শুধোলে, ‘এখান থেকে ইন্ডিয়া কতদূর?’
আমি বললুম, ‘এই হাজার পাঁচেক মাইল হবে। সঠিক জানিনে, তবে জাহাজে যেতে বারো-তেরো দিন লাগে।’
বললে, ‘বাপ-মা এই পাঁচ হাজার মাইল দূরে পাঠিয়েছে বাদরামি শেখবার জন্যে?’
এতক্ষণে আমার কানে জল গেল। বুঝলুম উইথ রেফারেন্স্ টু দি কনটেকসট যে, লোকটা সেই রাত্রের আমাদের দলের দুষ্কর্ম এবং পরবর্তী লুকোচুরির কথা পাড়ছে। আমি তবু নাক-টিপলে-দুধ-বেরোয়-না গোছ হয়ে বললুম, ‘কিসের বাঁদরামি?’
জৰ্মনে ‘ন্যাকা’ শব্দের ঠিক ঠিক প্রতিশব্দ নেই। কিন্তু যে কটি শব্দ পুলিশম্যান প্রয়োগ করলে তার অর্থ ওই দাঁড়ায়। তার পর নামল সম্মুখ সমরে! বললে, ‘সেরাত্রে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখের আড়াল হয়ে যেতে পেরেছিলে বলে তোমাকে ধরিনি। এবার কিন্তু ছাড়ব না।’
‘অনেক ধন্যবাদ!’ তার পর আমিও রণাঙ্গনে নেমে বেহায়ার মতো বললুম, ‘সে দেখা যাবে।’
যেন একটু দরদী গলায় বললে, ‘কিন্তু কেন, কেন এসব কর?’।
আমি তখন একটু নরম গলায় বললুম, ‘এদেশে কি শুধু য়ুনিতে পড়তেই এসেছি? ওদেশে বসেও তো এ-দেশের বই কিনে পড়া যায়। আমি এসেছি সব শিখতে আর-সব স্টুডেন্টরা যা করে, তাই করি।’
‘সব ছেলে এরকম বাদরামি করে?’
আমাকে বাধ্য হয়ে স্বীকার করতে হল, সবাই করে না।
‘তবে?’
তখন বললুম, ‘ব্রাদার শোনো। এই স্টুডেন্ট বনাম পুলিশ লড়াই সর্বপ্রথম আরম্ভ হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে হাইডেলবের্গে। এখানে আরম্ভ হয় ১৭৮৬-তে। তার পর কয়েক বছর মুনি বন্ধ ছিল– কেন, সঠিক জানিনে, বোধ হয় নেপোলিয়ন তার জন্য দায়ী– ফের য়ুনি খোলার সঙ্গে সঙ্গে ১৮১৮ থেকে। এবারে তুমিই কও, বুকে হাত দিয়ে এই আমরা আজ যারা স্টুডেন্ট, আমরা যদি আজ লড়াই ক্ষান্ত দিই তবে ভবিষ্যৎ-বংশীয় স্টুডেন্টরা ইতিহাসে লিখে রাখবে না—‘অতঃপর বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে একদল কাপুরুষ ছাত্র আগমনের ফলে তাহাদের মধ্যে একটা অপদার্থ ইন্ডিয়ানও ছিল সেই সংগ্রাম বন্ধ হইয়া যায় স্টুডেন্টরা পরাজয় স্বীকার করিয়া লইল।’ তার পর ভারতীয় নাটকীয় পদ্ধতিতে ‘হা হতোস্মি করার পর বললুম, ‘এই যে মহাকবি হাইনে, তিনি পর্যন্ত এখানে–’।
এই করলুম ব্যাকরণে ভুল। বাধা দিয়ে শুধোলে, ‘তুমি তার মতো কবিতা লিখতে পারো?’
নিশারণে সে জিতেছিল না আমি জিতেছিলুম, সেটা সমস্যাময়, সেটাকে ‘ড্র’ বললেও বলা যেতে পারে, কিন্তু দিবাভাগে এই তর্ক-যুদ্ধে আমি হার মেনে বললুম, ‘বাকিটা আর একদিন হবে, ব্রাদার। এখন তোমার নামটা বলো। সেই শনির রাত্রে যেখানে আমাদের প্রথম চারি চক্ষুর মিলন হয়েছিল সেখানেই দেখা হবে। আমি ফোন করে ঠিক করে নেব। এখন চলি, আমার ক্লাস আছে।’
সে হেসে যা বললে, সেটাকে বাংলায় বলা চলে, ‘ডুডু খাবে টামাকও ছাড়বে না। ’
***
এবারে ধরতে পারলে ছাড়বে না– সে তো বুঝলুম। ওদিকে এক মাস পরে আমার পরীক্ষা। তিনটে ভাইভা। শনির রাত জেগে তামাম রোববার শুধু মুখস্থ আর মুখস্থ। হাসি পায় যখন এদেশে শুনি, এখানে বড্ড বেশি মুখস্থ করানো হয়, মুখস্থ না করে কে কবে কোন দেশে কোন পরীক্ষা পাশ করেছে! তা সে পেসতালজির দেশেই হোক আর ফ্রোবেলের দেশ, এই জৰ্মনিতেই হোক। তাই আমাকে আর যুদ্ধে না ডেকে আমাদের ফিলড মার্শেল আমাকে রিজার্ভে রাখতেন। মাত্র এক রাত্রে ডাক পড়েছিল, তবে সেটা শহরের অন্য প্রান্তে। আর একদিন, সেই দৈত্যকুলের ‘প্রহ্লাদ-পো’টির সঙ্গে একটা ‘পাব’-এ বসে দু-দণ্ড রসালাপ করেছিলুম, লোকটি সত্যই অমায়িক।
***
এদেশে পরীক্ষার পূর্বে এত সাতান্ন রকমের কাগজপত্র মায় থিসিস্ ডিনের দফতরে জমা দিতে হয় যে, সবাই শরণ নেয় আনকোরা হালের যে দু দিন আগে পাশ বা ফেল করেছে, তারাই শুধু এসব হাবিজাবির লেটেস্ট খবর রাখে। সেরকম দু জনা অনেকক্ষণ ধরে বসে, দফে দফে একাধিক বার মিলিয়ে নিয়ে এক বান্ডিল কাগজ, ফর্ম, সার্টিফিকেট আমাকে দিয়ে বললে, এইবারে যাও বত্স, ডিনের দফতরে। সব মিলিয়ে দিয়েছি। আর, শোন, সব কাগজের নিচে রাখবে একখানা পাঁচ মার্কের (তখনকার কালে পাঁচ টাকার একটু কম) নোট। এটা কেরানির অন্যায্য প্রাপ্য– কিন্তু পূর্ণ শত বৎসরের ঐতিহ্য।
দুরু দুরু বুকে– প্রায় নার্ভাস ব্রেকডাউনের সীমান্তে পৌঁছে– দাঁড়ালুম গিয়ে ডিনের দতরে, কাউন্টারের সামনে। পাঁচ টাকার চেয়ে বেশিই রেখেছিলুম।
যে কেরানি এসে সম্মুখে দাঁড়ালেন তাঁর অ্যাব্বড়া হিন্ডেনবুর্গি গোঁফ, আর বয়েসে বোধ হয় তিনি মুনির সমান। সাতিশয় গম্ভীর কণ্ঠে আমার গুডমর্নিঙের কী একটা বিড়বিড় করে উত্তর দিয়ে দফে দফে কাগজ গুনলেন, টাকাটা কি কায়দায় যে সরালেন ঠিক ঠাহর করতে পারলুম না। কিন্তু মুখে হাসি ফুটল না। বরঞ্চ গম্ভীর কণ্ঠ গম্ভীরতর করে শুধোলেন, ‘অমুক সার্টিফিকেটটা কই?’
আমি তো সেই দুই যোগানদারদের ওপর রেগে টঙ। পই পই করে আমি শুধিয়েছি, ওরা আরও পই পই করে বলেছে, সব কাগজ ঠিকঠাক আছে, এখন এ কী গেরো রে বাবা! বুঝলুম, কী একটা সার্টিফিকেট আনা হয়নি। কিন্তু সে সার্টিফিকেট কিসের, কোনওই অনুমান করতে পারলুম না। যোগানদারদের মুখেও শুনিনি।
ভয়ে ভয়ে শুধালুম, ‘কী বললেন স্যর!’
এবার যেন নাভিকুণ্ডলী থেকে ফৈয়াজখানি কণ্ঠে কী একটা বেরুল।
