একদা ‘গ্রামে গ্রামে এই বার্তা রটি গেল’ যবে যে, বড় কি ছোট তাবৎ সঙ্গীতকাররা পরীক্ষা (এরই ‘ভদ্র’ নাম অডিশনিং) দিয়ে তবে গান গাইবার প্রোগ্রাম পাবেন, তখন পরীক্ষকদেরই একজন আপত্তি তুলে বললেন, ‘বাজারে যাঁদের গ্রামোফোন-রেকর্ড রয়েছে, এবং/কিংবা স্টুডিয়ো-রেকর্ড রয়েছে তাদের আবার অডিশনিং-এর কী প্রয়োজন?’ যাঁদের নেই তাদের কথা আলাদা, কিন্তু তখনকার দিনের আকাশবাণী রাজাধিরাজ স্বাধিকারমত্ত। মোকা যখন পেয়েছেন তখন ছাড়বেন কেন?
তখন, ধরুন, এই লখনৌ শহরে ছোট-বড় তাবৎ গাওয়াইয়া বাজানেওলারা একজোটে স্থির করলেন, তাঁরা পরীক্ষা দেবেন না। তাঁদের আপত্তি, যারা পরীক্ষা নেবে তারাই-বা সঙ্গীত-জগতের কী এমন বাঘ-সিঙ্গি?
আবার বলছি, এটা গল্প।
অবস্থা যখন চরমে তখন দুনিয়ার হালচাল বাবদে সম্পূর্ণ বেখেয়াল, লখনৌয়ের সবচেয়ে বড় ওস্তাদ একদিন ভোরবেলা শিষ্য-সমাবৃত হয়ে রেওয়াজ করতে করতে হঠাৎ শুধোলেন, ‘হ্যাঁ মিয়া, “আডিশনিং আডিশনিং” চারো তরফ লোগ শোরগোল মচা রহে হৈঁ, সো ক্যা বলা?’ (পাঠক, আমার উর্দুজ্ঞান সঞ্চিত হয়েছে কলকাতার পানওয়ালাদের দোকান থেকে– অপরাধ নিয়ো না, বরায়ে মেহেরবানি!) মোদ্দা কথা, তিনি জানতে চাইলেন, চতুর্দিকে যে এই আডিশনিং আডিশনিং রব উঠেছে, সেটা আবার কী বালাই (আপদ, গেরো)।
শিষ্যেরা প্রাঞ্জল ভাষায় সে ‘বালাইয়ের জন্ম’, বয়োবৃদ্ধি ও বর্তমান পরিস্থিতি গুরুকে বুঝিয়ে দিলেন, এবং তাদের কেউই যে এই অপমানকর প্রতিষ্ঠানের সম্মুখীন হবেন না সেটাও জানিয়ে দিলেন।
গুরু তাজ্জব মেনে বললেন, ‘সে কী? ইমতিহান-পরীক্ষা দিতে তোমাদের কী আপত্তি? ভেবে দেখো আমি যখন বিরাট জলসায় গান ধরি তখন কি শেষ কাতারের পানওয়ালাটা পর্যন্ত আমার পরীক্ষা আরম্ভ করে দিয়ে ভাবে না, আমি রসসৃষ্টি করতে পারব কি না, তার দিল ভিজিয়ে নরম করতে পারব কি না? সোজা কথায় বলতে গেলে, মহফিলের সবাই প্রতিবারেই আমার পরীক্ষা নেয়। হ্যাঁ, আত্তা, তারা না বলে পরীক্ষা নেয়, এরা বলে কয়ে নিচ্ছে। তাতে কীই-বা এমন ফারাক?
শিষ্যেরা অচল অটল।
ওস্তাদ হেসে বললেন, ‘মৈঁ তো জাউংগা জরুর!’
শিষ্যেরা বজ্রাহত। আর্তরব ছেড়ে পাঞ্জাবি, যুক্তপ্রদেশি, বাঙালি, হিন্দু, মুসলমান তাবৎ শাগরেদ আরজ করলে, ‘আমরা যাচ্ছি নে ওই সব পাঁ– দের সামনে পরীক্ষা দিতে, আর আপনি যাবেন হুজুর?’
হুজুর বললেন, ‘য়েকিনান– নিশ্চয়ই।’
শিষ্যেরা তখন ‘ফারাম’ ‘form’-এর ভয় দেখালে। তাতে মেলা অভদ্র প্রশ্ন আছে। ওস্তাদ বললেন, ‘সে তো আদমশুমারির সময়ও আমার বুডঢী বিবিকে শুধিয়েছিল, তিনি অন্য কোনও পন্থায় কিছু আমদানি করেন কি না? ওসব বাদ দাও। ফারাম ভর দো।’
***
অডিশনিং-এর দিন টাঙা চড়ে গুরু চললেন, স্টুডিয়োর দিকে। সঙ্গে মাত্র একটি চেলা। বাকি চেলারা চালাকি করে আকাশবাণীকে জানায়নি যে তাদের ওস্তাদ অডিশনিঙে আসছেন– ওদের শেষ ভরসা এপয়েন্টমেন্ট নেই বলে শেষমেশ যদি সবকুছ বরবাদ-ভণ্ডুল হয়ে যায়। অবশ্য এ-কথাও ঠিক, ওস্তাদ ওদের পরীক্ষা দেবার জন্য হুকুম দেননি। নইলে ওরা নিশ্চয়ই অমান্য করত না।
লখনৌয়ের– কথার কথা বলছি– আকাশবাণী সেদিন কারবালার ময়দানের মতো খা-খা করছে। এমন সময় নামলেন গুরু টাঙা থেকে।
আকাশবাণীর ‘চ্যাংড়া’দের যত দোষ দিন, দিন– প্রাণভরে দিন, কিন্তু একথা কখনও বলবেন না, এরা ওস্তাদদের সম্মান করে না। আমার চোখের সামনে কতবার দেখেছি, প্রোগ্রাম এসিসটেন্ট কুলীনস্য কুলীন ব্রাহ্মণসন্তান কী রকম মুসলমান শুরুর পায়ের কাছে কুমড়ো গড়াগড়ি দিচ্ছে, মুসলমান পীরের ছেলে হিন্দু গুরুর পায়ে ধরে বসে আছে। এঁদের অসম্মান করে অবশ্য সেটা ওদের রুচির অভাব– ওপরওয়ালারা যারা সঙ্গীত বাবতে দীর্ঘকর্ণ।(১) ছোকরা কর্মচারীরা তো তন্মুহূর্তেই ওস্তাদকে তাদের চোখের পাতার উপর তুলে নিয়ে ঢুকিয়ে দিল অডিশনিং রুমে যেখানে ‘পরীক্ষক’রা বেকার উকিলদের মতো অনুপস্থিত মাছি মারছিলেন আর নিষ্ফল আক্রোশে আর্টিফিশেল দাঁতে দাঁতে কিড়মিড় খাচ্ছিলেন।
ওস্তাদকে দেখে তাঁরা স্তম্ভিত! এ কী কাণ্ড! যে-সব আনাড়ি ছোকরা গাওয়াইয়ারা দিনকে দিন বেতারকেন্দ্রের ছারপোকা-ভর্তি বেঞ্চিতে বসে দশ রুপেয়ায় প্রোগ্রামের জন্য ধন্না দেয় তারা পর্যন্ত আসেনি অডিশনিঙে– আর এই ওস্তাদের ওস্তাদ লখনৌয়ের কুবৃমিনার, তানসেনের দশমাবতার তিনি এসে গেছেন– এ যে অবিশ্বাস্য, বিলকুল গয়ের মুমকিন তিলিস্মাৎ।
একথা অনস্বীকার্য তাঁরা ওস্তাদকে প্রচুরাধিক ইজ্জৎ দেখিয়ে ইসতিকবাল (অভ্যর্থনা) জানালেন, সর্বোত্তম তাকিয়াটি তাঁর পিছনে চলন দিলেন। ওস্তাদের মুখ যথারীতি পানে ভর্তি ছিল। একটি ছোকরা ছুটে গিয়ে ওগলদন (পিকদান) নিয়ে সামনে ধরল।
কেউ কিছু বলার পূর্বেই ওস্তাদ বললেন, ‘সব যব জমগয়ে তব কুছ হো জায়–’ অর্থাৎ সঙ্গীতামোদীরা যখন একজোট হয়ে গিয়েছি তখন হোক কিঞ্চিৎ গাওনা-বাজনা! সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। নইলে কে তাঁকে সাহস করে পরীক্ষা দিতে বলত? ওস্তাদ সবিনয় শুধোলেন, কী গাইব?’ তার স্বরে চিৎকার উঠল, ‘সে কী, সে কী? গজব কি বাৎ! আপনার যা খুশি!’ (সাধারণ পরীক্ষার্থী জানে, এদের মামুলি পেশা বিৎকুটে, অচেনা রাগ বৎখৎ তালে গাইবার আদেশ দেওয়া )
