মিজোরা সরল বিশ্বাসে ভাবছে, আমার– তা সে কেন্দ্রীয় সরকারই হোক, আর আসাম সরকারই হোক– বিধর্মী (নাগারাও কড়া সুরে বলে, ‘যারা আমাদের সঙ্গে আমাদের গির্জায় গিয়ে উপাসনা করে না তারা আমাদের ঘৃণা করে।’ সেটা না হয় করা গেল, কিন্তু খেতেও হবে তাদের সঙ্গে এবং স্বর্গস্থ প্রভু জানেন, একমাত্র চারপাই ছাড়া সব চতুষ্পদই তারা খায়! সঙ্গে সঙ্গে পান করতে হবে শুকনো লাউয়ের পাত্রে ভর্তি ভাত পচিয়ে তৈরি লিটার লিটার বিয়ার! কোহিমার ছোকরা ইংরেজ শাসনকর্তা এ-তিনটির প্রথমটি করে পুণ্যসঞ্চয় করতেন, বাকি দুই বাবদেও তেনারা সমগোত্রীয়, এমনকি প্রয়োজন হলে village belle-কেও তারা নিরাশ করতেন না– কারণ ব্যাচেলার ভিন্ন অন্য কাউকে সেখানে সচরাচর পাঠানো হত না। এবং যেহেতু আমরা বিধর্মী তাই আমরা তাদের ন্যায্য পাওনা দিচ্ছি না। আমরা সরে গেলেই তাদের সর্ব বাসনা কামনা পূর্ণ হয়ে যাবে। মোস্ট প্রিমিটিভ জুম চাষ করে যে এবসার্ড জীবনমান উচ্চ পর্যায়ে তোলা যায় না সেটা বোঝাবে কে?
অবশ্য মিজোদের অসন্তোষের অন্যান্য কারণও আছে। শুধু একটা কারণ দেখালুম– অন্তত মার্কসিস্টরা খুশি হবেন– তাঁদের অনেকেরই মতো এইটেই একমাত্র কারণ। একমাত্র কারণই হোক আর প্রধানতম কারণই হোক, অর্থনৈতিক কারণটা সন্ধান নেওয়া সর্বক্ষেত্রেই বাঞ্ছনীয়। লেনিনের সমসাময়িক ভিয়েনার অর্থডক্স অর্থনীতি পণ্ডিত শুমপেটার এবং তাঁরই মতো কট্টর বার্লিনের জমবার্ট কেউই এই দৃষ্টিবিন্দুটি অবহেলা করেননি।
স্বীকার করে নিচ্ছি, আমার এ বিশ্লেষণ ভুল হতে পারে, কিন্তু তথ্যগুলো সঞ্চিত হয়েছে বিশ্বস্তজনের কাছ থেকে।(৪)
১৬/৪/৬৬
———
১. দক্ষিণ ভারতের ভরতনাট্যম নিয়ে যতখানি গবেষণা এই উত্তর ভারতেই হয়েছে, এই উত্তর ভারতের ঘনিষ্ঠতর মণিপুরি নৃত্য নিয়ে তার এক-দশমাংশও হয়নি। এ নৃত্য সত্যই রহস্যময়। মূল নৃত্য শান্ত ও লাস্যরসাশ্রিত কিন্তু প্রারম্ভিক অবতরণ নৃত্য (এর টেকনিকাল নামটি আমি ভুলে গিয়েছি) অত্যন্ত প্রাণবন্ত, দুর্দান্ত তাণ্ডব নৃত্যের কাছাকাছি এবং পার্শ্ববর্তী অনুন্নত অঞ্চলের সগ্রাম-নৃত্যের সঙ্গে সাদৃশ্য ধরে। হয়তো বৈষ্ণব হয়ে যাওয়ার পরও মণিপুরিরা তাদের প্রাচীন ঐতিহ্যগত পার্বত্য নৃত্য ত্যাগ করতে চায়নি বলে অর দ্য সুর’ রূপে প্রস্তাবন রূপে সেটিকে রক্ষা করেছে।
২. এ যুগে মণিপুরে যে রকম হঠাৎ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে হিন্দুধর্ম প্রচারিত হয়, সেরকম উদাহরণ কি অদূর অতীত কি বর্তমানে আমি অন্য কোথাও পাইনি। মালকানা রাজপুতদের অল্পসংখ্যক লোকই বিংশ শতাব্দীতে আর্য-সমাজে’ দীক্ষা নেয়। শিলং শহর প্রায় শত বৎসর ধরে হিন্দুপ্রধান। সেখানে ব্রাহ্ম ও ইসলাম মিশন স্থাপিত হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টান মিশনারিই সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন করেন। এখনো আসামের সর্ব পার্বত্য অঞ্চলে খ্রিস্টান মিশনারিই অগ্রগামী এবং কোনও কোনও লাগোয়া সমতল ভূমিতেও।
৩. এক সিলেটি মুসলমান ডাক্তার বহু বৎসর আইজল-লুঙলেতে কাটিয়ে এসে আমায় বলেন, মিজোরা দু-দিন তিন-দিনের পাহাড়ের চড়াই-ওত্রাই পথ পেরিয়ে লুঙলে আসত কেরোসিন কিনতে। সে কেরোসিন আসত শিলচর থেকে, বেশিরভাগ পথ মানুষের কাঁধে, বাঁকে করে। একবার একজন বাহকের কলেরা হয় নির্জন পথিমধ্যে। বাঁশের স্ট্রেচার বানিয়ে অন্য চারজন বেহারা রোগীকে নিয়ে লুঙলে পানে রওনা দেয়– দশ টিন কেরোসিন পায়ে চলার পথের উপর রেখে দিয়ে! গণ্ডায় গণ্ডায় কেরোসিনকামী খ্রিস্টান অখ্রিস্টান চলেছে লুঙলের দিকে, কিন্তু তাদের ধর্মবোধ এমনই প্রবল যে তারা কেরোসিনের দিকে ফিরেও তাকালে না। বেহারারা লুঙলে থেকে ফিরে এসে সমুচা সব কটা টিন যথাস্থানে পায় তারাও জানত, লোপাট হবে না, তাই লুকিয়ে রাখার প্রয়োজনও বোধ করেনি। সেই মিজোরাই এখন লুঙলেতে লুটতরাজ করল!
৪. (ক) মিজো প্রবন্ধটি লিখে ‘দেশ’ দপ্তরে পাঠিয়ে দেবার পর দুটি তাৎপর্যপূর্ণ খবর বেরিয়েছে। প্রথমটিতে মাদ্রাজের প্রাক্তন গভর্নর শ্রীযুক্ত বিষ্ণুরাম মেধী বলেছেন—‘যাতে করে মাল চলাচল জাম্ না হয়ে যায় (“transport bottleneck”) মিজো, নাগা এবং অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলের সঙ্গে রেললাইন বসানো উচিত’। তিনি General council meeting of the All-India Railwaymen’s Federation-এতে এ বিবৃতিটি দেন ও ২৭-৩-৬৬-র কাগজে এটি বেরোয়। মিজোনাগারা যে রেলের অভাবে বাদবাকি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন, সে-কথা আমি প্রবন্ধে নিবেদন করেছি।
(খ) পার্বত্য-অঞ্চল সম্বন্ধে ব্যাপক রিপোর্ট দেবার জন্য যে পাটকর কমিশন নিযুক্ত হয়েছিল তার রিপোর্টের কয়েকটি প্রধান সুপারিশ ৩১ মার্চ বেরিয়েছে। সম্পূর্ণ রিপোর্ট না পড়ে কিছু বলার উপায় নেই, কিন্তু যেটুকু বেরিয়েছে তার থেকে মনে হল আধুনিক ঘটনার আলোকে রিপোর্টটি আউট অব ডেট– তামাদি হলেও বর্তমানের প্রশ্নবাণ সইতে পারবে না।
মূর্খের উপাসনা অপেক্ষা পণ্ডিতের নিদ্রা শ্রেয়ঃ
আমাকে অনেকেই প্রশ্ন শুধান, হিন্দুধর্ম, হিন্দুশাস্ত্র নিয়ে যে অফুরন্ত কাহিনী কিংবদন্তি আছে– যেরকম যমদূত একবার ভুল করে মৃত্যুর নির্ধারিত দিবসের পূর্বে এক নায়েবকে নরকে নিয়ে যাওয়ার ফলে কীরকম তুমুলকাণ্ড ঘটেছিল– মুসলমানদের ভিতরও তেমনি আছে কি না। আছে, কিন্তু সেগুলো প্রধানত লোকশিক্ষার জন্য এবং অনেকগুলোতেই প্রচুর হাস্যরসও আছে। এসব গল্পের প্রাচুর্য ইরানেই বেশি, এবং তুর্কিতে খুবই কম। তুর্কিরা নাকি বড্ড বেশি সিরিয়াস। অতএব গোঁড়া। অতএব রসকষহীন।
