কিন্তু এহ বাহ্য। আসল প্রশ্ন এই : ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে রাজাদেশে মণিপুর যে বৈষ্ণবধর্ম ‘রাষ্ট্রধর্ম’-রূপে গ্রহণ করল সেটা সম্ভব হল কী প্রকারে? আসামের আর পাঁচটা পার্বত্য জাতি যে রকম আর্য জনপদ থেকে দূরে হাজার হাজার বত্সর ধরে আপন আপন প্যাটার্ন অব কালচার বুনে যাচ্ছিল মণিপুরও করছিল তাই। তাদের মাঝখানে একমাত্র মণিপুরই বৈষ্ণব হয়ে গেল কেন? এ কথা সত্য যে শিলচর থেকে মণিপুর পৌঁছানো সহজতর। কিন্তু মৈমনসিং থেকে গারো পাহাড় যাওয়াও তো কঠিনতর নয়, গারোরা অতিশয় শান্তিপ্রিয় এবং দু-একটি গারো মুসলমানের সঙ্গেও আমার আলাপ-পরিচয় হয়েছে। পক্ষান্তরে নেফার অধিবাসীদের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করা কঠিনতর; অথচ লোকমুখে শোনা; সেখানকার কোনও কোনও উপজাতি সর্বাবদে অ-হিন্দু হয়েও মাথার এক দিকের খানিকটা চুল কামায় ও চিহ্নস্বরূপ দেখিয়ে বলে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ নাকি তাদের অর্ধ-হিন্দুরূপে পরিণত করে বলেন যে, তিনি আবার এসে তাদের পূর্ণ-হিন্দু করে দেবেন তারা এখনও সেই প্রতীক্ষায় আছে। তা সে যাই হোক, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের বাঙালি শিষ্যেরাই যে মণিপুরে বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করেন সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মণিপুরি ভাষা বাংলা অক্ষরে লেখা হয়; পক্ষান্তরে পরবর্তী যুগে খ্রিস্টান মিশনারিরা পার্বত্যবাসীদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার পর তাদের ভাষা রোমান বা অদ্যকার দিনের ইংরেজি অক্ষরে লেখেন।(২)
কিন্তু সবচেয়ে বড় তত্ত্বকথা, মণিপুরবাসী বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করতে (এবং পরবর্তী যুগে কাছাড়ে আশ্রয়গ্রহণকারী কিছু মণিপুরি ইসলাম গ্রহণ করাতে) কোনও সভ্যতা-সংস্কৃতিগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্ট হয়নি। রাজনৈতিক সমস্যার কোনও প্রশ্নই ওঠে না, কারণ বাঙালি মিশনারিরা মণিপুরের সিংহাসনে কোনও বাঙালিকে বসাতে চাননি। অর্থনীতির দিক দিয়ে দেখতে গেলে মণিপুরবাসী ও পার্শ্ববর্তী কাছাড়বাসীর মধ্যে দ্রব্য বিনিময়ের ফলে উভয়েই উপকৃত হন। এই অর্থনীতিক দিকটা পাঠক বিশেষভাবে মনে রাখবেন। আমার মনে হয়, নাগা এবং মিজোদের অর্থনৈতিক সমস্যাটা কেউ সবিশেষ চিন্তা করে দেখেননি।
আমার বাল্যকালে সিলেট জেলার একাধিক জায়গায় নিয়ত বর্ধিষ্ণু খ্রিস্টান মিশন ছিল এবং সে যুগে ভারতের তাবৎ প্রটেস্টান মিশনারিদের ভিতর দক্ষিণ-শ্রীহট্টে কর্মরত ওয়েলশ মিশনের (এখনও মিজোদের ভিতর এই মিশনই সর্বপ্রধান এবং যে ক’জন মিশনারির খবর অধুনা পাওয়া যাচ্ছিল না তারা খুব সম্ভব এই মিশনেরই।) রেভারেন্ড পিগোয়ন জোন্স্ তার অসাধারণ বাগিতা– বাংলা, ইংরেজি, ওয়েলশ তিন ভাষাতেই চরিত্রবল ও ধর্মানুরাগের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। আমি পাঠশালা যাবার সময় থেকেই তার গির্জা ও সানডে স্কুলের রীতিমতো অনুরাগী অংশগ্রহণকারী ছিলুম বলে প্রায়ই টিলার উপরে অবস্থিত তাঁর ছিমছাম বাংলোতেও যেতুম। মিশনে বাস করত আরো বিস্তর ছেলেমেয়ে প্রধানত চা-বাগিচার সাহেব ও দিশি রমণীর মিলনজাত পুত্রকন্যা এবং কিছু কিছু খাসিয়া, গারো, নাগা ও লুসাই (মিজো) খ্রিস্টান। খাস বাঙালি প্রায় চোখেই পড়েনি। আমি বিশেষ করে এই পার্বত্য খ্রিস্টানদের সম্বন্ধেই কৌতূহলী ছিলুম এবং হাইস্কুলে ঢোকার সময় একটি লুসাই ছেলের সঙ্গে হৃদ্যতা হয়। সে সময় লুসাই ভাষা শিখতে গিয়ে যদিও শেখা হয়নি– আবিষ্কার করি যে, অন্তত লুসাই ভাষাতে বাংলার বহু বহু শব্দের কোনও প্রতিশব্দ নেই (পরে জানতে পারি, অলিখিত ভাষা মাত্রেরই সাধারণত এই হাল)।
জোনস্ সায়েব থাকতেন ছিমছাম বাংলোয়, জানালায় পর্দা টানানো। সায়েব-মেম খানা খেতেন ছুরি কাঁটা দিয়ে, ধবধবে সাদা টেবিলক্লথে ঢাকা খানা-টেবিলের পাশে। আমার বয়স তখন তেরো; কিন্তু তখনই মনে হয়েছিল, ধর্মযাজকের এতখানি বিলাস ভালো না– বিশেষ করে তিনি যখন মিশনের আর সবাইকে তাঁর মতো ‘বিলাসে’ রাখতে পারেন না। (পরবর্তী যুগে ইংলন্ড এবং কন্টিনেন্ট ঘুরে বুঝতে পারলুম, জোনস্ সায়েব তাঁর দেশের পাদ্রি-ভাইদের তুলনায় কতখানি আত্মত্যাগ করে ওই বিদেশ-বিভূঁইয়ে কতখানি সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন; তাঁর আত্মাকে স্মরণ করে আজ ক্ষমা ভিক্ষা করি)।
আমার এবং আমার হিন্দু-মুসলমান বন্ধুদের মনে পাদ্রি সায়েবের ছিমছাম বাড়ি, আসবাবপত্র কোনও প্রলোভনের উদ্রেক করত না। আমরা যেন কিছুটা বুঝে কিছুটা না বুঝে মনে মনে যুক্তি করতুম, খ্রিস্টান হলে এসব পাওয়া যায়; কিন্তু আমরা তো ধর্ম বেচতে চাইনে। তাই বোধ হয় জোস্ সায়েব তাঁর জোরদার বাগ্মিতা-শক্তি দ্বারাও কোনও বাঙালি হিন্দু-মুসলমানকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পারেননি করে থাকলেও অত্যন্ত দুস্থ দূর গ্রামাঞ্চলের তথাকথিত নিম্নতম শ্রেণির মধ্যে। আমরা কখনও তার খবর পাইনি।
আমার কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগত, মিশনের এই খাসি লুসাইরা কি জোনস্ সায়েবের মতো ফিটফাট বাড়িতে থাকতে চায় না?
মণিপুরে যেসব বৈষ্ণব ‘মিশনারিরা’ গিয়েছিলেন তাঁরা নিশ্চয়ই সেখানে কোনও উচ্চতর মানের জীবনযাপন করেননি। বস্তৃত আজও মণিপুরে গ্রামবাসী সুরমা উপত্যকার চাষার চেয়ে অনেক সচ্ছল। কাজেই এ নিয়ে কোনও দ্বন্দ্ব সেখানে উপস্থিত হয়নি।
