ইতোমধ্যে বেতারকেন্দ্রের যে পয়লা-নম্বরি সারেঙ্গিওয়ালা ও ওস্তাদ তবলচি অডিশনিং বয়কট করে কেন্টিনে চা খাচ্ছিল তারা টাটু-ঘোড়ার মতো ছুটে এসেছে সঙ্গত দিতে–কর্তারা এদের অভাবে যে দুটি আকাট যোগাড় করেছিলেন, তারা বহু পূর্বেই গা-ঢাকা দিয়েছে।
ওস্তাদ ধরলেন তোড়ি। আলাপের সময় প্রত্যেকটি ধ্বনি যেন বকুলগাছ থেকে এক একটি ফুল হয়ে এদিক ওদিক ছিটকে পড়তে লাগল। যখন তালে এলেন তখন যেন ফুল নিয়ে সাতলহরা মালা গাঁথতে লাগলেন, প্রিয়ার কুন্তলদামে পরাবেন বলে।
আর সমস্তক্ষণ মুখে কী খুশির ছটা! জানুটা যেন ফুর্তিতে ভরপুর! ক্ষণে সারেঙ্গিলার দিকে মুখ বাড়িয়ে তার বাজনার তারিফ করে বলেন, ক্যা বাৎ, ক্যা বাৎ! ক্ষণে তবলচির দিকে দুই হস্ত প্রসারিত করে হুঙ্কার দেন, শাবাশ, শাবাশ, আফরিন, আফরিন! যেন ওরাই সব জমিয়ে চলছে! ওঁর কোনও কৃতিত্ব নেই।
গান থামল। আনন্দে বিস্ময়ে সবাই এমনই স্তম্ভিত যে পুরো এক মিনিট পরে হর্ষধ্বনি ও সাধুবাদ রব উঠল।
ইতিমধ্যে ‘পরীক্ষক’দের একজন ওস্তাদের সঙ্গী ছোকরা শাকরেদের কাছ থেকে অন্য সকলের অজান্তে সেই ‘ফারাম’খানা চেয়ে নিয়েছে। ওইটেতে পাস না ফেল, কোন হারে দক্ষিণা বেঁধে দিতে হবে সেসব লিখে দিতে হয়।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল, সেখানে প্রশ্ন, আপনি কোন রাগ-রাগিণী জানেন? তার উত্তরে লেখা মাত্র একটি শব্দ : ‘তোড়ি’।
বিস্ময়! বিস্ময়!! এ কখনও হয়!!! পরশু দিনের কাঁচা গাওয়াইয়াও তো লিখত ডজন দুই ওস্তাদ জানেন কত শত, এ তো রসজ্ঞদেরও কল্পনার বাইরে।
অতিশয় বতরিবৎ এবং প্রচুর মাফ চেয়ে সেই ‘পরীক্ষক’টি বৃদ্ধ ওস্তাদকে শুধোলেন– অল্প অবিশ্বাসের স্মিতহাসি হেসে, ‘ওস্তাদ, এ কখনও হয় যে, আপনি একমাত্র তোড়ি ছাড়া আর কিছুই জানেন না?’
সকলের মুখেই প্রসন্ন মৃদু হাস্য। সারেঙ্গি-তবলা মাথা নিচু করে জাজিমের দিকে তাকিয়ে।
যে-কোনও বিদ্যাতেই তোমার যদি অভিমান থাকে তবে, পণ্ডিত পাঠক, এই বেলা তুমি কান পেতে শোনো আমার জীবনে তার উত্তরটি নিবিড় ঘন আঁধারে ধ্রুবতারার মতো জ্বলে তিনি কী উত্তর দিলেন।
ঠণ্ডী সাঁস লে কর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ওস্তাদ বললেন, ‘পচাস সালসে তোড়ি গা রহাহুঁ– অভি ঠিক তরহসে নহি নিকলতি।’
অর্থাৎ পঞ্চাশ বছর ধরে তোড়ি গাইছি। এখনও ঠিকমতো বেরোয় না। অন্য রাগ-রাগিণীর কথা কেন বৃথা শুধোও।
১৬।১০।৬৫
———-
১. প্যারিসে একবার একটি উদ্ধৃষ্ট সঙ্গীতানুষ্ঠান কর্তাদের নেকনজর পায়নি শুনে ভলতেয়ার সেই সঙ্গীতস্রষ্টাকে একটি চৌপদী লিখে সান্ত্বনা জানান, হায়, বড়লোকদের যে কানও বড় হয়’ (অর্থাৎ গাধা)। আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি উদাহরণ জানি। গুণী, ওস্তাদ রবিশঙ্কর তখন দিল্লি-আকাশবাণীর সঙ্গীতাধিনায়ক। গাঁধীর জন্মদিনে সেক্রেটারি তাকে ডেকে হুকুম দেন, ওই উপলক্ষে তিনি গাঁধীর তাবৎ জীবনী– দক্ষিণ-আফ্রিকা, বরদলৈ, উপবাস, সলট-মার্চ-প্রতিফলিত করে যেন নতুন কিছু ‘কম্পোজ’ করেন। বিহ্বল, প্রায়ান্ধ উদ্ভ্রান্তদৃষ্টি রবিশঙ্কর চলেছেন করিডর দিয়ে আমার সঙ্গে আচমকা কলিশন। সম্বিতে এসে আমাকে দেখে করুণ হাসি হেসে তাবৎ বাৎ বয়ান করে শুধোলেন, এ কখনো হয়?’ আমি বললুম, ‘আপনি যখন বাজান তখন আমার মতো সঙ্গীতে আনাড়িরও মনে হয়, আপনার পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। তবে কি না- হেঁ হেঁ হেঁ, সেক্রেটারি বোধ হয় বিলিতি সিমফনি, পাস্তোরাল-টাস্তোরাল বই পড়ে (শুনে নয়) আমেজ করছেন, এ দেশেই-বা হবে না কেন?’ রবি শুধোলেন, করি কী?’ আমি সবিনয়ে বললুম, একটা বাবদ আমার মতো আকাটও একটা সাজেশন দিতে পারে।’ ‘কী কী?’ ‘ওই সল্ট-মার্চের জায়গায় এসে আপনি যন্ত্রের তারগুলোতে করকচ-নুন মাখিয়ে নেবেন।’
ফরাইজ
‘বাপের বাড়ি’, শ্বশুরবাড়ি’, ‘পিতৃগৃহ’, ‘পতিগৃহ’, মুখ্যগৃহ’, ‘গৌণ গৃহ’ ইত্যাকার বহু প্রকার ‘গৃহে’র নবীন নামকরণের প্রস্তাব পত্রান্তরে হয়ে যাচ্ছে। এই সুবাদে মুসলমানদের ভেতরে কী রীতি প্রচলিত আছে সেটা উল্লেখ বোধ হয় সম্পূর্ণ অবান্তর হবে না। কারণ হিন্দু এবং মুসলমান ধর্মের লোকাঁচারে, বিষয়-সম্পত্তি বন্টন বাবদে যতই পার্থক্য থাক না কেন, উভয় ধর্মাবলম্বীরই ভাষা বাংলা এবং মুসলমান মেয়ে বলে ‘বাপের বাড়ি’ ‘শ্বশুরবাড়ি’। তবু একটা ব্যাপারে সামান্য তফাত আছে।
অল্প হোক, বিস্তর হোক, পিতার মৃত্যুর পর মুসলমান মেয়ে বাপের সম্পত্তির কিছুটা হিস্যে পায়। অর্থাৎ পৈতৃক ভদ্রাসনেও তার আইনত অংশ বিদ্যমান থাকে। একেই বলে ‘ফরাইজ’।
কার্যত কিন্তু সে এ ফরাইজ দাবি করে না। এমনকি পতিগৃহে তার লোভী স্বামী যদি তাকে ন্যায্য হক্ক পাওয়ার জন্য ক্রমাগত টুইয়ে দিতে থাকে তবু সে সেটার দাবি করে না, মোকদ্দমা করতেও রাজি হয় না– আর স্বামী নিজের থেকে কোনও দাবি-দাওয়া করতে পারে না, কারণ হক্ক তার স্ত্রীর, তার নয়।
বোন কেন মোকদ্দমা করে না, তার একাধিক কারণ আছে। লোকাঁচারে বাধে (এতে হয়তো কিছুটা প্রতিবেশী হিন্দুর প্রভাব আছে), এবং দ্বিতীয় তার অন্য স্বার্থ আছে। সে যদি তার ন্যায্য পাওনা নিয়ে নেয়, তবে সে অর্থ হয়তো খর্চা হয়ে যাবে, এবং স্বামীর মৃত্যুর পর সে যদি কোনও কারণে অসহায় হয়ে যায় দেবর-ভাশুর তাকে অবহেলা করে তবে তার অন্য আশ্রয় থাকে না। পক্ষান্তরে সে যদি ফরাইজ না নেয়, তবে সেই তারই হক্কের জোরে বাপের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিতে পারে। এমনকি শ্বশুর ভাশুর স্বামীর জীবিতাবস্থায়ও যদি তার ওপর অত্যধিক চোটপাট হয় তবে সে ফরাইজের হক্কে বাপের বা (বাপ মরে গিয়ে থাকলে) ভাইয়ের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিতে পারে।
