তাই আমার কিন্তু-কিন্তু, তুমি লাইনের উপরের না নিচের, কোন বাক্যটি কাটবে– আমার কাহিনী শুনে। তা সে যাকগে, বলেই ফেলি। কোন দিন আবার দুম করে মরে যাব।
পূর্বেই নিবেদন করেছি, চিতেবাঘ হরিণের পালের গোদাটাকেই সবসময় ধরবার চেষ্টা করে। তারই পিছনে ধাওয়া করে যখন সব কটা এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে পড়ে– শহরের পুলিশও ঠিক সেই রকম আমাদের মতো ‘পিশাচ-সম্প্রদায়ে’র সবচেয়ে হোঁৎকাটাকেই ধরবার চেষ্টা করত, আমরা যখন তাড়া খেয়ে হরিণের টেকনিকই অনুসরণ করে ইদিকের-ওদিকের গলিতে ছড়িয়ে পড়তুম। কিন্তু কিছুদিন পরে আমরা লক্ষ করলুম, একই গোদাকে বারবার শিকার করে পুলিশ যেন আর খাঁটি স্পোর্টসম্যানের নির্দোষানন্দ লাভ করছে না। তখন তারা দুসরা কিংবা তেসরা মোটুকাটাকে ধরবার চেষ্টা করতে লাগল। তাদের ট্রেনিং হচ্ছে, আমোগোরও। কখনও তারা জেতে, কখনও আমরা জিতি। সেই যে গুলিশোর শিকারি বয়ান দিচ্ছিল, ‘তার পর আমি তো ফইর করলুম বন্দুক, আর কুত্তাকেও দিলুম শিকারের দিকে লেলিয়ে। তার পর বন্দুকের গুলি আর কুত্তাতে কী রেস্! কভি কুত্তা কভি গোলি, কভি গোলি কভি কুত্তা!’ আমাদের বেলাও তাই, ‘কভি ইসটুডেন্ট কভি পুলিশ, কভি পুলিশ কভি ইসটুডেন্ট!’ আমার অবশ্য কোনওই ডর ভয় ছিল না। কারণ আমি তখন এমনিতেই ছিলুম বেহ রোগা টিঙটিঙে পাঁচ ফুট সাড়ে ছ ইঞ্চি নিয়ে একশ’ পাঁচ পৌন্ড ওজন অর্থাৎ হোঁৎকা মোটকা জর্মন সহপাঠীদের তুলনায় তো আধটিপ নস্যি! তদুপরি আমি সর্বদাই সুনির্মল বসুর সেই তিরস্কারটি মনে রাখি, ‘বাঙালি হয়েছ, পালাতে শেখনি!’
কিন্তু বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এই রাত্রে দেখি, পুলিশ অন্য ব্যবস্থা করেছে। এতদিন যেই আমি একা হয়ে যেতুম, পিছনে আর বুটের শব্দ শুনতে পেতুম না। সে রাত্রে দেখি, পুলিশ নিতান্ত আমাকেই ধরবার জন্য যে মনস্থির করেছে তাই নয়, আগের থেকে, বেশ সুচিন্তিত ফাইভ ইয়ারস প্ল্যানিং করে যেন জাল পেতেছে। আমি তাড়া খেয়ে যেদিকেই যাই, পিছনে তো বুটের শব্দ শুনতে পাই-ই, তদুপরি দেখি, ওই দূরে গলির মুখে আরেকটা পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে- যেন বিরহজর্জরিত ফিলমের নায়ক প্রোষিতভর্তৃকা নায়িকাকে আলিঙ্গনার্থে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু আমি মহাভারত পড়েছি, জানি, এ আলিঙ্গন হবে ধার্তরাষ্ট্র। অতএব মারি গুত্তা অন্য বাগে।
অনেকক্ষণ ধরে এই খেলা চলল। ইতোমধ্যে আমি কয়েক সেকেন্ডের তরে সব পুলিশের দৃষ্টির বাইরে; এবং সঙ্গে সঙ্গে ঢুকলুম একটা পাবে। ঝটকা মেরে বার থেকে অন্য কারও অর্ডারি এক কাপ কঞ্চি যেন ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে বসলুম, ‘পাব’-এর সুদূরতম প্রান্তে। সঙ্গে সঙ্গে ঢুকল একটা পুলিশ।
খাইছে। এবারে এসে পাকড়াবে। বৈদ্যরাজ চরক বলেন, ‘এ অবস্থায় হরিনামের বটিকা খেয়ে শুয়ে পড়বে!’
সে কিন্তু হাঁপাতে হাঁপাতে প্রথমটায় ‘বার’ কিপারের মুখোমুখি হয়ে আমার দিকে পিছন ফিরে এক গেলাস বিয়ার কিনে একটা অতি দীর্ঘ চুমুক দিলে। আমি বুঝলুম, মাইকেল সত্যই বলেছেন, সীতাদেবীকে রাবণের রাক্ষসী প্রহরিণীরা কোনও গাছতলায় বসিয়ে বেপরোয়া ঘোরাঘুরি করত।
‘হীনপ্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী।
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে’
গদ্যময় ইংরেজিতে যাকে বলে নিতান্তই ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস প্লে’। বরঞ্চ রবীন্দ্রনাথেরটাই ভালো, ‘এ যেন পাখি লয়ে বিবিধ ছলে শিকারি বিড়ালের খেলা!’
এবারে সে গেলাস হাতে করে ‘বার’-এর দিকে পিছন ফিরে আমার দিকে মুখ করে তাকাল।
আমিও অলস কৌতূহলে একবার তার দিকে তাকালুম। ‘পাব’-এ নতুন নিরীহ খদ্দের ঢুকলে যেরকম অন্য নিরীহ খদ্দের তার ওপর একবার একটি নজর বুলিয়ে অন্যদিকে চোখ ফেরায়।
আমি যদিও তখন মাথা নিচু করে কাপের দিকে তাকিয়ে আছি– যেন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে বৈজ্ঞানিক অণুপরমাণু পর্যবেক্ষণ করছেন– তবু স্পষ্ট বুঝতে পারলুম, লোকটা কী ভাবছে। তার পর শুনলুম, ‘গুটে নাখট’! আমি মাথা তুলে দেখি পুলিশ তার বিয়ার শেষ করে ‘পাব’ওয়ালাকে ‘গুডনাইট’ জানিয়ে চলে যাচ্ছে। (জর্মনির অলিখিত আইন, ‘বিয়ার খাবে ঢক ঢক করে, ওয়াইন খাবে আস্তে আস্তে!’)।
ঠিক বুঝতে পারলুম না কেন? তবু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলুম বলিনি। এদের তো রাবণের গুষ্টি। এবার যিনি আসবেন, তিনি এঁয়ার মতো বাপের সুপুত্তুর না-ও হতে পারে। আবার বাইরে যাবারও উপায় নেই। জাল গুটিয়ে সবাই চলে গেছেন, না ঘাপটি মেরে বসে আছেন, কে জানে?
ঘণ্টাখানেক পর যখন ‘পাব’ নিতান্তই বন্ধ হয়ে গেল, তখন দেখি সব ফাঁকা। তবু সাবধানের মার নেই। অকুস্থলের উল্টো মুখে রওনা দিয়ে অনেকখানি চক্কর খেয়ে বাড়ি ফিরলুম ‘তড়পত হুঁ জৈসে জলবিন মীন হয়ে।’
***
তার দু-তিন দিন পর সকালবেলা যখন পাত্তাড়ি নিয়ে য়ুনি (ভার্সিটি) যাচ্ছি, তখন একজন পুলিশ হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে বুটের গোড়ালি গোড়ালিতে ক্লিক করে আমাকে সেলুট দিলে। আমি হামেশাই পুলিশের সামনে ভারি সুবিনয়ী– বার তিনেক ‘গুটেন মর্গেন’ ‘গুটেন মর্গেন’ বললুম, যদ্যপি একবারই যথেষ্ট।
কোনও প্রকারে লৌকিকতা না করে সোজা শুধোলে, ‘তুমি ইন্ডিয়ান?’
তালেবর পুলিশ মানতে হবে! বলেছে ‘ইন্ডার’। ‘ইন্ডিয়ানার’ বা রেড ইন্ডিয়ান বলেনি। এদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত লোকও সে পার্থক্যটি জানে না। বললুম, ‘হ্যাঁ।’–
