এদের গুলতানির বর্ণনা বা ইতিহাস দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। কারণ সবাই জানেন, সেই সোক্ৰাতেসের যুগ থেকে ইয়োরোপে গুণীজ্ঞানী থেকে চোরচোট্টা সবাই মদ্যালয়ে বসে বিশ্রম্ভালাপ করেছেন এবং সহজেই অনুমেয়, চোরচোট্টারা প্লাতোর ‘আইডিয়া’র সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে ঘোরাঘুরি করেনি, আর সোক্রাতেস প্রতিবেশীর তালাটি কী প্রকারে নিঃশব্দে বে-কার করা যায় তাই নিয়ে মদ্যপান করতে করতে শিষ্যদের সঙ্গে কূট যড়যন্ত্রে ত্রিযামা যামিনী যাপন করেনি। অর্থাৎ যে যার বৈদগ্ধ্য, জ্ঞানবুদ্ধি, যাতে তার চিত্তাকর্ষণ, তাই নিয়ে কথাবার্তা কইতে ভালোবাসে। তবে হ্যাঁ, মদ্যপানের মেকদার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু যে ঈষৎ নিম্নস্তরে নেমে যায় সেটা অনেকেই লক্ষ করেছেন। জর্মনির স্টুডেন্টদের বেলায়ও তাই।
আমার ছিল মেজাজমর্জি অত্যন্ত খারাপ। ঠিক সেদিনই খবর পেয়েছি ইংরেজ গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডকে তালাক দিয়েছে। তারই ফলে আমার কুল্লে বচ্ছরের খরচার জন্য ব্যাঙ্কে গচ্ছিত টাকার এক-তৃতীয়াংশ (বেশি হতে পারে, কমও হতে পারে, এতকাল পর সঠিক বলা কঠিন) কর্পূর হয়ে গেল। অর্থাৎ এখন যে য়ুনিভার্সিটি রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে সস্তা ডিনারটি (সে যুগে দাম ছিল এদেশি পয়সায় কুল্লে বারো আনা) খাব, তারও উপায় রইল না। কাল সন্ধ্যা থেকে রাত্তিরের খাওয়াটা নিজেকেই রাঁধতে হবে। ওদিকে দেশের ইয়াররা ভাবছেন, লেখাপড়ায় আস্ত একটা গর্দভ ওই ছেলে জর্মনি গিয়ে তোপ মজাটা লুটে নিলে, মাইরি!
ইতোমধ্যে এসব ‘পাবে’ শনির সন্ধ্যায় যা-সব হয় সে-সবই হয়ে গেছে। ঠেলায় করে গরম গরম সসেজ এসেছে, দু-চারটে আনাড়ি বাজিয়ে ব্যাঞ্জোর উপর উৎপাত করে যৎসামান্য কামিয়ে গিয়েছে, পিকচার পোস্টকার্ড জুতোর ফিতে বিক্রির ছলে ভিখিরি তার রোদ মেরে গেল।
করে করে রাত একটা বাজল। বিস্ময় বিবোধক চিহ্ন দেবার জন্য ওই চিহ্নেরই বিন্দুটির বিন্দুবৎ প্রয়োজন নেই; শনির রাত্রি জর্মনিতে আরম্ভ হয় বারোটায়– যদ্যপি গ্রিনিজ ফয়তা ঝাড়ে ওই সময়টায় নাকি তার পরের দিন আরম্ভ। কিন্তু রাত একটার পর সাধারণ মদ্যালয় বন্ধ। এরপর করা যায় কী? আমি বিশেষ করে তাদেরই কথা ভাবছি যাদের তখনও তেষ্টা মেটেনি– জর্মনদের বিশ্বাস তারা বিয়ার পান করে তৃষ্ণা নিবারণার্থে। সাধারণ মদ্যালয় যখন বন্ধ তখন খোলা রইল অসাধারণ মদ্যালয়। সেগুলো একটু ইয়ে অর্থাৎ বিশেষ শ্রেণির মহিলায় ভর্তি আর কি। তবে স্টুডেন্টরা দল বেঁধে যখন সেখানে ঢুকে আপন গালগল্পে মত্ত হয় তখন ওই পূর্বোক্ত ‘ইয়েরা’ ওদের জ্বালাতন দূরে থাক্ ডিস্টার্বও করে না। ওদের পকেটে আছেই-বা কী?
ইতোমধ্যে সেই যে আমাদের টেওডর যাকে নিয়ে কাহিনী পত্তন করেছি, তার হঠাৎ পুনরায় শোক উথলে উঠল ওই ডানৎসিগ নগরীর প্রখ্যাত স্বর্ণবারির জন্য। বার বার বলে, ‘দেখলে ব্যাটার কাণ্ডখানা! রাত একটা ত আমাদের বসিয়ে রাখলে একটা সুরালয়ে– যখন কি না প্রত্যেক বাপের প্রত্যেক সু-পুত্তরের কর্তব্য আপন আপন সুনির্মিত স্নেহময় নীড়ে ন্দ্রিাদেবীর শান্ত্যঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া।’
কে একজন বললে, ‘এই খানিকক্ষণ আগেই না তুই-ই বললি, পেটারের বাড়িটা আসলে অ্যাডাম এবং ঈভ তৈরি করেছিলেন ঝুরঝুরে থুরথুরে?’
টেওডরের কিন্তু তখন কারও টিপ্পনিতে কান দেবার মতো মরজি নয়– সে তখন মৌজে। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে, যেন এক নবীন রিলেটিভিটি আবিষ্কার করার উৎসাহ দেখিয়ে বললে, ‘আর পেটার ব্যাটা নিশ্চয়ই আরামসে ঘুমুচ্ছে। চল, ব্যাটাকে গিয়ে জাগানো যাক’।
এস্থলে কারও পক্ষে রণে ভঙ্গ দেওয়া জর্মন-স্টুডেন্ট-মনু-শাস্ত্রে গোমাংস ভক্ষণের চেয়েও গুরুতর পাপ। তুমি তা হলে আস্ত একটা কাপুরুষ। পুলিশকে– অর্থাৎ দুশমনকে– ডরাও। তোমার কলিজা বকরির, তোমার সিনা চিড়িয়ার। অতিষ্ঠ হয়ে আপনি শুধোবেন,’ রাত্রি একটাই হোক, আর তিনটেই হোক’ কেউ কাউকে জাগালে পুলিশের পূর্বতর অধস্তন চতুর্দশ পুরুষের কিবা ক্ষতিক্ষয়, জখম-লোকসান? এদেশে কি রেতে-বেরেতে টেলিগ্রাফ পিয়ন আসে না?’
দাঁড়াও পাঠকবর, জন্ম যদি বঙ্গে, তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এসব ক্রমশ প্রকাশ্য।
বলা বাহুল্য রাত তেরটার সময়– গ্রিনিজ যদিও সেটাকে দিবাভাগ বলেন– আপনি যদি বাড়ির, অবশ্য অন্য বাড়ির, দোস্ত দুশমন– যে-ই হোক কাউকে জাগাবার চেষ্টা করেন, তা সে সিমেন-হালেস্কে-শুকের্টের নব্যতম বিজলি-বেল বাজিয়েই হোক, আর পৌরাণিক যুগীয় ঘণ্টাকর্ণ কানে যে-ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখত যাতে করে সে তার জন্মবৈরী শ্রীহরির নাম-কীর্তন শুনতে না পায়– সেই ঘন্টাটিই বাজান, বাড়িউলি দরজা খুলে শনির রাতে ওই জবাকুসুসমঞ্চাশ টেওডরের নয়নযুগল দেখতে পাবে আমরা আর-সবাই না হয় পাশের গলিতে গা-ঢাকা দিয়েই রইলুম– তখন তার কণ্ঠ থেকে– ভুল বললুম, নাভিকুণ্ডলী থেকে যেসব মুরজ মুরলীধ্বনি বেরুবে তার ঈষদাংশ শুনতে পেলে ওই যে খানিকক্ষণ আগে কী-সব ইয়েদের কথা বলছিলুম তারা পর্যন্ত নোকের সামনে নজ্জা পাবে। অতএব ওই কবোষ্ণ অন্ধকারে আমাদের কাছে জাজ্বল্যমান হল যে ফ্রন্টাল এটাকের স্ট্র্যাটেজি বিলকুল ঔট অব ডেট।
আমাদের হস্তে তৎসত্ত্বেও আশার একটি ক্ষীণ প্রদীপ মিদি মিদির করছে। পেটারের কামরাটা দোতলায়, এবং একদম রাস্তার উপরে। অতএব আমরা সেদিক বাগে যেতে যেতে হেথাহোথা ক্ষুদ্রাকারের নুড়ি, কাঁকর, সোডার ছিপি ইত্যাকার মারণাস্ত্র কুড়িয়ে নিয়ে সুসজ্জিত হয়ে পৌঁছলুম পেটারালয়ে– বঙ্কিম সঙ্কীর্ণ পথ দুর্গম নির্জন পেরিয়ে।
