কিন্তু নাগা-লুসাইদের মধ্যে কী হল?
যারা লেখাপড়ায় সামান্য ভালো– এ কথা মানতেই হবে, খ্রিস্টান মিশনারিরা তাঁদের সামর্থ্যে যতখানি কুলোয় ততখানি অর্থ শিক্ষার জন্য পাহাড়ে পাহাড়ে ঢেলে দিয়েছিলেন এবং একদা সেখানে সাক্ষরের সংখ্যা বাংলার তুলনায় ছিল বেশি তারা কোহিমা-আইজলে পড়তে এল, পরে শিলঙে এবং কেউ কেউ কলকাতা পর্যন্ত। এবং যারা আপন গ্রাম থেকে বেরুল না; তারা, অন্তত পাদ্রি সায়েবের বাড়ি, তাঁর তৈজসপত্র দেখেছে। শিলঙে, যে দু-চারজন চাকরি নিয়ে থেকে গেল তাদের কথা আলাদা, কিন্তু যারা বাড়ির টানে গায়ে ফিরে গেল, এবং যারা গায়েই ছিল এদের অনেকেই কি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নততর করে পাদ্রি সায়েবের মানের কাছে আসতে চাইল না?
এ তো আমাদের চোখের সামনে নিত্য নিত্য ঘটছে। আমাদেরই গ্রামের ছেলে শহরে এসে আর গ্রামে ফিরে গিয়ে নিম্নমানের জীবনযাপন করতে চায় না। বস্তুত ফ্রান্স, জর্মনি সর্বত্রই ক্রন্দনরব উঠছে, গ্রামের বুদ্ধিমান কর্মঠ ছেলে মাত্রই আর গ্রামে ফিরে যেতে চান না। পড়ে থাকে নিষ্কর্মাগুলো। দি ভিলেজেস আর বিইং ড্রেনড অব দেয়ার ব্রেনস– শহর ঝেঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে গ্রামের প্রতিভাকে। বিশ্বব্যাপী এই যে একতরফা ভাঁটা, এরই ফলে যে গ্রামোন্নয়ন করা যাচ্ছে না এ সম্বন্ধে ‘উনেস্কো’ বহুকাল ধরে সচেতন, বিস্তর গবেষণা করেছে, দাওয়াই খুঁজে পাচ্ছে না।
কিন্তু এই সমস্যা নিয়ে আমাদের মধ্যে মারামারি খুনোখুনি হয় না, কারণ, যে গ্রামের ছেলে শহরে থাকতে চায় তার জন্য আশেপাশে বিস্তর ছোট-বড় শহর আছে– বোলপুর, সিউড়ি, বর্ধমান, শেষটায় যদি তাতেও প্রাণ না ভরে, তবে কলকাতা। রেলের চাকরি করে ভাগলপুর, পাটনা হয়ে কত কী?
কিন্তু মিজো-লুসাইবাসী যাবে কোথায়? আইজল, লুঙলে তাদের কী দিতে পারে? তার পর শতাধিক মাইলের ধাক্কা পেরিয়ে শিলচর– সে আমাদের সিউড়ি-বর্ধমানের তুলনায় কসমপলিটান শহর বটে–কিন্তু তারই-বা মুরদ কতটুকু? তার নিজেরই দুঃখের অবধি নেই। আসাম সরকার তাকে– যাক আবার না আরেকটা বাঙাল খ্যাদানো আরম্ভ হয়ে যায় (ভালো তো কারও করতেই পারিনে, মন্দটা না-ই-বা করলুম।), আর কেন্দ্রীয় সরকার? কতবার বুঝিয়েছি, এই শিলচরে বেতারের কেন্দ্র বানিয়ে নাগা-লুসাইদের কন্ট্রোল করো– কে বা শোনে কার কথা (এস্থলে বলে রাখা ভালো আমার জন্মভূমি কাছাড় নয়)! থাক সে কথা। মিজো যদি বা শিলচর পেরুতে চায় তবে সামনে যে খাঁড়া পাঁচিল হিল সেকশন– তার পর সেই সুদূর গৌহাটি। এখানে খাসিয়াদের সঙ্গে তুলনা করলেই দেখা যাবে, একে তাদের চাষের পদ্ধতি উন্নত, শিলঙ গৌহাটির ভাষা তারা মোটামুটি জানে, জিনিসপত্র সেখানে বেচতে পারে, চাকরিনোকরি মিস্ত্রিগিরি করে পয়সা কামাতে পারে। আর শিক্ষিত সম্পদশালী বহু খাসিয়া শিলঙ শহরের পাদ্রির বাঙলোর চেয়েও ফিটফাট বাংলোয় বাস করেন। তাই স্বভাবতই খাসিয়ারা অনেকখানি সন্তুষ্ট এবং তাই শান্ত।
কিন্তু মিজো যায় কোথায়?
১৯১০/১৯১১ থেকে তাদের ভিতর আরম্ভ হয় খ্রিস্টধর্ম প্রচার এবং ১৯৩১ নাগাদ অর্ধেক লুসাইবাসী হয়ে গেছে খ্রিস্টান। তার পর কী হয়েছে জানিনে। নিশ্চয়ই বেড়েছে। কারণ মিশনারিদের কাজ বন্ধ হয়নি। আদম-শুমারির হিসাব দেখে লাভ নেই। ওই সময় থেকেই আরম্ভ হয়, পরের সেনসাসে কার স্বার্থ অনুযায়ী কী দেখাতে হবে তাই নিয়ে ছিনিমিনি, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘কুকিং’।
পার্বত্যাঞ্চলবাসী অনেক সময় আমাদের হিসেবে নিষ্ঠুর, কিন্তু তারা সরল। সরল বিশ্বাসে তারা মনে আশা পোষণ করেছিল, যারা তাদের খ্রিস্টান করেছে তাদেরই জাতভাই ইংরেজ সরকার একদিন তাদের বাসনা-কামনা পূর্ণ করে দেবে। ‘জুম’ খেত করে যে তার পয়সায় পাদ্রির বাঙলো বানানো যায় না সেটা তারা বোঝে না। আমার মনে হয়, ইংরেজ-রাজ থাকলেও আজ না হোক কাল বা পরশু মিজোদের রুদ্ধ আক্রোশ ইংরেজকেই আক্রমণ করত। তবে ইংরেজ ধাপ্পা মারতে ওস্তাদ– বাঙালির মতো চালাক জাতকেও কতবারই না একটা কুমিরছানাকে বারোটা করে দেখিয়েছে! কবিগুরুর মতো বিচক্ষণ জন এবং তাঁর চেয়েও দুঁদে বহু পলিটিসিয়ান ‘ব্রিটিশ জস্টিসে’ বহুকাল ধরে বিশ্বাস রেখে আশা করতেন, সময় এলে আমরা ইংরেজের কাছ থেকে জস্টিস– সুবিচার পাব।
অবশ্য একথাও স্বীকার করি– যারা আমার সঙ্গে একমত নন তাঁদের কাছে মাফ চাইছি যে, দেশ-শাসন-ব্যাপারে ইংরেজের অনেকগুলো সদ্গুণ আছে এবং সেই অনুপাতেই আসাম সরকার– থাক, আবার কেন? তবে আসাম সরকার না হয়ে কেন্দ্রীয় সরকার মিজোদের ভার নিলেই যে মুশকিল আসান হয়ে যেত সেটা আমি বিশ্বাস করিনে। যাই বলুন, যাই কন, আসাম সরকার বাস করেন শিলঙে খাসিয়াদের মধ্যিখানে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উত্তরে নেফা অঞ্চলেও রয়েছে আরো গণ্ডায় গণ্ডায় উপজাতি। তাদের অনেকেই প্রতি হাটবারে নেমে আসে সমতলে, ক্ষেতের জিনিস, এটা-সেটা (তখনকার দিনের চামর, মৃগনাভি, হাতির এবং গণ্ডারের দাঁত ভয়ঙ্কর মূল্যবান জিনিস, মধ্যপ্রাচ্যে ‘হারেম’ পোষণের জন্য মৃতসঞ্জীবনীর ন্যায় নিত্যকাম্য এফরডিসিয়াক ইত্যাদি) বিক্রি করে প্রধানত নুন, কেরোসিন(৩) (সর্বনাশ! আমাদেরই যা হাল, ওদের হচ্ছে কী? তবে হ্যাঁ, ডিগবয় ওদের অতি কাছে) কিনে নিয়ে যাবার জন্য। ব্রহ্মপুত্র-উপত্যকাবাসী আসামিদের অনেকেই তাদের চেনেন। কাছাড়বাসী ক’জন সদস্য আসাম মন্ত্রিমণ্ডলীতে আছেন সঠিক জানিনে; যে ক জন আছেন একমাত্র তারাই ব্ৰহ্মপুত্র উপত্যকাবাসীদের তুলনায় নাগা-মিজোদের বিলক্ষণ চেনেন, সদুপদেশ দিতে পারবেন, অবশ্য শর্ত, যদি কেউ চায়। এঁদের তুলনায় নাগা-মিজোদের সম্বন্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের জ্ঞান সীমাবদ্ধ– এ বিষয়টি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে বুঝিয়েছিলেন নাগাদের প্রথম গ্র্যাজুয়েট, সে সময় আপন মাতৃভূমি নাগা পাহাড়েই এসডিও শ্রীযুক্ত কে ভি চুসা, ট্রেনে শিয়ালদা থেকে সিলেটের কুলাউড়া পর্যন্ত দিল্লি থেকে মুককচঙ ফেরার পথে। সুযোগ পেলে সে কাহিনী আরেক দিন হবে। শ্রীচুসা অর্থনৈতিক দিকটাও উল্লেখ করেন।
