আরও একটা কারণ আছে। মুসলমান মেয়ে মাত্রই আশা করে, সে যেন বছরে অন্তত একবার তার বাপ-মা, ভাইবোন, ছেলেবেলার পাড়াপ্রতিবেশীকে দেখতে যেতে পায়। এস্থলে স্মরণ করিয়ে দিই, বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান মেয়ের নাম-পদবি বদলায় না। মুসলমান বিবাহ অনেকটা সিভিল ম্যারিজের মতো কন্ট্রাক্ট ম্যারিজ– সেক্রেমেন্টাল নয়। অপরাধ যদি
নেন, তবে উল্লেখ করি, আমার পিতার নাম ছিল সৈয়দ সিকন্দর আলী। অথচ আমার মা চিরকালই নাম সই করেছেন, আমতুল মন্নান খাতুন চৌধুরী। মিসেস আলী, মিসেস সৈয়দ বা বেগম আলী এসব হালে ইংরেজের অনুকরণে হয়েছে।
***
এবারে গরিব দুঃখী চাষিবাসীদের একটি উদাহরণ দিই। পূর্ব বাংলার।
মনে করুন চাষা কেরামতুল্লা মারা গেছে। তার মেয়ে জয়নবের বিয়ে হয়েছে বেশ দূরে ভিন গাঁয়ে। জয়নবের বাল্যাবস্থায় তার মা মারা যায় বলে কেরামতুল্লা দুসরা শাদি করেছিল। সে পক্ষের ছেলে আকরম বিধবা মাকে নিয়ে, বিয়ে করে মোটামুটি সুখে-স্বচ্ছন্দেই আছে। সৎ-বোনকে আর স্মরণেই আনে না। তার মা-ও সতীনের মেয়ে জয়নবকে দু চোখে দেখতে পায় না। অতএব জয়নব বেচারি বাপের বাড়ির মুখ দেখতে পায় না। জয়নবের শ্বশুরবাড়ির গায়ের লোকে তাই নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা করে। ওদিকে লোভী স্বামীও বলে, ‘ফরাইজ চেয়ে নে।’
জয়নব বেচারি তখন যদি দৈবযোগে বাপের গাঁয়ের কাউকে পেয়ে যায় তখন তাকে দিয়ে ভাইকে খবর পাঠায় তাকে যেন এসে বাপের বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যায়– একেই বলে ‘নাইওর’ যাওয়া। ভাই খবর পেয়েও গা করে না।
আর সৎমা’র তো কথাই নেই। বেচারি জয়নব একাধিকবার খবর পাঠিয়ে হয়রান হয়ে গেল। ওদিকে বাপের গাঁয়ের লোক তো আর তার শ্বশুরের গায়ে নিত্যি নিত্যি আসে না যে নিত্যি নিত্যি খবর পাঠাবে।
তখন সে ধরে অন্য পন্থা। নদীতে জল আনতে গিয়ে সুযোগ পেলেই সময় কাটায় বিস্তর। এবং স্বভাবতই তার গাঁয়ের সব মাঝিদের সে চেনে। তাদের কাউকে দেখতে পেলে পাড়ে বসেই চিৎকার করে আর ফরিয়াদটি জানিয়ে দেয়। সবিস্তারে বলতে হয় না– সবাই সব খবর জানে।
তাতেও যদি ওষুধ না ধরে, তখন সে ধরে রুদ্রমূর্তি।
শাসিয়ে দেয়, তাকে নাইওর না নিয়ে গেলে সে ফরাইজের মোকদ্দমা করবে।
এইবার ভাইয়ের কানে কিঞ্চিৎ জল যায়। তা-ও পুরোমাত্রায় না। ইতোমধ্যে গায়ের মুরুব্বিদের কানেও তাবৎ ফরিয়াদ পৌচেছে– বিশেষত সেই সব বৃদ্ধদের কানে যাঁরা বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন। তারা তখন ছোকরাকে বুঝিয়ে বলেন, ‘তোর আছে কুল্লে আড়াই বিঘত জমি– আচ্ছা, তর না হয় কিছুটা গেল; কিন্তু তোর বসতবাড়িতেও যে ছুঁড়ির হিস্যে রয়েছে। সেইটেও তুই লাটে তুলবি নাকি? যা, যা, বোনকে নিয়ে আয়।’
আমি এতক্ষণ যা বললুম, এসব পূর্ব-বাংলার লোকসঙ্গীতেও আছে। তারই একটির শেষ দুই লাইনে আছে,
“থাকো গো বোন, থাকো গো বোন,
কিলগুঁতা খাইয়া,
আষাঢ়(১) মাসে লইয়া যাইমু
পঙ্খীরাজ ওড়াইয়া ॥”
ভাই নৌকা নিয়ে আসার খবর পাওয়া মাত্রই বোন লেগে যায় নানারকম মিষ্টি পিঠে বানাতে। শাশুড়ি গজর গজর করে, কিন্তু জা-রা তো একই গোয়ালের গাই, তারা সাহায্য করে।
নৌকা এল। বোন সগর্বে হাঁড়ি-ভর্তি মিঠে পিঠে নিয়ে নৌকায় চাপলো। গাঁয়ের মেয়েরা এখন আর তাকে খোঁটা দিতে পারবে না। এ তো সতীর নিঃসঙ্গ হিমালয়-যাত্রা নয়।
***
বুদ্ধিমতী মেয়ে বলে বাপের বাড়ি গিয়ে জয়নব পাড়াময় চর্কিবাজি মেরে দিন কাটায় না। অবশ্য সর্বপ্রথম মিঠে পিঠে নিয়ে আত্মীয়-স্বজন, সইটইদের সঙ্গে দেখা করতে যায়, কিন্তু তার পরই লেগে যায় নতুন ধানচাল যা উঠেছে তার দুরুস্ত ব্যবস্থা করতে। অবশ্য একথাও ঠিক, কেউ তা সে যে কোনও স্ত্রী-পুরুষই হোক, যদি সুবো-শাম বেঘোরে ঘুমোয় তবে লোকে প্রবাদটা বলে, ‘দেখো খোদার খাসিটা ঘুমুচ্ছে যেন “নাইওরি-মাগীটার” মতো!’
এই করে করে ‘নাইওর’ বাস যখন শেষ হয়, তখন বাপের বাড়িতে আবার মিঠে পিঠে তৈরি আরম্ভ হয়– এগুলো নিয়ে যাবে শ্বশুরবাড়িতে। ভাই অন্তত একখানা শাড়ি, একটি কুর্তা কিনে দেবে বোনকে– জামা-ফ্রক ভাগ্নিকে।
জয়নব কিন্তু ধান ভানা-কোটাতে এমনই সাহায্য করে যেন ভাই, সত্য ফ্রি চিপ-লেবারের প্রলোভনে তাকে আসছে বছর নিজের থেকেই নাইওর’ নিয়ে আসে– ফরাইজের মোকদ্দমার শাসানি যেন মাঝি-মাল্লা মারফত না পাঠাতে হয়। শ্বশুরবাড়ি ফিরে জয়নব আবার দেমাক করে, আমি মাগনা খাইনে পরিনে। যদ্দিন ওখানে ছিলুম সত্যকে কুটোটি পর্যন্ত কুড়োতে দিইনি!
***
এতক্ষণ যা নিবেদন করলুম এটা হিন্দুদের বেলাও প্রযোজ্য। প্যাটার্ন মোটামুটি একই, তবে তফাৎটা কোথায়?
তফাৎ ওই ফরাইজের হক্ক, ড্যুরেস, ব্ল্যাকমেল (অবশ্য বে-আইনি নয়) দিয়ে সে বাপের বাড়ি যাবার হক্ক আজীবন জিইয়ে রাখে। স্বামীর সঙ্গে না বলে সেই হক্কের জোরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাপের বাড়ি চলে আসে। অবস্থা চরমে পৌঁছলে সেখানে বসে স্বামীর বিরুদ্ধে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ন্যায্য স্ত্রীধনের মোকদ্দমা লাগায়। কিংবা যদি স্বামীর মৃত্যুর পর ভাশুর-দেওর তাকে অসম্মান করে তবে সে চলে আসে বাপের বাড়িতে, ঠুকে দেয় ওদের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা। এগুলোই আসল তত্ত্ব বলে পুনরাবৃত্তি করলুম।
