আলহামদুলিল্লা, ইয়া আল্লা, তওবা তওবা, বিসমিল্লা এগুলো অবস্থাভেদে ব্যবহৃত হয়। আপনার ছেলে এম-এ পাস করেছে? তওবা তওবা!’ (বা তোবা তোবা!) বললে যে ভুল হয় সেটা সাধারণ জনও বোঝে। তাই এসব বাক্য সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে অনেকটা কারও প্রথম বংশধর জন্মালে আপনি যদি উচ্চকণ্ঠে বল হরি, হরিবোল’ বলে ওঠেন তা হলে যেরকম হয়! এসব ভুলে সাধারণ সামাজিক উপন্যাস পাঠক শুধু একটুখানি মুচকি হাসে, কিন্তু ঐতিহাসিক উপন্যাস যিনি লেখেন তার কাছ থেকে পাঠক একটু বেশি প্রত্যাশা করে।
‘শার্ঙ্গদেবে’র মতো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গভীরে যাঁরা গিয়েছেন তাঁরাই জানেন, পাঠান-মোগল যুগের সঙ্গীত তথা এদের আগমনের পূর্বে ভারতীয় সঙ্গীতের প্রকৃত স্বরূপ কী ছিল; এ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁদের কতখানি ফার্সি ভাষার সঙ্গে পরিচিত হবার। প্রয়োজন। ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিকের অতখানি ফার্সি জানার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তিনি যদি রানি রিজিয়ার দরবারে সেতার বাজাতে আরম্ভ করেন তবে বোধ হয় সঙ্গীতজ্ঞদের অনেকেই আপত্তি জানাবেন। আমি বিশেষজ্ঞ নই, তাই পণ্ডিতেরা যখন কিছু বলেন তখন সেটা মনে রাখবার চেষ্টা করি। মৌলানা আজাদ আমাকে বলেন, ‘সেতার তৈরি করেন আমির খুসরো। এটা বীণার অনুকরণে তৈরি, কিন্তু বীণার চেয়ে সহজ।’
আমি উত্তরে বললুম, ‘আমি আরেক পণ্ডিতের কাছে শুনেছি বাদ্যযন্ত্র-নির্মাতার পক্ষে সেতার-নির্মাণ বীণার চেয়ে কঠিনতর। কিন্তু বাজানেওয়ালার পক্ষে সেতার বাজানো সহজতর। ওই পণ্ডিত আমাকে বলেন, ‘অনেক সময় যে জটিল বাদ্যযন্ত্র নির্মাণ করা হয় সেটা বাজানেওলার পক্ষে বাজানো সহজ করে দেবার জন্য”।’ (শার্ঙ্গদেব হয়তো খাঁটি খবর রাখেন।)
এসব ঝামেলার মাঝখানে পাঠান বা মোগল দরবারের গানের মজলিস বর্ণনা করা যে বিপদসঙ্কুল, সে কথা পাঠকমাত্রেই বুঝতে পারবেন।
ঠিক তেমনি মোগল আমলের ফিস্টির বর্ণনা। কোরমা, কালিমা, কোফতা, কবাব (শিক্ কবাব প্রাক-মুসলিম যুগেও ছিল–শূল্যপক্ব মাংস– কিন্তু সেটা আঁকাবাঁকা শিকের ভেতর ঢুকিয়ে করা হত, না শূলের ডগায় ঝুলিয়ে ঝলসানো হত, তা জানিনে) যে সব কটাই যাবনিক খাদ্য তা জানি, কিন্তু মোগল ফিস্টিতে বাঁধাকপির পাতার ভিতর কিমা দিয়ে যে দোলমা তৈরি হয়, সেটা কি চলবে? কপি-জাতীয় জিনিস এদেশে এল কবে? এমনকি যে সিম জিনিসটা ঘরোয়া বলে মনে হয় সে সম্বন্ধেও একখানি চিরকুটে দেখি ঋষিতুল্য দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন শাস্ত্রীকে শুধোচ্ছেন, ‘সংস্কৃতে আপনি সিম জিনিসটার উল্লেখ পেয়েছেন কি?’
মোগল ছবিতে তাদের জামাকাপড় গয়নাগাঁটি পরিষ্কার দেখতে পাই। কিন্তু সব কটার নাম তো জানিনে। মা-দুর্গার নাকের নথ দেখে দ্বিজেন্দ্রনাথ চিত্রকরকে শুধান, ‘নথ কি মুসলমান আগমনের পূর্বে ছিল?’
কিন্তু আপত্তি কী? গদাযুদ্ধে নামার সময় ভীমের পকেটে যদি ফাউন্টেনপেন দেখা যায়, তবে কী আপত্তি! জেরুজালেমের এক মেরি মূর্তির বাঁ-কব্জিতে দেখি ছোট্ট দামি একটি রিস্টওয়াচ! ভক্তের চোখে মা-মেরির বাঁ-হাতখানা বড্ড ন্যাড়া ন্যাড়া দেখাচ্ছিল, তাই। জানিনে, বারোয়ারি দুর্গাপুজোয় মা-দুর্গা নাইলন পরতে আরম্ভ করেছেন কি না!
———-
(১) কত না হস্ত চুমিলাম আমি
তসবিমালার মত,
কেউ খুলিল না কিস্মতে ছিল
আমার গ্রন্থি যত!
অর্থাৎ তসবিমালা জপ করে এক সাধু অন্য সাধুর হাতে তুলে দেন, কিন্তু কেউই দয়া করে মালার সুতোটি কেটে মুক্তোগুলোকে মুক্তি দেন না।
মিজোর হেপাজতি
নেফা অঞ্চল বাদ দিলে আসামে যে কটি পার্বত্য অঞ্চল গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, তার ভেতর পড়ে খাসিয়া, গারো, নাগা ও লুসাই। এর সঙ্গে ত্রিপুরার কুকি অঞ্চলেরও নাম করতে হয়, কিন্তু নানা কারণে সেখানকার কুকিরা এযাবৎ কোনও সমস্যার সৃষ্টি করেনি এবং যেহেতু ত্রিপুরা আসামের অংশরূপে গণ্য হয়নি, তাই সে-দেশ এ প্রবন্ধের আলোচনা নয়। কিন্তু মণিপুর সম্বন্ধে এস্থলে কিছু না বললে তাদের ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম তথা বাঙালি-ধর্মপ্রচারকদের প্রতি অবিচার করা হয়।
আসামের অন্যান্য পার্বত্য জাতির মতো মণিপুর অনুন্নত নয়। মহাভারতের অর্জুন-চিত্রাঙ্গদার মণিপুর ও বর্তমান মণিপুর একই কি না সে নিয়ে তর্কাতর্কি করার শাস্রাধিকার আমার নেই এবং যেহেতু মণিপুর অধীনের জন্মভূমির প্রত্যন্ত ভূমিতে অবস্থিত, সে তার প্রতিবেশীকে অহেতুক ক্ষুব্ধ করতে চায় না, কিন্তু এ কথা সত্য যে, যদ্যপি সাধারণ মণিপুরিদের চেহারার ছাপ মঙ্গোলীয়, ওদের ভেতর হঠাৎ বিশুদ্ধ আর্য টাইপও পাওয়া যায় এবং যেহেতু পার্শ্ববর্তী আর্য বাংলা-ভাষাভাষী সিলেট কাছাড়ে এ টাইপ দুর্লভ, তা হলেই প্রশ্ন উঠবে, কান্যকুজ অঞ্চলের এই আর্য টাইপ হঠাৎ মণিপুরে আবির্ভূত হল কী প্রকারে? পশ্চিমবাংলার সঙ্গে মণিপুরের সরাসরি যোগসূত্র না থাকা সত্ত্বেও বাঙালি আজ মণিপুরি নৃত্যের কথা ও সে নৃত্য যে রাধাকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে জন্ম ও শ্রীবৃদ্ধি লাভ করেছে, সে-কথা জানে– বস্তুত ভারতবর্ষে অধুনা যে চার রকমের শাস্ত্রীয় নৃত্য-পদ্ধতি স্বীকৃত হয়, এ নৃত্য তারই অন্যতম কিন্তু বৈষ্ণবধর্ম মণিপুরে প্রচার ও প্রসার লাভ করে অষ্টাদশ শতাব্দীতে, অতএব এ নৃত্যকে আড়াই হাজার বছরের ঐতিহ্য দিয়ে মহাভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করা কঠিন।(১)
