এ রকম আরও বহু মজার মজার কথা আছে এই অসাধারণ পুস্তকে; বস্তুত পুরো বইখানাই হাস্যরসের কুমকুমে কুমকুমে ভর্তি। পাঠকের চটুল হৃদয়ে একটুখানি চাপ পড়লেই আবীরে আবীরে ছয়লাপ। কিন্তু এর ফাঁকে ফাঁকে আবার ট্র্যাজেডির করুণ রসও আসে বলে সে রস যেন জল এনে দেয় চোখের পাতায়, বুক ভরে দেয়, নিবিড়তর ব্যথায়– আরও বেশি।
একবার একটি মহিলা তাঁর কাছে এসে বললেন, তাঁর নিশ্চয়ই ক্যানসার হয়েছে। ডাক্তার তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন ভিন্ন ভিন্ন ল্যাবরেটরিতে যেখানে আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোগের জাতগোত্রের বিচার হয়। নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁরা সবাই একবাক্যে সমস্বরে বললেন, ‘ক্যানসার নয়’।
সব শুনে মহিলাটি মাথা নেড়ে বললেন, ‘না, হ্যের প্রফেসর, এটা ক্যানসারই বটে।’
মহিলাটি কয়েক দিন পর আবার এসে ক্যানসারের ফরিয়াদ করলেন। আবার গোড়ার থেকে তাবৎ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হল, আবার নির্ধন্দুনেতিবাচক উত্তর এল। এই করে করে ছ মাস ধরে মহিলাটি আসেন– তাঁর মনে কোনও সন্দেহ নেই, তাঁর উদরবেদনা ক্যানসারজনিত।
শেষটায় জাওয়ারব্রুখ স্থির করলেন, কাটাই যাক পেট। মাদামকে তখন বলতে পারবেন, স্বচক্ষে দেখেছি পেটে কোনও ক্যানসার নেই। কিংবা হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, অনেক বর্ষীয়সী মহিলার এই অপারেশন-মেনিয়া থাকে; হয়তো তারা আপন জানা-অজানায় সেন্টার অব অ্যাট্রাকশন বা কৌতূহলের কেন্দ্র হতে চান। তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য তৈরি করা হল।
তার পর কবিরাজ জাওয়ারব্রুখ যা বলেছেন তার মোদ্দা কথা : ‘আমরা তো নিশ্চিন্ত মনে পেট খুললুম। সর্বনাশ! এ কী দেখি! পেট-ভর্তি ক্যানসার! এবং এখন যে চরমে পৌঁছেছে সে অবস্থায় অপারেশনের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। সন্তপ্তচিত্তে আমরা পেট সেলাই করে দিলুম। মহিলা সম্বিতে ফিরলে আমি তাঁকে বললুম, ‘হ্যাঁ, ক্যানসারই ছিল; আমরা সেটা কেটে সরিয়ে দিয়েছি।’
জাওয়ারব্রুখ তার পর বললেন, ‘মহিলাটি প্রথম যেদিন আমার কাছে এসেছিলেন তার সঙ্গে সঙ্গে যদি অপারেশন করতুম, তবে হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতুম। কিন্তু প্রশ্ন, আধুনিকতম বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি যখন নঞর্থক উত্তর দেন, তখন শুধুমাত্র রোগীর অনুমানের ওপর নির্ভর করে পেট কাটা যায় কী প্রকারে?’
জাওয়ারব্রুখ সম্বন্ধে ভবিষ্যতে আপনাদের কাছে আরও নিবেদন করার বাসনা রইল। কিন্তু আমার বিশ্বাস, কোনও বাংলাভাষী সার্জন সেটা করলেই ভালো হয়; আমার মতো আনাড়ি তা হলে অনধিকার প্রবেশ থেকে নিষ্কৃতি পায়।
কলকাতা ও বোম্বাইয়ে যেসব ক্যানসার প্রতিষ্ঠান আছে, তাঁরা মাঝে মাঝে খবরের কাগজে বিবৃতি প্রকাশ করে সাধারণ জনকে সাবধান করে দেন, শরীরে কোনও কোনও আকস্মিক বা মন্দগতিতে বর্ধমান পরিবর্তন দেখলে ক্যানসারের সন্দেহ করতে হয়। এগুলো আমি সর্বদাই শ্রদ্ধা ও মনোযোগ সহকারে পড়ি।
ঠিক ওই একই সুবাদে প্রফেসর ডক্টর গেহাইমরাট জাওয়ারব্রুখ অবতরণিকা হিসেবে কয়েকটি কথা বলেছেন এবং আপন বক্তব্য বোঝাতে গিয়ে এমন একটি অত্যুৎকৃষ্ট বিরল তুলনা দিয়েছেন, যেটি ব্যবহার করতে পারলে যে কোনও যশস্বী সাহিত্যিকও শ্লাঘা অনুভব করবেন। বৈদ্যরাজ যা বলেছেন, তার নির্যাস : অধিকাংশ রোগই কোনও না কোনও সাবধানবাণী, ইঙ্গিত, ওয়ার্নিং দিয়ে আসে। যেমন, সামান্য মাথা ধরল– সেইটে ওয়ার্নিং পরের দিন জ্বর হল। কিন্তু ক্যানসার কোনও ওয়ার্নিং তো দেয়ই না, বরঞ্চ সে নিতান্ত নিরপরাধীর মতো দেখা দেয়। যেমন, আপনার জিভে একটি দানা দেখা দিল। সেটাতে কোনও বেদনা নেই, আপনার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না, আপনি ভাবলেন, এরকম তো কত দানা এখানে-সেখানে দেখা দেয় আবার মিলিয়ে যায়, এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার বা চিকিৎসকের কাছে যাবার কোনও প্রয়োজন নেই। তার পর সেটা অতি ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল, কিন্তু কোনও বেদনা বা অস্বস্তি নেই বলে আপনি তখনও কোনও প্রতিকার করলেন না। তার পর একদিন ঢোক গিলতে, খাবার গিলতে আপনার অসুবিধা হতে লাগল। আপনি তখন গেলেন ডাক্তারের কাছে, কিন্তু হায়, ততদিনে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে, তখন আর অপারেশন করা যায় না। আপনি যদি, দানা যখন ছোট ছিল, তখন আসতেন, তবে সার্জন আপনাকে অনায়াসে ক্যানসারমুক্ত করতে পারতেন– অবশ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর। তাই জাওয়ারব্রুখ বলছেন, ‘দানাটি আদৌ অপরিচিত শত্রুরূপে বেদনা যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে এল না। ক্যানসার এল যেন আপনার কোনও বন্ধুজনের চেহারার সঙ্গে হবহু মিলিয়ে একটি মুখোশ তৈরি করে সেটা পরে। তার পর কাছে এসে হঠাৎ মুখোশ সরিয়ে ফেলে আপনার বুকে মারল ছোরা!’
এরপরই অধ্যাপক কতকগুলো চিহ্নের উল্লেখ করেছেন– এগুলোকে তিনি ওয়ার্নিং বলেননি বটে, কিন্তু সেগুলো দেখলেই তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। জিভেতে বা অন্য কোথাও দানা বা ওই-জাতীয় বস্তু বা পরিবর্তন, কণ্ঠস্বর অকারণে কর্কশ হয়ে যাওয়া, আপনার পেটের অসুখ ছিল না– হঠাৎ আরম্ভ হল দিনের পর দিন পেট খারাপ হতে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এটা আমার অনধিকার প্রবেশ। আপনার উচিত, আমাদের যে কোনও ক্যানসার প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সুলিখিত প্রামাণিক বিবৃতি সংগ্রহ করা! বিবৃতিতে সব ক’টা চিহ্নের পরিপূর্ণ (exhaustive) লিস্ট থাকে। আমি এযাবৎ যা লিখেছি সেটা ভুলে গিয়ে ওই বিবৃতি মন দিয়ে পড়বেন। কারণ, এগুলো আমাদের জন্যই লেখা ডাক্তারদের জন্য নয়—(২)
