আমার একটি গল্প মনে পড়ল এবং সেটা সকলেরই কৌতূহল জাগাবে। কারণ কি হিন্দু, কি মুসলমান, কি ইহুদি, কি খ্রিস্টান সকলেই জানতে চায় মহাপ্রলয় (আরবিতে কিয়াম) কবে আসবে? সর্বধর্মের শাস্ত্রগ্রন্থেই তার কিছু কিছু ইঙ্গিত আছে, কিন্তু পাকাপাকি কোনও-কিছু জানার উপায় নেই। একদা নাকি খ্রিস্টানদের বিশ্বাস ছিল, খ্রিস্টজন্মের ১০০০ বৎসর পূর্ণ হলে মহাপ্রলয় আসবে। শুনতে পাই, অনেক লোকেই নাকি তার কিছুদিন পূর্বে সর্বস্ব বিক্রয় করে দানখয়রাতে উড়িয়ে দেয়।
১০০০ খ্রিস্টাব্দ পূর্ণ হওয়ার দিনে শেষটায় যখন মহাপ্রলয় হল না তখন এরা পস্তিয়ে ছিলেন কি না জানিনে, তবে ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হওয়া ভালো। এখন ১৯৬৬। যদি রটে যে, ২০০০-এ মহাপ্রলয় তবে এখন যারা যুবা এবং বালক তারা যেন ওই সময়টায় একটু ভেবেচিন্তে দান-খয়রাৎ করেন।
মহাপ্রলয় কবে আসবে, সে-সম্বন্ধে আরবদের ভিতর একটি কাহিনী প্রচলিত আছে।
আল্লা-পাক নাকি একদিন প্রধান ফিরিশতা (বাংলায় ফেরেস্তা লেখা হয়: অর্থ এঞ্জেল, দেবদূত) জিব্রাইলকে (ইংরেজিতে গেব্রিয়েল) ডেকে আদেশ দেবেন, যাও তো, মানুষের ছদ্মবেশ ধরে পৃথিবীতে। যে-কোনও একজন মানুষকে শুধোও, জিব্রাইল এই মুহূর্তে কোথায় আছেন? জিব্রাইল পৃথিবীতে নেমে একজন মর্তবাসীকে সেই প্রশ্ন শুধোলেন। লোকটা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এরকম বেফায়দা প্রশ্ন করে লাভটা তোমার কী? আমার এসব জিনিসে কোনও কৌতূহল নেই, তবে যখন নিতান্তই শুধোলে তবে দাঁড়াও, বলছি।’ লোকটি দুই লহমা চিন্তা করে বলল, ‘হুঁ, ঠিক বলতে পারব না– তবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, সে (আরবিতে ইংরেজির মতো he-র সম্মানার্থে কোনও ‘তিনি’ শব্দ নেই) এখন পৃথিবীতে। বেহেশতে নয়।’ জিব্রাইল স্বর্গে ফিরে আল্লাকে উত্তরটা জানালে তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে।’ তার পর কেটে যাবে আরও বহু সহস্র বৎসর। তার পর আবার আল্লা-পাক ওই একই প্রশ্ন একইভাবে শুধোবার জন্য জিব্রাইলকে পৃথিবীতে পাঠাবেন। এবারে যে মর্তবাসীকে শুধোনো হল, সে বিরক্ত হল আরও বেশি। বললে, ‘কী আশ্চর্য! এখনও মানুষ এরকম সম্পূর্ণ বাজে বেকার প্রশ্ন করে! হিসাব কষলে যে এরকম প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না তা নয়, তবে দেখো, এসব ব্যাপারে আমার কোনও উৎসাহ নেই। আচ্ছা…’ এক সেকেন্ড চিন্তা করে লোকটা বললে, ‘স্বর্গে তো নয়, স্পষ্ট বোঝা আছে…,’ ফের দু সেকেন্ড চিন্তা করে বললে, ‘পৃথিবীতেই যখন, দাঁড়াও, হ্যাঁ, কাছেপিঠেই কোথাও আমি চললুম।’ জিব্রাইল বেহেশতে ফিরে এসে আল্লাকে সবকিছু বয়ান করলেন। আল্লা বললেন, ‘ঠিক আছে।’ তার পর কেটে যাবে আরও কয়েক হাজার কিংবা কয়েক লক্ষ বৎসর। আবার জিব্রাইল সেই হুকুম নিয়ে ধরাভূমিতে আসবেন। এবার যাকে শুধালেন সে তো রীতিমতো চটে গেল—‘এসব বাজে বাজে প্রশ্ন… ইত্যাদি।’ জিব্রাইল বেশ কিছুটা কাকুতি-মিনতি করাতে সে নরম হয়ে বলল, ‘তা হলে দেখি! হুঃ, স্বর্গে নয়, পৃথিবীতে।’ তার পর আরেক সেকেন্ড চিন্তা করে বললে, ‘কাছে-পিঠে কোথাও।’ তার পর আরও দু সেকেন্ড চিন্তা করে তাজ্জব মেনে বলবে, ‘কী আশ্চর্য যে এরকম মস্করা করো। তুমিই তো জিব্রাইল– তবে শুধাচ্ছ কেন?’ এবার জিব্রাইল সব খবর দিলে আল্লা-পাক হুকুম দেবেন মহাপ্রলয়ের শিঙা বাজাতে।
কথিকাটির তাৎপর্য কী?
প্রথমত, মানুষ তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে করে এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছবে যে স্বর্গের খবর পর্যন্ত তার কাছে আর অজানা থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, কিন্তু, তার তাবৎ জ্ঞান-বিজ্ঞান বিদ্যাচর্চার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে সাংসারিক, বৈষয়িক, প্র্যাকটিকাল জিনিস নিয়ে।(১) ইহলোক ভিন্ন পরলোক, পাপপুণ্যের বিচার, সে স্বর্গে যাবে, না নরকে জ্বলে পুড়ে খাক হবে– এ সম্বন্ধে তার কোনও কৌতূহল থাকবে না, কারণ স্বয়ং জিব্রাইলকে হাতের কাছে পেয়েও সে এসবের কোনও অনুসন্ধান করল না। এমনকি সৃষ্টিকর্তা আল্লা–দীন দুনিয়ার মালিক। যাঁকে পাবার জন্য কোটি কোটি বৎসর ধরে শত শত কোটি মর্তের মানুষ স্বর্গের দেবদূত আমৃত্যু দেবদুর্লভ সাধনা করেছে, তার প্রতিও সে উদাসীন।
তৃতীয়ত, যেহেতু সে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব, তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন অতএব কল্পনা করা কঠিন নয় যে, সে তখন বিশ্বভুবন তার খেয়ালখুশি মর্জি-মাফিক নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টায় লেগে যাবে। ফলে হয়তো বেরুবে শত শত আইষমান কোটি কোটি ঈশ্বরসৃষ্ট জীবকে বিনাশ করতে।
***
ভরসা হচ্ছে, বিশ্ববিবর্তনে যদ্যপি সেই চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি অর্থাৎ মানুষ ক্রমেই সত্যসুন্দরের (অল-হক অল্-জমিল) সাধনার পথ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে, তবু এখনও বোধ হয় পরিপূর্ণ জড়বাদে পৌঁছতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব আছে। পক্ষান্তরে ইসলাম একথাও বলেন, কিয়ামৎ যে-কোনও মুহূর্তে আসতে পারে। তার অর্থ, মানুষ হয়তো হঠাৎ এক লফে জড়বাদে পৌঁছে যেতে পারে।
পয়গম্বর বলেছেন, “আল্লার থেকে মানুষকে দূরে নিয়ে যায় শয়তান।” সেই শয়তান জড়বাদের প্রতিভূ এবং প্রতীক। অতএব সত্য-জ্ঞানান্বেষীর প্রধান কর্তব্য জড়বাদ অর্থাৎ শয়তানের কীর্তিকলাপ কী প্রকারে বাহ্যজগতে স্বপ্রকাশ হয় সে-সম্বন্ধে সচেতন থাকা তথা শয়তান প্রলোভন নিয়ে উপস্থিত হলে আত্মহারা হয়ে জ্ঞানদৃষ্টি দ্বারা তার স্বরূপ চিনতে পারা। শুধুমাত্র আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে সরল জীবনযাপনই যথেষ্ট নয় : জ্ঞানানুসন্ধান নিত্যপ্রয়োজনীয় অবশ্যকর্তব্য। এই মর্মে আরেকটি কাহিনী আছে :–
