পাঠক, তুমি কখনও পোষা চিতাবাঘ দিয়ে হরিণ-শিকার দেখেছ? না দেখারই সম্ভাবনা বেশি, কারণ সেই রাজারাজড়াদের আমলেও এ খেলাটি অস্মদেশে ছিল বিরল। আমাকে। দেখিয়েছিলেন বরোদার বুড়ো মহারাজ।
মহারাজার খাস রিজার্ভ ফরেস্টে ছিল বিস্তর হরিণ, তাদের পিছনে লেলিয়ে দেওয়া হত একটা পোষা, ট্রেন চিতেবাঘ। বাঘ দেখা মাত্রই হরিণের পাল দে ছুট দে ছুট। এবং মাচাঙের উপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পেলুম, একটা সুবিধা পাওয়া মাত্রই তারা দু ভাগ হয়ে গেল, তার পর আবার দু ভাগ, ফের দু ভাগ– করে করে হরিণের পাল আর পাল রইল না, হয়ে গেল চিত্তিরমিত্তির।
কিন্তু আমাদের নেকড়ে মহাশয়টিও অতিশয় সুবুদ্ধিমান। এভাগ ও ভাগকে খামোখা তাড়া করে সে বর্বরস্য শক্তিক্ষয় করল না। সে প্রথম থেকেই তাগ করে নিয়েছে একটা বিশেষ হরিণ। প্রতিবারে পাল যখন দু ভাগ হয়, তখন সে ওই বিশেষ হরিণটার ভাগেরই পিছন নেয়। পরে চিতার ট্রেনার আমাকে বলেছিল, ‘সবচেয়ে যে হরিণটা ধু’মসো, চিতে সবসময়ই একমাত্র ওইটের পিছু নেয়– এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে শক্তিক্ষয় করে না, কারণ চিতে জানে ওইটেই হাঁপিয়ে পড়বে সকলের পয়লা। ধরতে পারলে পারবে ওইটেকেই সব সময় যে পারে তা-ও নয়।’
বন শহরের শুপো সম্প্রদায় ঠিক তাই করলে। আমাদের মধ্যে যে দুটি ছিল সবচেয়ে হোঁৎকা, ওরা প্রতি দু ভাগ হওয়ার সময় ওদেরই পিছু নিল। শেষটায় ধরতে পেরেছিল অবশ্য একজনকে। সে কিন্তু টেওডর নয়, এবং জসট টু কিপ কম্পানি, ছুঁড়েছিল মাত্র নিতান্ত খুদে দু চারটি কাঁকর। তার কথাই আপনাদের খেদমতে ইতোপূর্ব পেশ করেছি।
আগের জমানায় পুলিশ তাকে দিয়ে দিত য়ুনিভার্সিটির হাতে– সে যেত য়ুনিভার্সিটির জেলে। শুনেছি, এস্তক স্বয়ং প্রিনস আউটো এডওয়ার্ড লেওপোল্ড ফন্ বিসমার্ক অবধি। গেছেন। এবং সে তখন জেলের দেওয়ালের উপর পেন্সিলযোগে আপন জিঘাংসা, কিংবা অনুশোচনা, কিংবা মধ্যিখানে, কিংবা কটুবাক্য– যথা যার অভিরুচি-–কভু গদ্যে কভু ছন্দে, সে-ও কী বিচিত্র, কখনও আলেকজেনড্রিয়ান, কখনও– সে কথা আরেকদিন না হয় হবে– লিখত : আমার আমলে আমাদের যেতে হত শহরের জেলে– একদিনের তরে (সে-ও এক মাসের ভিতর দিনটা বাছাই করে নেওয়া ‘আসামি’র এক্তেয়ারেই ছেড়ে দেওয়া হত, বাইরে থেকে আপন খানা আনানো যেত, এবং যেহেতু যেসব সহযুযুধানবর্গ সে যাত্রায় পালাতে। সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁরা নেমকহারাম নন, তাঁরাই চাঁদা তুলে উত্তম লঞ্চ ডিনার বাইরে থেকে পাঠাতেন); কিংবা (ভারতীয় মুদ্রায়) সোয়া তিন টাকা জরিমানা দান– যথা অভিরুচি।
কিন্তু প্রশ্ন, এতগুলো পুলিশ সে রাত্রে হঠাৎ একজোট হল কী করে?
খাঁটি বন্ বাসিন্দারা আমাদের যুদ্ধে নিরপেক্ষ কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট কাঁকর বা সোডার ছিপি যদি তার জানালায় লেগে গিয়ে তার নিদ্রাভঙ্গ করে তবে সে জানালা খুলে কটুবাক্য আরম্ভ করার পূর্বেই আমরা অকুস্থল ত্যাগ করি। কেউ কেউ আবার হঠাৎ এক ঝটকায় জানালা খুলে আমাদের মাথার উপর ঢেলে দেয় এক জাগ হিমশীতল জল। আমরা অবশ্য এ-জাতীয় অহেতুক উদ্ৰবের জন্য সদাই সতর্ক থাকি।
কিন্তু আজ ছিল আমাদের পড়তা খারাপ। টেওডরের সক্কলের পয়লা বুলেট, বা সোডার ছিপি, যাই বলুন, পড়ে একদম পাশের ফ্ল্যাটে এক নবাগত বিদেশির জানালায়– কেন যে বিদেশিগুলো বন-শহরটাকে বিষাক্ত করার জন্য আসে, আল্লায় মালুম– সে কিন্তু জানত, বন্ শহরের খাস বাসিন্দারা এই (মোর দ্যান) হানড্রেড ইয়ার ওয়ারে ভদ্র সুইটজারল্যান্ডের মতো সেই যুদ্ধারম্ভের রাত্রি থেকেই নিরপেক্ষ জোর কটুকাটব্য (অর্থাৎ ডিপ্লোমাটিক প্রটেস্ট)। কিংবা এক জাগ জল। তা সে এমন কীই-বা অপকর্ম? ইউরোপীয়রা তো চান করে একমাত্র যখন জাহাজ-ডুবি হয়। জল ঢেলে সে তো পুণ্যসঞ্চয় করল, ডাক্তারদের শ্রদ্ধাভাজন হল। কিন্তু আজকের এই বিদেশি পাপিষ্ঠটা কটুবাক্য করেনি, জল ঢালেনি, করেছে কী, সে-ফ্ল্যাটে ফোন ছিল বলে চুপিসাড়ে ফাঁড়ি-থানাকে জানিয়ে দিয়েছে। ওদিকে আবার ইয়ার টেওডরের অগুনতি সখা এই শহরে। এবং বছর দুই ধরে সে প্রাগুক্ত পদ্ধতিতে শহরে এ-মহল্লায়, ও-মহল্লায় শনির রাতে– এবং সেটা যত গম্ভীর হয় ততই উমদা– আজ একে, পরের শনিতে অন্য কাউকে জাগাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পুলিশ বিস্তর গবেষণার পর লক্ষ করল যে সর্বত্রই ওয়ার্কিং মেথড বা মডুস অপেরান্ডি হুবহু এক– বড় বড় ব্যাঙ্ক-ডাকাতরা যে রকম পুলিশের এই জাতীয় গভীর গবেষণার ফলেই শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। তাই তারা সেই ডেঞ্জরস ক্রিমিনাল টেওডরের প্রতীক্ষাতেই ছিল।
আর আপনাদের সেবক এই অধম? সে কি কখনও ধরা পড়েছিল?
.
০৩.
অধীর পাঠক! শান্ত হও, তোমার মনে কী কুচিন্তা সে আমি জানি; ইতোমধ্যে ওই বাবদে দু খানা চিঠিও পেয়েছি, আমার কিন্তু কিন্তু ভাবটা যাচ্ছে না। আমি জানি, তোমার জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবল, তাই জানতে চাও আমি কখনও ধরা পড়ে শ্রীঘরবাস করেছিলুম কি না। আমার সে দুরাবস্থার(৩) বর্ণনা শুনে তোমার হৃদয়মনে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে সেই নিয়ে আমার দুর্ভাবনা। তা হলে একটি ছোট কাহিনী দিয়ে আমার সঙ্কোচটা বোঝাই।
মাত্র কয়েকদিন আগে, ১৬ অগ্রহায়ণ, আমরা স্বৰ্গত গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিন পালন করলুম। এঁর বহু বহু সদ্গুণ ছিল, তার অন্যতম, তিনি নিজে সাহিত্য নাট্য সৃষ্টি করুন আর না-ই করুন, সে যুগের সবাই মেনে নিয়েছিলেন যে তাঁর মতো শাস্ত্রজ্ঞ রসজ্ঞ জন বাংলা দেশে বিরল এবং সুদ্ধমাত্র রসজ্ঞ হিসেবে অদ্বিতীয়। তাই কাঁচা-পাকা সর্ব লেখকই তাঁকে তাদের বই পাঠিয়ে মতামত জানতে চাইতেন। ওদিকে গুরুদাস ছিলেন কর্মব্যস্ত পুরুষ। সেই উঁই আঁই বই পড়ে স্বহস্তে উত্তর লেখার তার সময় কই? তাই একখানা পোস্টকার্ডে যা ছাপিয়ে নিয়েছিলেন তার মোটামুটি মর্ম এই : ‘মহাশয়, আপনার পাঠানো পুস্তকের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি উহা মনোযোগ সহকারে পড়িয়াছি। সত্য বলিতে কি পড়িতে পড়িতে–’ এখানে এসে থাকত একটা লম্বা লাইন এবং তার উপরে ছাপা থাকত, হাস্য সম্বরণ করিতে পারি নাই এবং লাইনের নিচে ছাপা থাকত, ‘অশ্রু সম্বরণ করিতে পারি নাই।’ তিনি নাকি পাঠানো বইখানা পড়ে যথোপযুক্তভাবে হয় লাইনের উপরে হাস্য সম্বরণ বা নিচের ‘অশ্রু সম্বরণ’ কেটে দিতেন। তিনি ছিলেন অজাতশত্রু, তাই নিশ্চয়ই কোনও বদরসিক কাহিনীটির সঙ্গে আরও জুতে দিত যে, অধিকাংশ স্থলেই তিনি নিজে বইখানি পড়তেন না, তার সেক্রেটারি সেটি পড়ে বা না পড়ে উপরের হাস্য কিংবা নিচের ‘অশ্রু’ কেটে দিত।(৪)
