———-
১. এবং এর অনুবাদ করার বাসনা আমার ছিলও অবশ্য সাবধানের মার নেই বলে ক্যানসার-রোগ-বিশেষজ্ঞ আমার ভ্রাতুস্পুত্রীকে দিয়ে সেটি সেনসর করিয়ে নিতুম। এ বেতার-ভাষণটি এখনো আদৌ গাজীমিয়ার বস্তানীতে আশ্রয় নেয়নি, অর্থাৎ আউট-অব-ডেট হয়ে যায়নি। ওই ভ্রাতুস্পুত্রীর আদেশে আমি সর্বাধুনা প্রকাশিত জর্মন-বিশ্বকোষে সবিস্তর লিখিত ক্যানসার প্রবন্ধটি পড়ি। এবং যদিও সব জিনিস বুঝতে পারিনি (বিশেষ করে কুআন্ট থিয়োরি দিয়ে ক্যানসার রোগের কারণ নির্ণয়ের আধুনিক প্রচেষ্টা!) তবু, এটা লক্ষ করলুম যে ক্যানসারের পূর্বাভাস সম্বন্ধে জাওয়ারব্রুখ অজ্ঞজনকে যেসব দিকে লক্ষ রাখতে বলেছেন, সর্বাধুনিক জর্মন-বিশ্বকোষও তাই বলেছেন। ..উল্লেখযোগ্য যে, ক্যানসার গবেষণা আরম্ভ করার পূর্বে জাওয়ারব্রুথ বার্লিনের ইন্ডলজি ডিপার্টমেন্টে গিয়ে খবর নেন, প্রাচীন ভারতীয় বৈদ্যেরা ক্যানসার সম্বন্ধে কী বলে গিয়েছেন।
২. এ-প্রবন্ধ “দেশে” প্রকাশিত হওয়ার পর আমি চিকিৎসক-অচিকিৎসক একাধিক সজ্জন পাঠকের কাছ থেকে অনুরোধ পেয়েছি, ক্যানসার সম্বন্ধে জাওয়ারব্রুখের প্রাগুক্ত প্রবন্ধটি যেন আমিই অনুবাদ করি। আমি করজোড়ে ক্ষমা ভিক্ষা করছি, কারণ অসুস্থতাবশত আমার দেহে শক্তি মনে উৎসাহ বড়ই হ্রাস পেয়েছে। তবে এটাও নিবেদন, আমৃত্যু দুটি প্রবন্ধ অনুবাদ করতে পারার দুরাশা আমি কখনো সম্পূর্ণ ত্যাগ করব না; ক্যানসার সম্বন্ধে প্রবন্ধটি ও অধ্যাপক ভিন্টারনিত রচিত ক্ষুদ্রাকার রবীন্দ্র-জীবনী।
বাবুর শাহ
এদেশে তিন রকমের ইংরেজ এসেছিল। বড় দলের কাজ ছিল পৃথিবীর সামনে আমাদের হেয় প্রমাণ করে এদেশে শ্বেত (আমি বলি ধবল কুষ্ঠ) রাজতু যুক্তি ও নীতির ওপর খাড়া করা। এককথায় যাকে বলে, ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ যে কী ভীষণ ভারি এবং ইংরেজ স্বদেশের বেকন-আণ্ডা, ঘোড়দৌড়ের জুয়োখলা, খেঁকশেয়ালি শিকার করা স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়ে এই নচ্ছার’ দেশে এসে পৃথিবীর ইতিহাসে যে কী অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে, সেটা সপ্রমাণ করা। অতি দৈবেসৈবে দু-একজন তীক্ষ্ণদৃষ্টিসম্পন্ন সহৃদয় মহাজন এ ভণ্ডামি ধরতে পেরেছিলেন। তারই একজন প্রখ্যাত হাস্যরসিক জেরম কে জেরম। তিনি মারাত্মক ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন– পড়ে মনে হয়, তিনি যেন সিকনি ঝাড়ছেন—‘বার্ডেন যদি হেভিই হয় তবে ওটা বইছিস কেন, মাইরি? আমি তো খবর পেয়েছি, ইন্ডিয়ানরা সেই সেবা, সেই হোলি ক্রুসেডের জন্য থ্যাঙ্কুটি পর্যন্ত বলে না। তবে ফেলে আয় না ওই লক্ষ্মীছাড়া বোঝাটা হতভাগাদেরই ঘাড়ে!’
কিন্তু প্রাগুক্ত ওই বড় দলের ইংরেজদের একটি আপ্তবাক্য নিয়ে আজ আমার আলোচনা। এরা মোকা বোকায় বলত, ‘পাঠান-মোগল আদৌ ইতিহাস লিখতে জানত না– শুধু লড়াই আর লড়াই।’
অন্য দল সংখ্যায় নগণ্য। এঁরা এসব কথায় কান না দিয়ে সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি শিখতেন, বাংলায় বাইবেল অনুবাদ করতেন, এবং প্রাচ্যভাষায় লিখিত জ্ঞানবিজ্ঞানের বই ইংরেজিতে অনুবাদ করতেন। ফার্সি ইতিহাস যে শুধু ‘লড়াই আর লড়াই’ নয় (আহা! তাই যদি হত আর আমরা তাই পড়ে ক্ষেপে গিয়ে সেই আমলেই ইংরেজকে ঠ্যাঙাতে আরম্ভ করতুম!) সেটার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ তারা জানিয়েছেন ফার্সি ইতিহাস অনুবাদ করে।
এক তৃতীয় শ্রেণির পিচেশও এদেশে এসেছিল। এরা প্রথম শ্রেণির মতো অশিক্ষিত বর্বর নয়, আবার দ্বিতীয় শ্রেণির মতো নিরপেক্ষ সাধুজনও নয়। এরা অল্পবিস্তর সংস্কৃত আরবি ফার্সি চর্চা করে, অল্পবিদ্যা যে ভয়ঙ্করী সেইটে আপন অজানতে প্রমাণ করে দিত এই বলে, ‘ওসব তাবৎ মাল আমাদের পড়া আছে; সব রাবিশ!’
দুর্ভাগ্যক্রমে এদেশের ইংরেজি ‘শিক্ষিতেরা’ এদেরই বিশ্বাস করে বসলেন।
আমার বক্তব্য, নিজের মুখেই ঝাল চেখে নিতে পারেন। বিশেষত যখন কিছুদিন ধরে ‘শেষ মোগলদের’ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক উপন্যাস বেশ কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আমি ভারি খুশি হয়েছি, কারণ অনেক স্থলে সাধারণ পাঠক এই করেই উচ্চতর পর্যায়ে উপনীত হয়। আমারই ন্যাওটা একটি ম্যাট্রিক ফেল ছোকরা কিন্তু র্যাপিড-রিডিঙের ফলে সে দিব্য শিলিং-শকার, পেনি-থ্রিলার পড়তে পারত– আমার কাছ থেকে রোম-সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘আই ক্লাউডিউস’ পড়ে এমনই ‘ক্ষেপে যায়’ যে, সে তার পর দুনিয়ার যত রোমান ইতিহাস পড়তে আরম্ভ করে, এস্তেক জুলিয়াস সিজারের ‘ব্রিটন বিজয়’ পর্যন্ত।
হালে বাবুর বাদশার আত্মজীবনী বেরিয়েছে বাংলা অনুবাদে। অবশ্য সে অনুবাদ এসেছে তিন ঘাটের জল খেয়ে। বাবুরের মাতৃভাষা ছিল তুর্কি– চুগতাই-তুর্কি অর্থাৎ তুর্কর্মানিস্তানের তুর্কি; টার্কির (যার রাজধানী আঙ্কারা) ভাষা ওসমানলি-তুর্কি। আমার যতদূর জানা আছে, মোগল আমলে যদিও দরবারি ভাষা ছিল ফার্সি, তবু শেষ বাদশা বাহাদুর শাহ পর্যন্ত অন্তঃপুরে তুর্কিতেই কথাবার্তা বলেছেন, উর্দুতে কবিতা লিখেছেন(১)– দিল্লির বিখ্যাত বিখ্যাত মুশায়েরায় (কবি-সম্মেলনে) দূত মারফৎ আপন কবিতা পাঠিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন (সে আমলের প্রখ্যাত কবি ছিলেন উর্দুর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি গালিব) এবং রাজকার্য করেছেন ফার্সিতে।
