পূর্ববৎ দেবদূত বেশ ধারণ করে বাচ্চা শয়তান পণ্ডিতের সামনে এসে দাঁড়াল। পূর্ববৎ তাঁকে স্বর্গে নিয়ে যাবার প্রস্তাব জানাল।
পণ্ডিত তখন রকে বসে বদনা থেকে জল ঢেলে মুখ ধুচ্ছিলেন।
ভুললে চলবে না, ইনি পণ্ডিত। সশরীরে স্বর্গে যাওয়ার প্রস্তাব শুনেই তার চড়াকসে মনে পড়ে গেল ইতোপূর্বে কে কে আল্লার সমীপবর্তী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। মুসা (Moses), ঈসা (যিশু), হজরৎ পয়গম্বর– ব্যস্।
তাই পণ্ডিত উত্তমরূপেই জানতেন, তিনি এমন কিছু পুণ্যশীল মহাপুরুষ ‘প্যাকম্বর’ নন যে আল্লা তাঁকে স্বর্গে যাবার জন্য ডেকে পাঠাবেন।
‘বটে রে, ব্যাটা!’ মনে মনে বললেন পণ্ডিত। ‘মস্করা করার জায়গা পাও না! আজ তোমারই একদিন, আর আমারই একদিন।’
সুহাস্য-আস্যে মৌলবি বললেন, ‘কী আনন্দ, কী আনন্দ! স্বর্গে যাবার জন্য তো আমি হামেহাল তৈরি। কিন্তু, দ্র, এ যুগে বড় ভেজাল চলছে। কী করে জানব, তুমি সত্যই দেবদূত। শুনেছি, দেবদূতেরা মুআজিজা কেরামৎ (miracle) দেখাতে পারেন। তুমি কিছু একটা দেখাতে পারলেই আমি তোমার সঙ্গে যেতে প্রস্তুত।’
বাচ্চা শয়তান বলল, ‘আপনি কী মিরাকল দেখতে চান, বলুন।’ তার মনে বড় আনন্দ, অর্ধেক কেল্লা ফতেহ্ করে ফেলেছে!
পণ্ডিত বললেন, ‘শুনেছি, দেবদূত অনায়াসে ক্ষুদ্র, বৃহৎ, সর্ব আকার গ্রহণ করতে পারেন। তুমি পারো?’
‘নিশ্চয়!’
‘তা হলে তুমি ক্ষীণ কলেবর গ্রহণ করে আমার এই বদনার নালি দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারো?’
বাচ্চা শয়তান উল্লাসে মনে মনে নৃত্য করছে, পণ্ডিত এর চেয়ে অন্য কঠিন কর্ম করতে ইচ্ছা জানাননি বলে। তাকে তো অনায়াসে তিনি আরবিস্তানের বিরাট মরুভূমি, কিংবা ইউফ্রাতেস নদী, কিংবা আকাশের সূর্য বা দিবাভাগে পূর্ণচন্দ্র হতে বলতে পারতেন।
পাছে তিনি মত পরিবর্তন করে ফেলেন, তাই সে তন্মুহূর্তেই পণ্ডিতের বদনার নালির ভিতর দিয়ে ঢুকে পড়ল।
যেই না ঢোকা, পণ্ডিতের আর কোনও সন্দেহ রইল না, ব্যাটা বদমাশ। তিনি ভালো করেই জানেন, আল্লার আপন দূত একটা বদনাতে ঢুকতে যান না। তিনি বহুবিধ শাস্ত্র পড়েছেন, তাতে এমন মিরাকল, কেরামতের উল্লেখ নেই।
সঙ্গে সঙ্গে তিনি পাশের পিঁড়িটা বদনার উপর চেপে তার উপর আরও ভালো করে চেপে নিজে বসে পড়লেন এবং বদনার নালিতে ঢুকিয়ে দিলেন একটা খেজুর। বেশ মোলায়েম ফল; টায়ে টায়ে বদনায় সেঁটে যায়।
এবং চিৎকার :
‘গিন্নি, গিন্নি! নিয়ে এসো তাড়াতাড়ি উনুনটা। ব্যাটাকে আজ সেদ্ধ করে হালুয়া বানাব। ব্যাটা আমার সঙ্গে মস্করা করতে এসেছে! শা–,হা– জা,বা–। (৫)
হৈহৈ রৈরৈ কাণ্ড। বুড়ো শয়তান দূর থেকেই বুঝেছে ব্যাপারটা সঙিন।
সঙ্গে সঙ্গে পণ্ডিত-মৌলবির পায়ে এসে পড়ল।
বাচ্চাটাকে বাঁচাবার জন্য সন্ধি-আপস করতে চায়।
সন্ধির শর্ত হল, শয়তান এবং তস্য গোষ্ঠী ওই মৌলবি-পণ্ডিত গোষ্ঠীর কাউকে প্রলোভিত করতে পারবে না।
***
প্রথম গল্পের সঙ্গে এ গল্পের কী সম্পর্ক?
যতক্ষণ অবধি পণ্ডিত-মৌলবি-মৌলানা-রাব্বি-ফাদার-দস্তুর সুদ্ধমাত্র প্র্যাকটিকাল বিষয়ে মত্ত হবেন না, ততদিন মহাপ্রলয় আসবে না।
***
কিন্তু পাঠক, তোমার মস্তিষ্কে, হৃদয়ে যে প্রশ্ন আমারও তাই। কী দরকার সেই মহা-মহাপ্রলয় ঠেকিয়ে? যেখানে পৌঁছেছি, চাল নেই, তেল নেই, মাছ নেই—
২।১০।৬৫
———-
১. ইমাম গজালি মুসলিম জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেউ কেউ বলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী। তিনি একাধারে দার্শনিক, শাস্ত্রী ও সুফি (রহস্যবাদী ভক্ত) ছিলেন। আরব্যোপন্যাস যুগের বিখ্যাত বাগদাদ নগরীর বিশ্ববিদ্যালয় সে-যুগের মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোত্তম জ্ঞানকেন্দ্র ছিল। ইমাম গজালি তার রেক্টর (শেখ) ছিলেন। অধুনা তাঁর একখানা বইয়ে দেখি, তিনি মনস্তাপ করছেন যে, তাঁর কালের (মৃত্যু ১১১১ খ্রিস্টাব্দে) লোক শুধু প্র্যাকটিক্যাল বিদ্যা শেখে। আমি ভরসা পেলুম।
২. অনেকে মনে করেন এ অধম নাৎসি দলের নির্ভেজাল দুশমন। তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি, যুদ্ধের গোড়ার দিকে হিটলার যে ইংরেজকে বেধড়ক চড় কষায় সেটা এ অধমের চিত্তে সাতিশয় বিমলানন্দ দিয়েছিল। আমার মতে হিটলারের সবচেয়ে মারাত্মক ভুল হয়, তিনি ফ্রান্সের পতনের পর যখন ইংলভ আক্রমণ করলেন না। না-হয় তিনি নিষ্ফলকাম হতেন। তাতেই-বা কী! মহৎ কর্ম করতে গিয়ে নিষ্ফল হওয়া অপকর্মে (রুশ আক্রমণ) সফল হওয়ার চেয়ে শ্রেয়ঃ!
৩. মুসলমানি ও পার্সি রেস্তোরাঁতে নাতুন্নাসিক হিন্দু পাঠকও এই ছবি দেখে থাকবেন। পয়গম্বর হজরৎ মুহম্মদ সাহেব এই বুরাকে চড়েই সৃষ্টিকর্তা সন্নিধানে যান। বিরুদ্ধ পক্ষ বলেন, তিনি সশরীরে যাননি; তার রুহ, অর্থাৎ আত্মা গিয়েছিল। অর্থাৎ বুরাক ইত্যাদি রূপকার্থে নিতে হবে।
৪. কবি রবীন্দ্রনাথ কৃসাধনে দম্ভ দেখে সর্বত্যাগী ভৈরব-শঙ্করকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন
‘আমাকে চেনে না তব শ্মশানের বৈরাগ্যবিলাসী
দারিদ্রের উগ্র দর্পে খলখল ওঠে অট্টহাসি
দেখে মোর সাজ।’
সর্বত্যাগী শঙ্কর হিন্দুর উপাস্য। কিন্তু তাঁর সর্ব ত্যাগের অন্ধানুকরণ ও তৎসহ তাই নিয়ে দম্ভ, সেই ত্যাগের luxury, যেমন মূর্খ চেলারা করেন, কবি সেইটে এই কবিতায় বুঝিয়েছেন।
৫. পণ্ডিত মাত্রই কি ভারত, কি আরব সর্বত্র আমাদের আজকের দিনের বিচারে বড় অশ্লীল গালাগাল দেন। ‘তোমার সঙ্গে আলোচনা বন্ধ্যাগমন’ আমাকে একাধিক পণ্ডিত বলেছেন। আমি তখন শান্তিপুরে নব্যন্যায় শিক্ষার ‘বন্ধ্যাগমন’ করছি। দোষ আমারই, তাঁদের নয়। কাইরোতেও একই অবস্থা!
রবি-মোহন-এনড্রুজ
কয়েকদিন পূর্বে একখানা চটিবইয়ে রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মাজি ও এনড্রুজ সম্বন্ধে একটি বিবরণীতে দেখি আর সবই আছে, নেই শুধু একটি কথা :–এনড্রুজের পরলোকগমনের পর তার স্মৃতিরক্ষা সম্বন্ধে সচেতন হলেন কে, এবং সেই মহৎ চিন্তা মৃন্ময়রূপে দেবার জন্য সর্বপ্রথম উদ্যোগী হলেন কে, এবং এনড্রুজ ফান্ডের আজও সামান্য যেটুকু অবশিষ্ট আছে–যদি আদৌ থাকে তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাব কাকে?
