বাবুরের সেই আত্মজীবনী অনূদিত হয় ফার্সিতে, ফার্সি থেকে ইংরেজিতে ও বিবেচনা করি, এই বাংলা অনুবাদ সেই ইংরেজি থেকে। তাতে করে যে খুব মারাত্মক ক্ষতি হবে সে ভয় আমার নেই, কারণ অনুবাদে সবচেয়ে বেশি জখম হয় গীতিরস, এবং বাবুরের সাহিত্যসৃষ্টি গীতিরসপ্রধান নয়। এবং লড়াইয়ের কথা যদিও এটাতে আছে তবু সেইটেই প্রধান কথা নয়। আসল কথা বাবুরের পর্যবেক্ষণশক্তি। ভারতবর্ষ প্রধানত দিল্লি-আগ্রা অঞ্চল– তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন এবং অতিশয় নিষ্ঠার সঙ্গে তার বর্ণনা দিয়েছেন। আমি যখন কাবুলে ছিলুম তখন বাবুর-বর্ণিত, কাবুল পাঞ্জশির (পাঞ্জশির অর্থ পঞ্চ-ক্ষীর, সংস্কৃত ‘ক্ষীর’ শব্দ ফার্সিতে ‘শীর’, কিন্তু অর্থ দুধ, আর পাঞ্জ অর্থ পঞ্চ– ওই জায়গায় পাঁচটি নদী বয় : আমাদের পায়েসকে কাবুলিরা বলে শির-বিরঞ্জ (বিরঞ্জ অর্থ চাল)- ইত্যাদি আমি আপন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি। বস্তুত বাবুর বর্ণিত কাবুল ও আমার দেখা কাবুলে বিশেষ পার্থক্য ছিল না। হালে যাঁরা কাবুল দেখে ফিরছেন তাঁরা বলেন, গত দশ বৎসরে নাকি কাবুলের চেহারা একদম পালটে গিয়েছে।
কাবুলিরা বাবুরকে ঘৃণা করে। কারণ ইব্রাহিম লোদি ছিলেন আফগানিস্তানের পাঠান। তাঁকে পরাজিত করে হিন্দুস্তানের তখৎ ছিনিয়ে নেন তুর্কমানিস্তানের মোগল বাবুর। আমাকে এক সম্ভ্রান্ত, সুশিক্ষিত, বিশ্বপর্যটক পাঠান কূটনৈতিক বেদনাবিকৃত কণ্ঠে বলেন, আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, ডক্টর, এই বর্বর বাবুর কী করেছিল? কল্পনা করতে পারেন, সেই নরদানব ইব্রাহিম লোদির অন্তঃপুরের পূণ্যশীলা অসূর্যস্পশ্যাদের খোলাবাজারে ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রয় করেছিল। এ শুধু বর্বর যাযাবর তুর্কিদের পক্ষেই সম্ভব।’
কাজেই আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে, কয়েক বৎসর আগে পর্যন্ত বাবুরের কবরের উপরে না ছিল আচ্ছাদন (একদা নাকি ছিল, কিন্তু সেটা লুট হয়ে কিংবা ভেঙে পড়ে যাওয়ার পর আফগানরা স্বভাবতই সেটা মেরামত করে দেবার কোনও প্রয়োজন অনুভব করেনি), না ছিল কোনও অলঙ্কার-আভরণ; কয়েক ফালি পাথর দিয়ে তৈরি অতিশয় সাদামাটা একটি কবর। হালে নাকি আফগান সরকার বাবুরের ঐতিহাসিক মর্যাদা অনুভব করতে পেরেছেন– জাত্যভিমান কিঞ্চিৎ সংযত করার ফলে– এবং কবরের সুব্যবস্থা করেছেন।
আজকের দিনের বাঙালি ইনফ্লেশন কারে কয়, সেটা চোখের জলে নাকের জলে শিখেছে। রোক্কা একটি টাকার ক্রয়মূল্য আজ কতখানি, সে তা বিলক্ষণ জানে। বাঙালি তাই বাবুরের ইনফ্লেশন-জ্ঞান দেখে আনন্দিত হবেন। দিল্লি জয়ের পর বাবুরের আমীর-ওমরা বিস্তর ধনদৌলত লুট করে বললেন, ‘এবারে চলো কাবুল ফিরে গিয়ে নবাবি করা যাক’। বাবুর তখন তাদের বুঝিয়েছিলেন যে, তাদের সিন্দুকে কড়া কড়া টাকা থাকলেই সঙ্গে সঙ্গে কাবুল উপত্যকার শরাব-কবাবের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে না। যেখানে আণ্ডার দাম আগে এক পয়সা ছিল সেখানে ওদের এখন দিতে হবে আষ্ট গণ্ডা (কিংবা ওই ধরনের কিছু একটা বইখানা আমার হাতের কাছে নেই)। কারণ সেপাই-পেয়াদারাও কিছু কম মাল লুট করেনি, তারাও এখন নিত্যি নিত্যি আণ্ডা খেতে চাইবে।
এরপর যে বইখানা পড়ে বাঙালি পাঠক আনন্দ পাবেন সেটা ফার্সিতে লেখা বাংলার (খুব সম্ভব প্রথম পূর্ণাঙ্গ) ইতিহাস। বাহারিস্তানে গায়েবি(২)– অজানা বসন্তভূমি। লেখক দিল্লি-আগ্রা-বিহারের শুকনো দেশ দেখে দেখে বাংলার দেহলিপ্রান্তে এসে পেলেন, চতুর্দিকে শ্যামল শ্যামল আর নীলিমায় নীল। তাঁর চোখ জুড়িয়ে গেল।
এর কথা আরেক দিন হবে।
———-
১. শুনেছ, রাজা কবিতা লেখে, এ আবার কেমন রাজা!’ এই বলে তখনকার দিনের ইংরেজ বাদশা-হাসলামংকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করত। পরবর্তী যুগের এক জহুরি ইংরেজ এই নিয়ে মন্তব্য করে দেখলেন, ওইসব বর্বর ইংরেজ জানত না যে, ওয়ারেন হেস্টিংসও কবিতা লিখতেন, এবং বাহাদুর শা’র তুলনায় অতিশয় নিরেস। ২. বাংলা আজগুবি অর্থ—‘আজ’ মানে ‘হতে’ from; গায়েবি মানে অজানা ‘লুপ্ত’ ‘অদৃশ্য’ ‘বিধিকৃৎ’ অর্থাৎ অজানা থেকে আগত বলে অদ্ভুত।
বিষ্ণুশর্মা
মিশরের পসারি–গন্ধবণিক– যেরকম ভারতের শঙ্খচূর্ণ(১) এবং অগুরু আতর বিক্রি করে, ঠিক তেমনি কাইরোর পুস্তক-বিক্রেতা বিষ্ণুশর্মার ‘পঞ্চতন্ত্র’ ও বুদ্ধজীবনী বিক্রি করে। কিন্তু সে ‘বুদ্ধজীবনী’ কে লিখেছেন, কেউ জানে না।
অবশ্য পঞ্চতন্ত্র সেখানে অন্য নামে পরিচিত। আরবিতে বলে ‘কলীলা ওয়া(২) দিমনা’। এ দুটি–কলীলা ও দিমনা– দুই শৃগালের নাম। সংস্কৃতে করকট ও দমনক। কোনও কোনও পণ্ডিত বলেন, গোড়াতে পঞ্চতন্ত্রের ওই নামই ছিল। পরবর্তী যুগে ওটিকে পাঁচভাগে বিভক্ত করে পঞ্চতন্ত্র নাম দেওয়া হয়। পাঁচ সংখ্যায় কেমন যেন একটা ম্যাজিক আছে কিংবা চোখের সামনে আপন হাতের পাঁচটা আঙুল যেন কোনও ইতস্তত প্রক্ষিপ্ত তথ্য, গল্প, প্রবাদ-সমষ্টিকে পচের কোটায় ফেলতে চায়। বাইবেলের ‘প্রাচীন নিয়মে’ (ওল্ড টেস্টামেন্ট) হয়তো সেই কারণেই ‘পেন্টাটিয়েশ’= পঞ্চগ্রন্থ আছে। ইদানীং আমরা পাঁচ-শালার পরিকল্পনা করি।
তা সে যাই হোক, আমাদের এই তৃতীয়/দ্বিতীয় শতাব্দীতে রচিত পঞ্চতন্ত্র ষষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন ইরানে পেলেভি (সংস্কৃতে পহলভি) ভাষাতে অনূদিত হয়। তার একটা বাইরের কারণও ছিল। প্রাচীন ইরানের সঙ্গে প্রাচীন গ্রিস-রোমের সম্পর্ক বহুকালের। কখনও যুদ্ধের মারফতে, কখনও শান্তির। শান্তির সময় উভয়ে একে অন্যের ওপর সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু দ্বিতীয়/তৃতীয় শতাব্দীতে ইরানিরা গ্রিসের ওপর বিরক্ত হয়ে (ফেড় অপ) পুবের দিকে মুখ ফেরালে। ফলে ষষ্ঠ শতাব্দীতে পঞ্চতন্ত্র রাজা খুসরৌ অনুশিরওয়ানের(৩) আমলে পহলভিতে এবং অল্পকালের ভিতরই পহলভি থেকে সিরিয়াকে অনূদিত হল।
