গুরু-মুর্শিদ, ওস্তাদ-মুরুব্বিদের আশীর্বাদ-দোওয়া আমার ওপর নিশ্চয়ই ছিল; হঠাৎ অর্থটা মাথার ভেতরে যেন বিদ্যুতের মতো ঝিলিক মেরে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে আপন অজান্তে একগাল হেসে বলে ফেলেছি, ‘চেষ্টা তো দিয়েছি, স্যার, দু বচ্ছর ধরে প্রায় প্রতি শনির রাত্রে মাফ করবেন স্যার বলা উচিত রবির ভোরে। তা ওরা ধরতে না পারলে আমি কী করব?–বললে পেত্যয় যাবেন না স্যার–’।
ইতোমধ্যে বুড়ো হঠাৎ ঠাঠা করে হেসে উঠেছেন। যেমন তার গাম্ভীর্য তেমন তার হাসি। বিশেষ করে তার বিরাট গোপজোড়ার একটা দিক নেমে যায় নিচে, তো অন্যটা উঠে যায় উপরের দিকে। সে হাসি আর থামে না। ইতোমধ্যে ছোকরা কেরানিরাও হাসির রগড় দেখে তার চতুর্দিকে এসে দাঁড়িয়েছে। এবারে থেমে বললেন, ‘ধরা দেবার চেষ্টা করলে, আর ওরা ধরতে পারল না, এটা কী রকম কথা?’
আমি বললুম, ‘যে-পুলিশ আরেকটু হলে ধরতে পারত, তাকে সাক্ষী স্বরূপ হাজির করতে পারি যে, আমি চেষ্টার ত্রুটি করিনি, এই জেলে যাবার সার্টিফিকেট যোগাড় করার।’
সংক্ষেপে বললেন, ‘খুলে কও।’
আমি সেই প্রকৃতির লোক যারা নার্ভাস ব্রেকডাউনের ভাঙন থেকে পড়ি-পড়ি করতে করতে বেঁচে গিয়ে হঠাৎ নিষ্কৃতি পেয়ে হয়ে যায় অহেতুক বাঁচাল।
সে-ও আরেক রকমের নার্ভাসনেস্। গড় গড় করে বলে গেলুম, পুলিশের সেই জাল পাতার কাহিনী বিশেষ করে আমার উপকারার্থে—‘পাব’-এর ভিতরকার বয়ান ও সর্বশেষে সেই পুলিশম্যানের সঙ্গে পথিমধ্যে আমার যম-নচিকেতা কথোপকথন। বক্তৃতা শেষ করলুম, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, ‘এরপর এই পরীক্ষায় পড়া নিয়ে বড় ব্যস্ত ছিলুম বলে সলিড কিছু করে উঠতে পারিনি, স্যার। শুধু ওই যে, দিন পনেরো আগে হঠাৎ এক সকালে দেখা গেল লর্ড মেয়ারের বিরাট দফতরের উচ্চতম টাওয়ারে একটা ছেঁড়া ছাতা বাঁধা, বাতাসে পৎপৎ করছে, ফায়ার ব্রিগেড পর্যন্ত নামাতে পারেনি, ওই উপলক্ষে অধীন কিঞ্চিৎ, অতি যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য করতে—’
একজন ছোকরা কেরানি আঁতকে উঠে বললে, ‘সর্বনাশ! ওটার তালাশি যে এখনও শেষ হয়নি!’
বুড়ো বললেন, ‘আমরা তো কিছু শুনছি না।’
বুড়োর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরুতে গেলে তিনি কাউন্টারের ফ্ল্যাপটা তুলে আমার সঙ্গে দোর পর্যন্ত এলেন– পরে শুনলুম, এ-রকম বিরল সম্মান ইতোপূর্বে নাকি মাত্র দু-একজন বিদেশিই পেয়েছেন। আমি কিছু শুধাবার পূর্বেই তিনি যেন বুঝতে পেরে তাঁর মাথাটি আমার কানের কাছে নিচু করে, এবং সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো আঙুলের ডগা বুকে ঠুকে ঠুকে ফিসফিস করে বললেন, ‘আমি তিনবার, আমি তিনবার!’ তার পর অত্যন্ত সিরিয়াসলি শুধোলেন ‘বছর তিনেক পূর্বে এক ডাচ স্টুডেন্ট বললে বুঝতেই পারছ, এ রসিকতাটা আমি শুধু বিদেশি ছাত্রদের সঙ্গেই করে থাকি, সুন্ধুমাত্র জানবার জন্য, তারা কতখানি সত্যকার জর্মন ঐতিহ্যের যুনি ছাত্র হতে পেরেছে। স্টুডেন্টরা নাকি ক্রমেই হারছে!’ কণ্ঠে রীতিমতো আশঙ্কার উৎপীড়ন।
আমি তাঁর প্রসারিত হাত ধরে হ্যান্ডশেক করতে করতে বললুম, ‘তিন বছর পূর্বে, ইয়া। কিন্তু তার পর জানেন তো, আমি আর আপনার মতো মুরুব্বিকে কী বলব, কৃষ্ণতম মেঘেরও রুপালি সীমান্তরেখা থাকে– এল জর্মনিতে অভূতপূর্ব বিরাট বেকার সমস্যা, যেটা এখনও চলছে। ফলে ছেলেরা ম্যাট্রিক পাস করে এদিকে-ওদিকে কাজে ঢুকতে না পেরে বাধ্য হয়ে ঢুকছে য়ুনিতে, আগে যেখানে ঢুকত একজন, এখন ঢেকে দশজন। ওদিকে সরকারের পয়সার অভাবে পুলিশের গুষ্টি না বেড়ে বরঞ্চ কমতির দিকে। আমরা এখন দলে ভারি, বস্তুত আমরা এখন নিশাচরবৃত্তি পরিত্যাগ পূর্বক দিবাভাগেই তাদের সম্মুখসমরে আহ্বান করতে পারি– করি না, শুধু শতাধিক বত্সরের ঐতিহ্য ভঙ্গ হবে বলে।’ তার পর একটু থেমে গম্ভীরতম কণ্ঠে বললুম, আর যদি কখনও সে দুর্দিনের চিহ্ন দেখি, তবে সেই সুদূর ভারত থেকে ফিরে আসব আ-মি। সামনের পরীক্ষায় পাশ করি আর ফেলই মারি, সেই পরাজয় প্রতিরোধ করার জন্য য়ুনিতে ঢুকে ছাত্র হব আবার-আ-মি।
‘আম্মো’।
১।১।৬৬
———-
১. অধীন পারতপক্ষে আপন বইয়ের বরাত দেয় না, কিন্তু এ-স্থলে নিতান্ত বাধ্য হয়ে নিবেদন, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখিত নির্বাসিতের আত্মকথা’র ওপরে মল্লিখিত প্রশস্তি ‘ময়ূরকণ্ঠী’তে পশ্য। তবে অনুরোধ এই, মূল বইখানা প্রথম পড়বেন। তারপর আমার বই পড়ার প্রয়োজন আশা করি আর হবে না।
২. এসব বাবদে জর্মনি-অস্ট্রিয়া একই ধরা হয়। হিটলার নিজে অস্ট্রিয়ান হয়েও জর্মনির ফ্যুরার হয়েছিলেন, এসব তো জানা কথা। উভয় দেশের ভাষাও এক।
৩. এ যুগের ছেলে-ছোকরারা বিদ্যাসাগর পড়ে না। বলতে দোষ নেই যে একদা এক পিতা-পুত্র বিদ্যাসাগর মশায়ের কাছে তাদের দুঃখের কাহিনী শেষ করলে এই বলে, আমাদের দুরাবস্থাটা দেখুন। বিদ্যাসাগর নাকি মুচকি হেসে বললেন, তা সেটা আকার (আ-কার) থেকেই বুঝতে পারছি।
৪. ভিক্টর ঝুগো (Hugo) সম্বন্ধে বলা হয়, একবার এক অখ্যাতনামা কবি যুগোকে তাঁর কবিতার বই পাঠিয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে যুগোর সানন্দ অভিনন্দন এসে পৌঁছল সেই কবির হাতে, তাঁর কাব্যসৃষ্টির অজস্র প্রশংসাবাদ করে ঝুগো শেষ করেছেন এই বলে, ‘হে নবীন কবি, আমি তোমাকে সাদর আলিঙ্গন করে ফ্রান্সের কবিচক্রের আমন্ত্রণ জানাই। তিন দিন পরে বুক-পোস্টে পাঠানো কবির সেই কবিতার বই ফেরত এল তার কাছে। উপরের পিঠে পোস্ট অফিসের রবার স্ট্যাম্পে ছাপ, যথেষ্ট টিকিট লাগানো হয়নি বলে গ্রহণকারী বেয়ারিং হারে ফালতো পয়সা দিতে নারাজ, অতএব প্রেরকের কাছে ফেরত পাঠানো হল।’
দর্শনাতীত
ছন্নের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি বিরাট বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে। সবে এসেছি ‘দ্যাশ’ থেকে– হাইকোর্টটি দেখিয়ে দেবার মতো কোনও খাটাশকে পাচ্ছিনে। কিন্তু রমণীজাতি দয়াশীলা– বেদরদীরা বলে হরবকৎ শিকার-সন্ধানী–আমার সঙ্গে কথা কইলে নিজের থেকে। আমি তখন বিবর্ণ বিস্বাদ বদখদ কোনও এক মাংস, ততোধিক বিজাতীয় হর্স-ক্যাবেজ (সচরাচর এ বস্তু ঘোড়া ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দেওয়া হয়) খাবার চেষ্টা করছি, চোখের জলে নাকের জলে। সব শুনে বললে, ‘দর্শন? তা হলে শ্নিটকে মিস করো না; বুড়ার বয়স আশি পেরিয়ে গেছে, কখন যে পটল তুলবে (জর্মনে বলে ‘আপজেগলেন’) ঠিক নেই।’
