পেটার থাকে মাউস ফাডে (সার্থক নাম, বাবা, ‘ইঁদুরের পথ!’)
টেওডরই আমাদের হিন্ডেনবুর্গ বলুন, লুডেনড বলুন, আমাদের রাইষ মার্শাল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, যদিও সে পেটারের ঘরে আসে সপ্তাহে নিদেন দশ দিন, তবু তার জানালা যে ঠিক কোনটা সেটা ঠাহর করতে পারছে না– আশা করি তার কারণ আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। অবশেষে হানস্-ই লোকেট করলে জানালাটা। হানস্ বটনির ছাত্র– পেটারের জন্মদিনে তাকে একটা অঙ্গুষ্ঠ-পরিমাণ সাতিশয় বিরল ফণীমনসা উপহার দেয়। একটা জানালার বাইরের চৌকাঠ-পানা ফালি কাঠের উপর হানস্ সেটি আবিষ্কার করলে রাত্রের হিম খাওয়াবার জন্য পেটার সেটি ওই সিল না লেজ কী যেন বলে ইংরেজিতে– তারই উপর রেখে দিয়েছিল। কালিদাসের যুগে দ্বারে আঁকা থাকত ভিন্ন ভিন্ন চিহ্ন যেমন শঙ্খচক্র– হেথায় কেকটাস্।
পয়লা রৌন্ডে টেওডর ছুড়ে মারল সোডার ছিপি। লাগল গিয়ে ডান-পাশের জানালাটায়। আমরা ফিসফিস করে পেটারকে সাবধান করতে কসুর করিনি, কিন্তু কেবা শোনে কার কথা, সে তখন জাঁদরেল জনরৈল সিং, আমরা নিতান্ত ডালভাত দাবাখেলার বড়ে-পেয়াদা। দুসরা রৌন্ডে টেওডর বোধ হয় ফইর করেছিল একটা স্নো-কৌটোর ঢাকনা। এটা ধন্ন্ ন করে গিয়ে লাগল বাঁ-পাশের জানালাটায়। আমরা তাকে কিছু বলতে যেতেই সে ধমক দিয়ে বললে, ‘চোপ! এই হল আর্টিলারির আইন। প্রথম মারবে তাগের চেয়ে দূরে, তার পর তাগের চেয়ে কাছে, শেষটায় ম্যাথম্যাটিকলি মেজার করে ঠিক মধ্যিখানে। হবেও বা। ও তো প্রাশান য়ুংকার ঘরের ছেলে– জানার কথা। এবং আমাদের তুলনায় তার পকেট-শস্ত্রাগার পরিপূর্ণ। কারণ আমরা জর্মনির ধোপদুরস্ত রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি কীই বা এমন কামান-ট্যাঙ্ক। পক্ষান্তরে যুযুধান টেওডর ঘিনপিৎ উপেক্ষা করে ‘পাবে’র সামনের ‘বিন’ থেকে মেলা অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে এনেছে। তাই এবারে ছুড়লে ছোট্ট একটি মার্কিং ইঙ্কের খালি শিশি। লাগল গিয়ে তেতলার একটা জানালায়, তখন বুঝতে পারলুম জনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কেন জিততে পারেনি। দ্বিতীয়টা তখনও হয়নি! সে সময় হিটলার যদি আমাকে কসট করত তবে আমি নিশ্চয়ই তাকে বারণ করে দিতুম– বিশেষত এই অভিজ্ঞতার পর।
তার চেয়েও স্পষ্ট বুঝতে পারছি, টেওডর এখন যে অবস্থায় পৌচেছে সেখানে আপন নাক চুলকোতে চাইলে গুত্তা মারবে পিঠে। কিন্তু সে তত্ত্বটি তখন তাকে বলতে গেলে সেই সুপ্রাচীন জর্মন কাহিনীরই পুনরাবৃত্তি হবে মাত্র এক মাতাল রাত চৌদ্দটায় বাড়ি ভুল করে বারবার চেষ্টা করছে চাবি দিয়ে সদর দরজা খোলবার এবং সঙ্গে সঙ্গে কটুকাটব্য। সেই শব্দে শেষটায় দোতলায় একজনের ঘুম ভেঙে গেল। নিচের দিকে মাতালকে দেখে বললে, ‘হেই, তুমি ভুল বাড়ির তালা খোলবার চেষ্টা করছ’। মাতাল উপরের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললে, ‘হে হে হে হে! তুমিই ভুল বাড়িতে ঘুমুচ্ছ।’
এই একতরফা লড়াই– আইনে যাকে বলে ইনআর সনশিয়া– কিংবা বলতে পারেন ড-কুইটের জলযন্ত্র আক্রমণ– আধঘন্টাটাক চলার পর টেওডর ছাড়লে–বলতে গেলে তার প্রায় শেষ সিকস পৌন্ডার– সার্ডিনমাছের খালি একটা টিন! ঝন ঝন করে শব্দ হল। কিন্তু পরে মনে হয়েছিল সে যেন ওস্তাদ এনায়েত খানের সেতার–কারণ সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু ছাপিয়ে কানে গেল পুলিশের ভারি ভারি বুটের শব্দ। এটা হল কী প্রকারে? সচরাচর শানবাঁধানো রাস্তার উপর রোদের পুলিশের বুটের শব্দ সেই নিঝুম নিশীথে অনেক দূরের থেকে শোনা যায়, এবং টেওডর ছাড়া আমাদের আর সক্কলের আধখানা কান খাড়া ছিল তারই আশঙ্কায়। অতএব দে ছুট, দে ছুট! কোন মূর্খ বলে যুদ্ধে পলায়ন কাপুরুষের কর্ম! ইংরেজ আফ্রিদিদের সঙ্গে যুদ্ধে পালালে পর এ দেশের জোয়ানদের বুঝিয়ে বলত, ‘এর নাম বাহাদুরিকে সাথ পিছে হঠনা!’
কিন্তু ছুটতে ছুটতে আমি শুধু ভাবছি, এতগুলো বুটের শব্দ একসঙ্গে হল কী করে, রোঁদে তো বেরোয় প্রতি মহল্লায় হার্টের, sorry, হার্টলেস সিংগলটন! তা সে যা-ই হোক, এখন তো প্রাণটা বাঁচাই।
পূর্বেই বলেছি, পেটারের গলিটার নাম মূষিকমার্গ। আসলে কিন্তু বন্ শহরের আঁকাবাঁকা হাঁসুলি বাঁকের মোড়, পায়ের বেঁকি-গয়নায় প্যাঁচ-খাওয়া আড়াই বিঘৎ চওড়া নিরানব্বইটি ‘রাস্তাকেই’ মূষিকমার্গ বলা যেতে পারে– তার জন্য কল্পনাশক্তিটিকে বহু সুদূরে সম্প্রসারিত করতে হয় না।
কিন্তু একটি তত্ত্ব সর্বজনবিদিত। এই গলিঘুচি, কোথায় যে হঠাৎ বেঁকে গেছে, কোথায় যে রাস্তার আশেপাশে বহু প্রাচীনকালেই পঞ্চত্বপ্রাপ্ত একটি কারখানার অন্ধকার অঙ্গনে অশরীরী হওয়া যায়, অর্থাৎ লুকানো যায় (হংসমিথুনের কথা অবশ্য আলাদা), কোথায় যে একটা গারাজের আংটাতে পা দিয়ে সামান্য তকলিফেই ছাতে ওঠা যায়, এসব তথ্য পুলিশ যতখানি জানে আমরা ঠিক ততখানিই জানি। এমনকি লেটেস্ট খবরও আমরা রাখি: অমুক দেউড়ির ঠিক সামনের রাস্তার বাতিটি বরবাদ হয়ে গিয়েছে, এখনও মেরামত হয়নি, কিংবা অমুক জায়গায় পরশুদিন থেকে এক ভঁইপিপে জুটেছে– পিছনে দিব্য অন্ধকার। অর্থাৎ পুলিশ তার আপন হাতের তেলো যতখানি চেনে, আমরাও আমাদের তেলো ততখানিই চিনি।
মূষিকমার্গ ধরে খানিকটে এগোলেই সেখানে তেরাস্তা। আমাদের স্ট্রাটেজি অতি সনাতন, সুপ্রাচীন। সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দু দিকে ছুট লাগালাম। আবার তেরাস্তা পেলে আবার দু ভাগ হব। ধরা যদি পড়িই তবে দলসুদ্ধ ধরা পড়ব কেন? এবং যুদ্ধের নীতিও বটে, ‘আক্রমণের সময় দল বেঁধে; পলায়নে একলা-একলি।’ খুদে বন্ শহরে পুলিশ গিস গিস করে না– আর এই রাত চোদ্দটায় ফাঁড়ি-থানা ক’টাই-বা শেয়ার করতে পারে? কাজেই প্রতি তেরাস্তায় তারা যদি আমাদেরই স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করে তবে যাদের ‘মেন পাওয়ার’ কম বলে, কয়েকটা রাস্তা ফোলো অপ করতে পারবে না বলে শেষ পর্যন্ত হয়তো কেউই ধরা পড়বে না। কিন্তু এই ‘শুপো’ নন্দনগণ ঘড়েল। এবম্প্রকার বহু যুদ্ধে তারা জয়ী এবং পরাজয়ী হয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে সেটা তাদের শেখায় অন্য স্ট্র্যাটেজি।
