***
এসব সম্ভব বাপের বাড়ির ফরাইজের জোরে।
তাই সেটি সে কখনও হাতছাড়া করে না। লোভী স্বামী যতই চোটপাট করুক না কেন।
হিন্দু মেয়েরা একটু চিন্তা করে দেখবেন।
২৭।১১।৬৫
———-
১. লেখকের মনে ঈষৎ সন্দেহ আছে, এস্থলে ভাই বোধ হয় বোনকে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দিচ্ছে। বোনকে সচরাচর নাইওর নেওয়া হয় অঘ্রাণ মাসে ধান কাটার পর। কিন্তু আমি সঠিক বলতে পারব না। কারণ দেশ ছেড়েছি দুই যুগ পূর্বে।
ফের্ডিনান্ট জাওয়ারব্রুখ
বৈদ্যরাজ জাওয়ারব্রুখকে নিয়ে আবার সুইজ-জর্মন কাগজে বাদ-প্রতিবাদ আরম্ভ হয়েছে। প্রথম দলের বক্তব্য, সত্যই বৃদ্ধ বয়সে তার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছিল; অন্য দলের বক্তব্য তিনি পূর্ব-বার্লিনের সোভিয়েত কূটনীতির বলির পাঁঠা হয়েছেন। বার্লিনের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল শারিতে; (charite- চ্যারিটি খয়রাতি) প্রতিষ্ঠানের তিনি অধ্যক্ষ ছিলেন, এবং বার্লিন ভাগাভাগির পর শারিতে পড়েছিল পূর্ব-বার্লিনে, রাশান আওতায়।
এই কলকাতা শহরের অন্তত একজন খ্যাতনামা চিকিৎসককে আমি চিনি, যিনি জাওয়ারব্রুখের শিষ্য। তিনি মুনিকে তাঁর কাছে বুকের যক্ষ্মার অপারেশন শেখেন– জাওয়ারব্রুখ বহু বৎসর মুনিক হাসপাতালেরও বড় কর্তা ছিলেন। এছাড়া তাঁর অন্যান্য শিষ্যও হয়তো কলকাতায় আছেন। অবশ্য বুকের, মাথার ও ক্যানসারের সার্জারি নিয়েই যাদের কারবার তাঁরাই জাওয়ারব্রুখের গবেষণার সঙ্গে অল্পাধিক পরিচিত।
জর্মন সার্জন-সমাজ মনে করেন, পৃথিবীর তিনজন সার্জনের নাম করতে হলে জাওয়াব্রুখের নাম কালানুক্রমে তৃতীয়। অন্য দু জন বোধ হয় হিপপোক্রাতেস ও নেপোলিওনের সার্জন–কিন্তু আমি কি চিকিৎসাশাস্ত্র, কি সে শাস্ত্রের ইতিহাস কোনওটারই বিন্দুবিসর্গ জানিনে বলে হলপ খেয়ে কিছুই বলতে পারব না। তদুপরি এ ধরনের নির্ঘন্ট নির্ণয় সব সময়ই কিঞ্চিৎ উদ্দাম হয়ে থাকে– যেরকম পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্য নির্ণয়ে ভিন্ন লোক ভিন্ন নির্ঘণ্ট দেয়।
অতএব অতিশয় সারবান আপত্তি উঠতে পারে, চিকিৎসা-শাস্ত্রের কিছুই যখন আমি জানিনে, তখন হাতের নাগালের বাইরে যে শল্যরাজ জাওয়ারব্রুখ বিরাজ করছেন, তাঁর প্রতি আমি উদ্বাহু হয়েছি কেন? উত্তর অতি সরল। এই শল্যরাজ মৃত্যুর পূর্বে একখানি নাতিবৃহৎ আত্মজীবনী লেখেন–বস্তৃত পুস্তকখানি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর এবং সেটি আদৌ শল্যরাজ বা বৈদ্য-সম্প্রদায়ের উদ্দেশে রচনা হয়নি; রচনা হয়েছে আপনার-আমার মতো মামুলি জনের জন্য। এমনকি সে পুস্তকে ক্যানসার সম্বন্ধে তাঁর দীর্ঘ জীবনব্যাপী গবেষণার ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ যে প্রবন্ধটি উদ্ধৃত করেছেন, সেটিও সাধারণ জনের উদ্দেশে লিখিত, কারণ তিনি সেটি সর্বসাধারণের উপকারার্থে জর্মন রেডিও থেকে বেতারিত করেন। অতি সরল জর্মনে, সর্বপ্রকারের চিকিৎসাসংক্রান্ত পারিভাষিক শব্দ সযত্নে বর্জন করে তিনি এই বেতার-ভাষণটি নির্মাণ করেছিলেন বলে সেটি জর্মনবালকেও বুঝতে পারে– বাংলায় অনুবাদ করলে বঙ্গবালকও বুঝতে পারবে।(১)
কিন্তু এইটেই সর্বপ্রধান বা সর্বশেষ তত্ত্ব নয়। তাঁর আত্মজীবনীর সাহিত্যিক মূল্য আছে, এবং তার লেখার ভিতর দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে তাঁর হাস্যকৌতুকোজ্জ্বল নীল চোখ দুটি প্রকাশ পায়। তার সামান্য একটি উদাহরণ দিই।
ব্যঙ্গরস অতিশয় প্রাচীন রস– করুণ ও বীর রসের সমবয়সী সে। প্রাচীনতম গ্রিক সাহিত্যে তার ভূরি ভূরি নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু অসূয়া সে রসের উৎস বলে আমাদের রসপ্রিয় মনও সেটা সব সময় গ্রহণ করতে পারে না। বিশুদ্ধ হাস্যরস যেটা সৃষ্টি করার জন্য কাউকে পীড়া দিতে হয় না, নট অ্যাট দি কসট অব এনি ওয়ান– আপনার আনন্দে উচ্ছল এবং সেটা ব্যঙ্গরসের বহু পরবর্তী যুগের রস। এবং আমার ব্যক্তিগত শাবাসি সেই হাস্যরসের, সেই ব্যঙ্গরসের উদ্দেশে যেখানে রসস্রষ্টা নিজেকে নিয়ে নিজে হাসেন, নিজেকে ব্যঙ্গ করেন, লাফট অ্যাট হিজ ওন কষ্ট। তারই একটি উদাহরণ দিই :
জাওয়ারব্রুখ বলেছেন, তাঁর সময়কার এক বিখ্যাত চিকিৎসাশাস্ত্রের অধ্যাপক ছাত্রদের মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষা নেওয়ার পর প্রতিবারেই অতিশয় গম্ভীর কণ্ঠে বলতেন, ‘এই পৃথিবীতে বিস্তর গর্দভ নিজেদের ডাক্তাররূপে পরিচয় দিয়ে নির্ভয়ে অগুনতি লোক মেরে বেড়াচ্ছে; তার ওপর যদি আরও একটা গর্দভ বাড়ে তাতে করে কণামাত্র ক্ষতি বৃদ্ধি হবে না। তুমি পরীক্ষা পাস করলে।’ জাওয়ারব্রুখও তাই তার যুগের শিক্ষার্থীদের সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন না। কিন্তু অন্তত একবার তাঁর শিক্ষা হয়ে যায় এ বাবদে। জাওয়ারব্রুখ লিখছেন, সকাল দশটায় তিনটি ছেলে আসবে আমার কাছে ভাইভা দিতে। আমি নার্সকে বললুম, ক্যান্ডিডেটরা এলে অমুক রোগীকে পাঠিয়ে দিয়ে তার পেটে ছিল টিউমার। ওরা এলে আমি কাগজপত্র দস্তখত করতে করতে একজনকে বললুম, রুগীকে পরীক্ষা করে বলতে হবে তার কী হয়েছে। আমি কাজে ডুব মারলুম। দশ মিনিট পরে শুধালুম, “কী হল?” ছেলেটা ভয়ে ভয়ে বললে, “কিছুই তো পেলুম না স্যার।” আমি হুঙ্কার দিয়ে বললুম, “গেট আউট”- আর নামে দিলুম ঢ্যারা কেটে। তার পর একই আদেশ দিলুম দু নম্বর ক্যান্ডিডেটকে। একেও যখন শুধালুম, কী পেল সে– সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে একই উত্তর দিল। ছাড়লুম আরেক হুঙ্কার, কাটলুম আরেক ঢ্যারা। এবারে তিন নম্বরের পালা। সে-ও যখন ফেল মারলে তখন আমি ছাড়লুম শেষ হঙ্কার। এ ছেলেটি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হাওয়া না হয়ে শান্ত কণ্ঠে বললে, “তা হলে আপনি দেখান না স্যার, কী হয়েছে।” কী! এত বড় আস্পদ্দা! দেখাচ্ছি! লম্ফ দিয়ে গেলুম রুগীর কাছে, পেটে দিলুম হাত। ও হরি! কোথায় টিউমার? ভুলে অন্য লোক পাঠিয়েছে নার্স! তখন শুরু হয় আমার আর্তরব। “আরে, আরে, কোথায় গেল সেই দুই ক্যান্ডিডেট। নিয়ে এসে তাদের।” এ স্থলে সে ক্যান্ডিডেট বিশ্ববিখ্যাত জাওয়ারব্রুখকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল, তাকে বোধ হয় আর কোনও পরীক্ষাতে না ফেলে সঙ্গে সঙ্গে পয়লা নম্বরি ডিগ্রি দেওয়া উচিত।’
