ঘণ্টা পড়তে আস্তে আস্তে উঠলেন। ফ্রলাইন উরজুল তাঁকে পুনরায় ওভারকোট পরিয়ে দিলেন। ধীরে মন্থরে করিডরে নামালেন।
আমি উরজুলকে বললুম, ‘এ কী কাণ্ড! গণ্ডাখানেক রেকটরকে ইনি গাধা-বলদের সঙ্গে–?’
“ওহ্! এরা সবাই এসব জানেন। এঁরা সবাই তার ছাত্র।’
‘ওঁকে ছুটি দেয় না কেন?’
‘সক্কলেরই বিশ্বাস, সঙ্গে সঙ্গে তিনি পটল তুলবেন বলে। মাধ্যাকর্ষণ নয়, দর্শনাকর্ষণ তাকে ইহলোকে আটকে রেখেছে।’
এখানে রোল-কল হয় না। টার্মের গোড়াতে ও শেষে আপন আপন স্টুডেন্টস বুকে অধ্যাপকের নাম দু বার সই করিয়ে নিতে হয়।
গোড়ার দিকে ভিড় ছিল বলে হালকা হলে পর আমি আমার বুক’ নিয়ে পাতলুম। এযাবৎ অন্য কারও সঙ্গে তিনি বাক্যবিনিময় করেননি। আমাকে দেখে চেয়ারে আরামসে হেলান দিয়ে বললেন, “আহ! বাহ্ বাহ্! তার পর? আচ্ছা। বলুন তো আপনি কি জর্মন বেশ বুঝতে পারেন?’
আমি বললুম, ‘অল্প, অল্প।’
‘বেশ, বেশ। তা– তা, আমি কোন দেশ থেকে এসেছেন?’
‘ইন্ডিয়া।’
কেন যে এতখানি তাজ্জব হয়ে তাকালেন বুঝতে পারলুম না। বললেন, ইন্ডিয়া? কিন্তু ইন্ডিয়াই তো দর্শনের দেশ। আপনি এখানে এলেন কেন?’
আমি সবিনয়ে বললুম, ‘নিশ্চয়, কিন্তু আধুনিক দর্শনে জর্মনির সেবা ও দান তো অবহেলার বিষয় নয়।’
কী আনন্দে, কী গর্বে অধ্যাপকের সেই কাটাকুটি-ভরা মুখ যেন প্রসন্ন হাস্যে ভরে গেল, সেটি অবর্ণনীয়। শুধু মাথা দোলান আর বলেন, ‘বস্তুত তাই, প্রকৃতপক্ষে তাই।’
এবারেও যখন তিনি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করলেন তখন আমি যে ‘তুমি’ শুনতে পেলুম। তার বিরাট সাদা মাথাটা আমার দিকে ঠেলে কাছে এনে বেদনা-ভরা গলায় বললেন, কিন্তু জানো, ভারতীয় দর্শন– অবশ্য সব দর্শনই দর্শন– শেখবার সুযোগ আমি পাইনি। ব্যাপারটা হয়েছে কী, আমার যৌবনে ভারতীয় দর্শনের জর্মন-ইংরেজি অনুবাদ পড়তে গিয়ে দেখি সব পরস্পরবিরোধী বাক্যে পরিপূর্ণ। আমি বললুম, “এ কখনই হতে পারে না। ভারতের জ্ঞানী। ব্যক্তিরা এরকম কথা বলতে পারে না। যারা অনুবাদ করেছেন তাঁরা কতখানি জর্মন জানেন জানিনে, কিন্তু দর্শন জানেন অত্যল্প, এবং ভারতীয় দর্শনে তাদের অপরিচিত যে দৃষ্টিভঙ্গি, দৃষ্টিকোণ সেটা আদৌ বুঝতে পারেননি।” ছেড়ে দিলুম পড়া, বিরক্তিতে। কিন্তু জানো, বছর দশেক পূর্বে আমার ছাত্র–’ তিনি রেকটরের নাম করলেন—‘অমুক ভারি ব্রিলিয়ান্ট ছেলে আমাকে বললেন, এখন নাকি কম্পিটেন্ট অনুবাদ বেরুচ্ছে। কিন্তু ততদিন আমি বড় বুড়িয়ে গিয়েছি। নতুন করে নতুন স্কুলে যাবার শক্তি নেই। বড় দুঃখ রয়ে গেল।’
আমি একটু ভেবে যেন সান্ত্বনা দিয়ে বললুম,’ তার জন্য আর অত ভাবনা কিসের, স্যার? হিন্দুরা পরজন্মে বিশ্বাস করে। আপনি এবারে জন্ম নেবেন কাশীর কোনও দার্শনিকের ঘরে।’
এবার তাঁর যে কী প্রসন্ন অট্টহাস্য! শুধু বললেন, ‘ওই তো! ওই তো! বাহ্ বাহ্! বেশ, বেশ। যাক, শেষ দুশ্চিন্তা গেল।’
তার পর শুধালেন, ‘বক্তৃতা সব বুঝতে পার তো?’
আমি বললুম, ‘আজ্ঞে, জর্মন ভালো জানিনে বলে মাঝে মাঝে বুঝতে অসুবিধে হয়।’
অধ্যাপক বললেন, ‘তখন হাত তুলো; আমি সব ভালো করে বুঝিয়ে বলব।’
আমি কাঁচু-মাঁচু হয়ে বললুম, ‘আমার জর্মন জ্ঞানের অভাববশত সমস্ত ক্লাস সাফার করবে– এটা কেমন যেন–’
গুরু গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বললেন– প্রত্যেকটি শব্দ যেন আমার বুকের উপর হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে– ‘আমি একশ’জনকে পড়াব, না একজনকে পড়াব, কাকে পড়াব আর কাকে পড়াব না, সেটা স্থির করি একমাত্র আমি।’
***
আমার দুর্ভাগ্য, আমি খুব বেশিদিন তাঁর কাছ থেকে শিক্ষালাভের সুযোগ পাইনি। পরের টার্মেই ওপারে চলে যান।
তার পর প্রায় ৩৫ বৎসর কেটে গিয়েছে। আমার ব্যক্তিগত সংস্কার যে, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পৃথিবী নামক জায়গাটিতে একবারের বেশি দু বার পাঠান না। একই নিষ্ঠুর স্থলে একাধিকবার পাঠিয়ে একই দণ্ড দেওয়ার মধ্যে কোনও বৈদগ্ধ্য (রিফাইনমেন্ট) নেই। তবু যখন কোনও যুবাজনের মুখে ভারতীয় দর্শন সম্বন্ধে আলোচনা শুনে মনে হয়, এ-তরুণ এর কিছুটা গভীরে ঢুকতে পেরেছে, তখন আপন অজান্তে তার চেহারায় জর্মনগুরুর বিরাট কাটাকুটি-ভরা, হাঁড়াপানা চেহারার সাদৃশ্য খুঁজি।
পঞ্চাশ বছর ধরে করেছি সাধনা
প্রথমেই নিবেদন জানাই, আকাশবাণীর বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত কোনও ফরিয়াদ নেই। কেন নেই, যখন চৌদ্দআনা পরিমাণ লোকের আছে, এসব তর্কের ভিতর আমি ঢুকতে নারাজ। বিশেষত যখন খুব ভালো করেই জানি, এই বিশ্ব-সংসারটা রিফর্ম করার গুরুভার আল্লা-তালা আমার স্কন্ধে চাপাননি। আমি শুধু আজ আকাশবাণী বাবদে একটি কাহিনী নিবেদন করব। শোনা গল্প। সত্য না-ও হতে পারে। তবে ক্যারেকটিরিস্টিক– অর্থাৎ গল্পটি শুনেই চট করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশবাণীর একটি বিশেষ স্থূলাঙ্গের ছবি।
‘সুনন্দ’ রাগে বিতৃষ্ণায় বিকৃতকণ্ঠে তাঁর জুর্নালে ইন্টারভ্যু নামক প্রতিষ্ঠানটির ব্যঙ্গ করেছেন। হায় রে কপাল! তিনি কখনও ইন্টারভ্যুর রাজার রাজা ‘অডিশনিং’ নামক খাটাশটির দাঁত-ভ্যাংচানি দেখেছেন– ঈভন ফ্রম এ ভেরি লঙ সেফ ডিসটেন্স? তা হলে বুঝতেন ঠ্যালা কারে কয়। আমি স্বয়ং একাধিক ‘অডিশনিং’ বোর্ডের কর্মকর্তা ছিলুম বেশ কিছুকাল ধরে। আমার জানার কথা। কিন্তু আমি এ সুবাদে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একটি কাহিনী কীর্তন করব।
