয়, আর কেই-বা অগা আহাম্মুখ। ওই অনুচ্ছেদে এসে ধাড়ি বললে, ‘কিন্তু বৎস, হুঁশিয়ার! আচারনিষ্ঠ সাধুজনকে বরঞ্চ আমাদের পথে (মানবীয় ভাষায় কুপথে) নিয়ে যাবার চেষ্টা করো কিন্তু জ্ঞানী পণ্ডিতকে সমঝে-বুঝে চলো। ওরা বড়ই ভীষণ প্রাণী। সৃষ্টির আদিমকাল থেকে ওরাই আমাদের আদিম দুশমন।’
শাগরেদ ক্ষুদে শয়তান আশ্চর্য হয়ে বললে, ‘সে কী কথা! আচারনিষ্ঠ জন তো সদাই জপতপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে; আমার কথা ভাববার তার ফুরসৎ কই? আর পণ্ডিতদের কথা যখন বললেনই, প্রভু, তবে নিবেদন করি, আজকের দিনে তাদের অবস্থাটা একটু পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখুন। খেতে পায় না, পরতে পায় না আর আকাট-মূর্খ নিষ্কর্মারা বড় বড় চাকরির পদবি নিয়ে ওদের মাথায় ডাণ্ডা বোলায়। নিজে মেস্টার, ওদিকে ছেলেটাকে কলেজে পাঠাতে পারে না। এসব হাভাতেদের লোভ দেখিয়ে পথ ভোলাতে কতক্ষণ?’
ধেড়ে হেসে বলল, ‘খুব তো মুখে মুখে হাই-জাম্প লঙ-জাম্প দেখালি। কাজের বেলা কী হয় সেটা বোঝা যাবে পরশুদিন প্র্যাকটিকাল ক্লাসে।’
পরশু দিনের দিন প্র্যাকটিকাল। সে বড় কঠিন তালিম। তাবৎ হপ্তার এলেম হাতেনাতে বালাতে হয়। আমাদের ইস্টুডেন্টরা টুকলি-নকল করলে আমরা যেরকম সেটাকে শয়তানি’ নাম দিয়ে চোটপাট করি, এখানে তেমনি সাধু সরল পন্থায় কর্ম উদ্ধার করতে গেলে সেটাকে
সাধমী’ বলে গুরু কান মলে দেয় শিষ্যের।
ধেড়ে আদেশ দিলেন, ‘ওই যে হোথা একটি সরল সাধু জপ করছে ওকে আমাদের পথে নিয়ে আসার ডিমন্স্ট্রেশনটি করো তো, বৎস।’
বাচ্চা শয়তান প্রমাদ গুনল। এই সৌম্যদর্শন, কৃচ্ছসাধনজনিতপার তথাপি মধুরবদন সাধুকে ধর্মপথ থেকে বিচলিত করা কি তার মতো চ্যাংড়া শাগরেদের কর্ম! না জানি, আজ কপালে কী আছে!
ক্লাসে যে নোট দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সে দফে দফে স্মরণে আনল। তার পরে বিলজব, ইলিস, ডিয়াবলুস, শয়তান-উসশয়াতিন সবাইকে মনে মনে হাজার হাজার আদাব-বন্দেগি জানিয়ে গেল বেশ ধারণ করতে।
আহা! সে কী চিত্তহারিণী ভূষা! ধেড়ে, আণ্ডা, সব শয়তানকে লড়তে হয় ফিরিশতা অর্থাৎ দেবদূতের সঙ্গে– তাই ওঁদের চালচলন বেশভূষা তারা খুব ভালো করেই চেনে। এ-যুগে হিটলার পোলান্ড আক্রমণ করার পূর্বে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কিছু জর্মনদের পরিয়ে দেন পোলিশ সৈন্যের উর্দি। সেই উর্দি পরে তারা ‘আক্রমণ’ করে একটি জর্মন বেতারকেন্দ্র– পোলিশ-জর্মন সীমান্তে। সেই ‘আক্রমণে’র ও ‘আক্রমণে নিহত পোলিশ সৈন্যে’র ছবি হিটলার বিশ্বময় প্রকাশ করে সপ্রমাণ করেন যে পোলরাই প্রথম জর্মনি আক্রমণ করে!
হিটলার, হিমলার, আইষমান, হ্যোস এঁরা তো খাস শয়তানের তুলনায় শিশু।(২) ছদ্মবেশ ধারণে এনারা এমন আর কী ‘কৈশল’ দেখাবেন!
বাচ্চা শয়তান ধারণ করল দেবদূত– ফিরিশতার বেশ।
অঙ্গ থেকে বেরুচ্ছে দিব্যজ্যোতি এবং নন্দনকাননমন্দারসৌরভ; তার প্রতি পদক্ষেপে ঝংকৃত হচ্ছে অহ্মরাবিনিন্দিত সঙ্গীত-নিক্বণ– সঙ্গে এসেছে বসন্ত পবনের মৃদু হিল্লোল মলয়ানিল-বিলোলানন্দোল্লাস!
বাচ্চা শয়তান সম্মুখীন হল সাধুর। বললে, ‘তোমার তপশ্চর্যায় পরিতুষ্ট হয়ে আল্লা-তালা আমাকে পাঠিয়েছেন তোমাকে সশরীরে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য। তুমি আমার স্কন্ধে আরোহণ করো।’
বলা মাত্রই সে বুরাকের বেশ ধারণ করল।
বুরা অনেকটা পক্ষীরাজের মতো। সর্বাঙ্গ অত্যুত্তম অন্যায় এবং উভয় স্কন্ধে দুটি পক্ষ।(৩)
কিন্তু বাচ্চা শয়তান ক্লাসের থিয়োরেটিকাল সর্ব আদেশ মেনে চলতে চলতে ভয়ে বেপথু-কম্প্রমান, এই সামান্য ফাঁদটা সাধু না ধরে ফেলেন!
কিন্তু ধেড়ে শয়তান দূর থেকে নিশ্চিন্ত মনে সবকিছু দেখছে। সে বিলক্ষণ জানে, এসব আচারনিষ্ঠ জন বড় দম্ভী হয়। এরা ভাবে, সংসারের সর্বভোগ যখন ত্যাগ করেছি, তখন আর স্বর্গের সর্বসুখ আমি পাব না কেন?
এই দম্ভই তাদের সর্বনাশ আনে, সে তত্ত্ব শয়তান দেখেছে, যুগ যুগ ধরে।(৪)
তপস্বী সাধু ক্ষণমাত্র চিন্তা না করে চেপে বসলেন সেই ভেজাল বুরাকের স্কন্ধে।
তার পর কী হল, সেটা বর্ণনা করতে আমার বাধে। কারণ সেটাতে আছে বীভৎস রস। সংক্ষেপে বলি, সাধুর যখন জ্ঞান হল তখন তিনি বিষ্ঠাকুণ্ডে। বাচ্চা শয়তান একবার তাঁকে কাঁধে পেয়ে পেয়েছে বাগে। ক্লাসের নোট-মাফিক তাঁকে সর্বন্ত্রণা দিয়ে অজ্ঞানাবস্থায় ফেলে দিয়ে গেল পুরীষ-গহ্বরে।
সুশীল পাঠক। তুমি বলবে, আচারনিষ্ঠ সজ্জনের এই অসদগতি হল কেন? আমিও গল্পের এই পর্যায়ে কাহিনী-কীর্তনিয়া মৌলানাকে ওই একই প্রশ্ন শুধধাই।
তিনি শান্তকণ্ঠে বললেন, ‘পুচ্ছাংশ দেখিয়াই সর্বাঙ্গ বিচার করা যায় না। অবহিত চিত্তে সর্বাঙ্গসুন্দর কাহিনীটি প্রণিধান করহ।’
এবারে ধেড়ে শয়তান বাচ্চাকে বললে, ‘ওই যে দেখা যাচ্ছে দূরে এক আলিম। এবারে বাবাজি, সাবধান।’
বাচ্চা কিন্তু ভয় পাওয়ার মতো কিছুই দেখল না। পণ্ডিত বটে লোকটি, কিন্তু নামাজ রোজায় যে তাঁর মাঝে মাঝে ত্রুটি হয়ে যায়, সে তো জানা কথা। বইয়ের নেশায় তাঁর কাটে অষ্টপ্রহর। এটাকে বাগে আনতে আর কতক্ষণ?
