অন্যদিন ওস্তাদ আমাদের অভিনন্দন, প্রশংসাবাদ, মরহাবা যতখানি ঝুঁকে ঝুঁকে সেলাম জানিয়ে গ্রহণ করতেন, আজ তিনি সেরকম করলেন না। দু-একবার সেলাম জানিয়ে গালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। আমার একটু আশ্চর্য লাগল।
অবশ্য তার পরও তিনি গেয়েছিলেন তোর অবধি।
শেষ ভৈরবী গেয়ে তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এলেন। আমি বললুম, ‘ওস্তাদ, বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন; একটু বিশ্রাম নেবার জন্য বসুন।’
অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর যে কী বিষণ্ণতা মুখে মেখে আমার দিকে তাকালেন তার অর্থ আমি কিছুই বুঝতে পারলুম না। করুণ কণ্ঠে বললেন, আচ্ছা, সৈয়দ সাহেব, লোকে আমাকে এরকম লজ্জা দেয় কেন বলুন তো? আমি কি গান গেয়ে বৃষ্টি নামাতে পারি?
আমি ক্ষণমাত্র চিন্তা না করে বললুম, ‘সে জানেন আল্লা। আমি শুধু জানি, অন্তত আজ রাত্রে তিনি আপনার সম্মান রাখতে চেয়েছিলেন।’
৯।১০।৬৫
মা-মেরির রিস্টওয়াচ
একদা রম্য রচনা কী রীতিতে উত্তমরূপে লেখা যায়, এই বাসনা নিয়ে কলেজের ছেলের বয়সীরা আমাকে প্রশ্ন শুধাত; অধুনা শুধোয়, ঐতিহাসিক উপন্যাস কী প্রকারে লেখা যায়? আমি বাঙালি, কাজেই বাঙালির স্বভাব খানিকটে জানি– পাঁচু, ভূতো আর পাঁচজন যে ব্যবসা করেন– যথা পাবলিশিং হাউস কিংবা লন্ড্রি– পয়সা কামিয়েছে, সে সেইটেই করতে চায়, নতুন ব্যবসায় ঝুঁকি নিতে সে নারাজ। অতএব হাল-বাজারে যখন ঐতিহাসিক উপন্যাস ছেড়ে দিয়ে কালোবাজারের চেয়েও সাদা-বাজারে লাভ বেশি, তবে চল ওই লালকেল্লা ফতেহ করতে; মা-মেরিতে বিশ্বাস রাখলে কড়ি দিয়েও কিনতে হবে না, সায়েবের মুনশিও ওই আশ্বাস দিয়েছেন।
যারা পণ্ডিত লোক, ইতিহাস জানেন ও উপন্যাস লেখার কায়দাটাও যাঁদের রপ্ত আছে, তাঁরাই ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে পারেন। আমি ও আমার মতো আর পাঁচজন পারে না, আমরা পণ্ডিত নই। কিন্তু পণ্ডিত না হয়েও দিব্য বুঝতে পারি, ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে যাওয়ার বিপদটা কী?–পাখির মতো উড়তে না জেনেও চমৎকার বুঝতে পারি মনুমেন্টের উপর থেকে লাফ দিয়ে পাখির মতো ওড়বার চেষ্টা করলে হালটা মোটামুটি কী হবে।
এই তো হালে একটি সাপ্তাহিক পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অলস নয়নে পড়লুম, ‘তুমি ওমরাহ নও।’
সর্বনাশ! এটা কী প্রকার হল? ‘ওমরাহ’ তো আমিরের সাদামাটা বহুবচন- সে রকম ‘গরিব’ থেকে ‘গুরবাহ’; তাই বলি ‘গরিব-গুরব’। সেই আইনেই বলি ‘আমির-ওমরাহ’ (‘আমির-ওমরো’ও শুনেছি; আকারান্ত শব্দ বাংলায়, ‘এ’ ‘ও’-তে আকছারই পরিবর্তিত হয়, যেমন ‘ফিতে’ ‘জুতো’– এর কোনও পাকা নিয়ম নেই। আরবি বা ফার্সি শব্দের একবচন এবং বহুবচন পাশাপাশি বসিয়ে আমরা অনেক সময় বাংলায় কালেকটিভ নাউন তৈরি করি– যেমন ‘আমির-ওমরাহ’ অর্থাৎ’ আমির সম্প্রদায়’ কিংবা ‘গরিব-গুরবো’ ‘দীনসম্প্রদায়’ ‘দীনজন’। তা সে যাই হোক, ‘ওমরাহ’ কথাটা বরহক বহুবচনেই আছে। কাজেই যে রকম আপনি ‘আমির সম্প্রদায় নন’ ব্যাকরণে ভুল, ‘তুমি ওমরাহ নও’ ভুল।
(ঠিক সেইরকম ‘আলিম’ পণ্ডিতের বহুবচন ‘উলেমা’– জমিয়া-ই-উলাম-ই-হিন্দ; অনেকেই না জেনে ইংরেজিতে লেখেন ulemas)
কাজেই প্রথম চোরাবালি শব্দ নিয়ে। ঠিক ঠিক অর্থ না জানলে আমাদের মতো অপণ্ডিত জন খায় মার। ঠিক সেইরকম গুপ্তযুগের উপন্যাস লিখতে গিয়ে না ভেবে ফুটিয়ে দিলুম রজনীগন্ধা, কৃষ্ণচূড়া– শব্দ দুটো থেকে বিশেষ করে যখন সংস্কৃতের সুগন্ধ বেরিয়েছে– অথচ দুটো ফুলই এদেশে এসেছে অতি হাল আমলে। এবং শুধু শব্দার্থ জানলেই হল না– রূঢ়ার্থে তার ব্যবহার জানতে হয়। তসবি(১)-খানা কথাটির দুটো শব্দ আমরা চিনি–যে ঘরে বসে বাদশা তসবিমালা জপ করেন। মোগল আমলে কিন্তু ওই ঘর ছিল অতিশয় গোপন (top secret) মন্ত্রণালয়।
কেউ যদি লেখেন ‘অতঃপর সম্রাট ঔরঙ্গজেব সমস্যা সমাধানের জন্য সমস্ত রাত কুরান শরীফ ঘেঁটেও কোনও হদীস পেলেন না’, তবে বাঙালি পাঠক এ-বাক্যে কোনও দোষ পাবেন না। কারণ হদীস বা হদিশ বলতে বাঙালি পাঠক প্রিন্সিডেন্স বা পূর্ব উদাহরণ বোঝে। আমি কুরানে হদীস খোঁজা আর বেদে মনুসংহিতা খোঁজা একই রকমের ভুল। কুরানে আছে পয়গম্বরের কাছে প্রেরিত ঐশী বাণী–আপ্তবাক্য। আর হদীসে আছে পয়গম্বর কীভাবে জীবনযাপন করতেন, কাকে কখন কী করতে আদেশ বা উপদেশ দিয়েছিলেন ইত্যাদি (এগুলোও অতিশয় মূল্যবান কিন্তু আপ্তবাক্য নয়)। কাজেই এগুলোর (হদীসের সন্ধান কুরানে পাওয়া যাবে কী করে? বস্তুত কোনও অর্বাচীন সমস্যা ও তার সমাধান কুরানে না পেলে আমরা হদীসে (শাস্ত্রে ‘স্মৃতি’র সঙ্গে তুলনীয়) যাই। যেখানে না পেলে ইজমাতে এবং সর্বশেষে কিয়াসে। কিন্তু শেষের দুটো স্মৃতিশাস্ত্রের গভীরে ঐতিহাসিক উপন্যাসে প্রতিবিম্বিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যল্প। তা সে যাই হোক, মুসলমান ধর্ম সম্বন্ধে যে কিছুটা জ্ঞান বাঞ্ছনীয় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন, মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে পরিচয়। ঐতিহাসিক উপন্যাসে সেটা প্রধানত বিস্ময়বোধক বাক্যে। তুলনা দিয়ে বলতে পারি, ফরাসি উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদে ‘মঁ দিয়ো’ ‘পার ব্ল্য’, ‘ভাঁত্র ব্ল্য’-গুলো ইংরেজ ফরাসিতেই রেখে দেয়; জর্মন উপন্যাসের অনুবাদে ‘মাইন গট’ ‘হ্যার গট’ ‘ডনার ভেটার’ মূলের মতো রেখে দেয়; এগুলোর অনুবাদ সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়। অবশ্য স্মরণ রাখা উচিত, মঁ দিয়ো, মাইন গট এবং মাই গড একই জিনিস, একই বাক্য হলেও ইংরেজের পক্ষে মাই গড’ বলা নিন্দনীয়; নিতান্ত বিপাকে না পড়লে ইংরেজ ‘মাই গড’ বলে না। পক্ষান্তরে ফরাসি জর্মন কথায় কথায় ‘মঁ দিয়ো’ ‘মাইন গট’ বলে থাকে। তাই ইংরেজি অনুবাদের সময় মূলের আবহাওয়া রাখবার জন্য অনুবাদক এগুলো অনুবাদ করেন না।
